বিএনপির মঞ্চে জাইমা রহমান, কী ইঙ্গিত দিচ্ছে দলটি

বিএনপির মঞ্চে জাইমা রহমান, কী ইঙ্গিত দিচ্ছে দলটি

জাইমা রহমানকে সামনে রেখে বিএনপি কী ধরনের রাজনৈতিক ইঙ্গিত দিচ্ছে—তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা চলছে।

তারেক রহমানের পর এবার তার কন্যা জাইমা রহমান বিএনপির ভেতরে বিশেষ মনোযোগের কেন্দ্রে আসছেন বলে মনে করছেন অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক। যদিও তিনি এখনো দলের কোনো আনুষ্ঠানিক পদে নেই, তবু ধীরে ধীরে তাকে জনসমক্ষে নিয়ে আসার একটি কৌশলগত প্রক্রিয়া চলছে—এমনটাই পর্যবেক্ষকদের ধারণা।

সম্প্রতি পরিবারের সঙ্গে দেশে ফেরার পর থেকেই জাইমা রহমানকে ঘিরে দলীয় অন্দরমহল ও সাধারণ মানুষের মধ্যেও কৌতূহল তৈরি হয়েছে। এখন পর্যন্ত তিনি খুব বেশি কর্মসূচিতে অংশ না নিলেও, যেসব আয়োজনে উপস্থিত হয়েছেন, সেগুলো নিয়ে আগ্রহ চোখে পড়ার মতো।

অনেকের মতে, জাইমা রহমানকে সামনে এনে বিএনপি নেতৃত্বের উত্তরাধিকার ও ধারাবাহিকতা সম্পর্কে একটি বার্তা দিতে চাইছে। ভবিষ্যতে তিনি দলীয় নেতৃত্বে আসবেন, এমন সম্ভাবনাকে সামনে রেখেই তাকে প্রস্তুত করা হচ্ছে বলেও ধারণা করা হচ্ছে।

আবার আরেকটি বিশ্লেষণ হলো, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপি সচেতনভাবেই জাইমা রহমানকে সামনে আনছে, যাতে তরুণ ভোটার ও নারী ভোটারদের মধ্যে দলের প্রতি আকর্ষণ তৈরি করা যায়।

বিশেষ করে ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া ও অংশ নেওয়া তরুণ প্রজন্মের কথা মাথায় রেখেই জাইমা রহমানকে সামনে আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে বলে মনে করেন কেউ কেউ। এই প্রজন্মের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের একটি প্রতীকী প্রয়াস হিসেবেও বিষয়টি দেখা হচ্ছে।

এছাড়া রাজনৈতিক অঙ্গনে এমন আলোচনাও রয়েছে যে, জামায়াতে ইসলামিকে সম্ভাব্য প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ধরে নিয়ে তার বিপরীতে নারীদের ভূমিকা ও অবস্থান কীভাবে উপস্থাপন করা যায়—সে কৌশলেরও একটি বহিঃপ্রকাশ হতে পারে জাইমা রহমানকে সামনে আনা।

যদিও এবারের রাজনৈতিক প্রচারণায় তারেক রহমানের সঙ্গে মাঝে মাঝে তার স্ত্রী জুবাইদা রহমানকে দেখা গেলেও, জাইমা রহমান এখনো সরাসরি নির্বাচনী প্রচারের মঞ্চে ওঠেননি।

জাইমা রহমান সম্পর্কে কী জানা যায়

প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নাতনি হওয়া সত্ত্বেও জাইমা রহমান সম্পর্কে এতদিন খুব বেশি তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি। দলীয় কর্মী-সমর্থক থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের মধ্যেও তার জীবন ও ভূমিকা নিয়ে আগ্রহ থাকলেও, বিএনপি বা তার পরিবারের পক্ষ থেকে সংবাদমাধ্যমে কখনো বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়নি।

দলীয় সূত্র অনুযায়ী, জাইমা রহমানের জন্ম ১৯৯৫ সালের অক্টোবরে ঢাকায়। তার প্রাথমিক শিক্ষা ছিল ঢাকার বারিধারার একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে।

পরবর্তীতে তিনি লন্ডনে চলে যান এবং সেখানে ম্যারি মাউন্ট গার্লস স্কুলে পড়াশোনা করেন। এরপর কুইন ম্যারি ইউনিভার্সিটিতে আইন বিষয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। পরে যুক্তরাজ্যের ইনার টেম্পল থেকে তিনি বার-অ্যাট-ল ডিগ্রি অর্জন করেন।

গত ২৩ ডিসেম্বর নিজের ফেসবুক পেজে দেওয়া এক লেখায় তিনি আইন পেশায় যুক্ত থাকার ইঙ্গিত দেন। সেখানে তিনি লেখেন, আইন পেশায় কাজ করতে গিয়ে মানুষের জীবনের গল্পগুলো খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয় এবং সেই গল্পগুলোর যৌক্তিক ও আইনগত সমাধান খুঁজে বের করার দায়িত্ব তাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়।

২০০৮ সালে সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর তারেক রহমান পরিবারসহ লন্ডনে চলে যান। এরপর প্রায় ১৭ বছর যুক্তরাজ্যে অবস্থান শেষে গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর স্ত্রী ও একমাত্র সন্তানকে নিয়ে তিনি দেশে ফেরেন।

দেশে ফেরার আগে পর্যন্ত জাইমা রহমান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় অনুপস্থিত ছিলেন। এমনকি তার বাবা তারেক রহমান যেখানে নিয়মিত সামাজিক মাধ্যমে সক্রিয়, সেখানে জাইমার উপস্থিতি তেমন চোখে পড়েনি।

বর্তমানে যে ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজটি দেখা যাচ্ছে, সেটি তৈরি করা হয়েছে গত বছরের ২৪ নভেম্বর। সেখানে তিনি নিজের পরিচয় দিয়েছেন—‘ব্যারিস্টার-অ্যাট-ল, কমিউনিকেশনস স্ট্র্যাটেজিস্ট এবং কর্পোরেট লইয়ার’ হিসেবে।

রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে দেশের সংবাদমাধ্যমগুলো তার বিভিন্ন কার্যক্রম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্য নিয়মিতভাবে প্রচার করছে। একই সঙ্গে বিএনপির ভেরিফায়েড পেজগুলোতেও তার অংশগ্রহণ করা কর্মসূচিগুলো তুলে ধরা হচ্ছে, এবং তিনি নিজেও সেগুলো শেয়ার করছেন।

দলীয় কর্মকাণ্ডে ভূমিকা

আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপিতে এখনো কোনো পদে নেই জাইমা রহমান। তবুও গত বছরের নভেম্বরে প্রবাসীদের নিয়ে আয়োজিত দলের একটি ভার্চুয়াল সভায় অংশ নেওয়ার মাধ্যমে তিনি আলোচনায় আসেন। ইউরোপের বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রবাসী ভোটারদের বিষয় নিয়ে ওই সভাটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

সেই সময় বিএনপির পক্ষ থেকে সভার বিস্তারিত প্রকাশ না করা হলেও, পরে সামাজিক মাধ্যমে সভার একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে জাইমা রহমানকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করতে দেখা যায়, যা পরে সংবাদমাধ্যমেও প্রকাশিত হয়।

এর আগে ওই বছরের ফেব্রুয়ারির প্রথম দিকে তিনি তারেক রহমানের প্রতিনিধি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিতে অনুষ্ঠিত ন্যাশনাল প্রেয়ার ব্রেকফাস্টে অংশ নেন। সেখানে বিএনপির পক্ষ থেকে আরও উপস্থিত ছিলেন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

দেশে ফেরার ঠিক আগে, ২৩ ডিসেম্বর তিনি নিজের ফেসবুক পেজে ‘নিজের গল্প’ শিরোনামে একটি লেখা প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি উল্লেখ করেন যে, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান এবং ৫ আগস্টের আগে-পরে সময়টায় তিনি নেপথ্যে থেকে যতটা পেরেছেন ভূমিকা রাখার চেষ্টা করেছেন।

তিনি লেখেন, দেশে ফিরে তিনি তার ‘দাদু’র পাশে থাকতে চান, একই সঙ্গে বাবাকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করতে চান এবং একজন দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে দেশের জন্য নিজের সর্বোচ্চটা দিতে চান।

তার দাদি, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া, গত ৩০ ডিসেম্বর ঢাকার একটি হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। পরে ঢাকায় ফেরার পর ১৮ জানুয়ারি তিনি ‘উইমেন শেপিং দ্য নেশন: পলিসি, পসিবিলিটি অ্যান্ড দ্য ফিউচার অব বাংলাদেশ’ শীর্ষক একটি অনুষ্ঠানে প্রথমবারের মতো বক্তব্য দেন এবং প্রশ্নোত্তর পর্বে অংশ নেন। সেখানেই তিনি জানান, এটাই ছিল এ ধরনের কোনো অনুষ্ঠানে তার প্রথম অংশগ্রহণ।

এরপর ২৫ জানুয়ারি বিএনপি আয়োজিত ‘আমার ভাবনায় বাংলাদেশ’ শীর্ষক রিল-মেকিং প্রতিযোগিতার বিজয়ীদের সঙ্গে তারেক রহমানের একান্ত আলোচনায় তিনি অংশ নেন। অনুষ্ঠানটি ঢাকার গুলশানের একটি পার্কে অনুষ্ঠিত হয়।

সবশেষ ২৭ জানুয়ারি তিনি দৃক গ্যালারিতে একটি আলোকচিত্র প্রদর্শনী দেখতে যান এবং সেই অভিজ্ঞতার কিছু ছবি নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে প্রকাশ করেন।

বিশ্লেষকদের মতামত

জাইমা রহমানকে ঘিরে আলোচনার ক্ষেত্রে পরিবারতান্ত্রিক রাজনীতির প্রসঙ্গ বারবার উঠে আসছে। উপমহাদেশের রাজনীতিতে যেমন পারিবারিক নেতৃত্বের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে, তেমনি বাংলাদেশেও আওয়ামী লীগ ও বিএনপিতে এই ধারা বহুদিন ধরেই বিদ্যমান—এমন মন্তব্য করেন বিশ্লেষকেরা।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও লেখক মহিউদ্দিন আহমদের মতে, ভারতে যেমন নেহেরু নিজে ইন্দিরা গান্ধীকে রাজনীতিতে এনেছিলেন, পাকিস্তানেও তেমন পারিবারিক রাজনীতির নজির রয়েছে। বাংলাদেশে বিএনপির সমর্থকেরা মূলত একটি পরিবারকেন্দ্রিক রাজনীতির সঙ্গেই যুক্ত।

তার ভাষায়, জাইমা রহমানকে এখন যেভাবে সামনে আনা হচ্ছে, তাতে বোঝা যায় তাকে দল ও পরিবারের পক্ষ থেকে ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে দলের নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা নিয়েও একটি ধারণা জনমনে গড়ে তোলা হচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও বিশ্লেষক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান মনে করেন, নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে তরুণ, নারী এবং বিশেষ করে জেন-জি ভোটারদের আকৃষ্ট করতেই জাইমা রহমানকে সামনে আনা হচ্ছে।

তার মতে, এর ভেতরে ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের একটি দিকনির্দেশনাও থাকতে পারে। একই সঙ্গে জাইমা রহমানের মাধ্যমে বিএনপি দেখাতে চাইছে যে তারা ধর্মীয় কট্টরতার বিপরীতে নারীদের কীভাবে উপস্থাপন করতে চায়।

তিনি আরও বলেন, বিএনপি যেভাবে জাইমা রহমানকে তুলে ধরছে, তাতে তিনি একজন পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিত তরুণ নারী হিসেবে পরিবারের প্রতিনিধি এবং সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের অংশ হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছেন।

তবে শেষ পর্যন্ত সময়ই বলে দেবে—তিনি আদৌ নেতৃত্বের জন্য নিজেকে কতটা প্রস্তুত করতে পারবেন, কিংবা সেই পথে এগোবেন কি না।

 

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
Share on email