
ভোটের মাত্র ছয় দিন আগে এক জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে নিজেদের নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)।
শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ ইশতেহার ঘোষণা করেন দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান। লুটপাট নয় উৎপাদন, ভয় নয় অধিকার, এ মূলমন্ত্রকে সামনে রেখে ঘোষিত ইশতেহারে ৯টি প্রধান স্তম্ভের ওপর বিশেষ জোর দিয়েছে দলটি। বিএনপি একে কেবল একটি রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি নয়, বরং একটি নতুন সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় চুক্তি হিসেবে অভিহিত করেছে।
বিএনপির ইশতেহারে সবচেয়ে বড় চমক হিসেবে এসেছে ফ্যামিলি কার্ড। প্রান্তিক ও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোকে মূল্যস্ফীতির চাপ থেকে রক্ষা করতে এ কার্ডের মাধ্যমে প্রতি মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা অথবা সমমূল্যের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরাসরি সরবরাহ করা হবে। তারেক রহমান জানিয়েছেন, দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধির সাথে সাথে এ অর্থের পরিমাণ পর্যায়ক্রমে আরও বাড়ানো হবে।
কৃষকদের সুরক্ষায় বিএনপি ঘোষণা করেছে কৃষক কার্ড। এর মাধ্যমে কৃষকরা সরাসরি ভর্তুকি, নামমাত্র সুদে ঋণ এবং শস্য বিমার সুবিধা পাবেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমাতে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণ নিশ্চিত করা হবে। এ সুবিধার আওতায় মৎস্য ও পশুপালন খাতের খামারিদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
দুর্নীতিমুক্ত স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়তে সারাদেশে এক লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে। প্রতিটি জেলায় মা ও শিশুদের জন্য বিশেষায়িত পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যকেন্দ্র স্থাপন এবং আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে। শিক্ষার ক্ষেত্রে মুখস্থ বিদ্যা নয়, বরং কর্মমুখী ও আনন্দময় শিক্ষার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের জন্য দুপুরের খাবার বা মিড ডে মিল চালু এবং প্রতিটি বিদ্যালয়ে প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদানের অঙ্গীকার করা হয়েছে।
তরুণ ভোটারদের আকৃষ্ট করতে আধুনিক ডিজিটাল অর্থনীতির একগুচ্ছ পরিকল্পনা রয়েছে বিএনপির ঝুলিতে। তারেক রহমান প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, দীর্ঘ প্রতীক্ষিত আন্তর্জাতিক পেমেন্ট গেটওয়ে পেপাল বাংলাদেশে চালু করা হবে। এ ছাড়া ফ্রিল্যান্সার ও উদ্যোক্তাদের জন্য ই-কমার্স হাব স্থাপন এবং মেধাভিত্তিক স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বেকারত্ব দূর করা হবে।
পরিবেশ সুরক্ষায় দলটির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের খাল খনন কর্মসূচিকে আধুনিক রূপে ফিরিয়ে আনার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। ইশতেহারে বলা হয়েছে, জনগণের অংশগ্রহণে ১০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল পুনঃখনন করা হবে। আগামী ৫ বছরে সারা দেশে ১৫ কোটি বৃক্ষরোপণ করা হবে। আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে।
ধর্মীয় ও সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষায় বিএনপি একটি বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। সব ধর্মের উপাসনালয়ের ধর্মীয় নেতাদের জন্য বিশেষ সম্মানী এবং প্রশিক্ষণভিত্তিক কল্যাণ ব্যবস্থা চালু করা হবে। এ ছাড়া ক্রীড়াকে কেবল বিনোদন নয়, বরং একটি লাভজনক পেশা হিসেবে গড়ে তুলতে উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে।
ইশতেহার ঘোষণা শেষে তারেক রহমান তার বক্তব্যে এক ভিন্নধর্মী রাজনৈতিক দর্শনের কথা বলেন। তিনি বলেন, বিএনপি প্রতিশোধের রাজনীতিতে বিশ্বাস করে না। আমরা একটি মানবিক রাষ্ট্র গড়তে চাই যেখানে আইনের ঊর্ধ্বে কেউ থাকবে না। ক্ষমতা আমাদের লক্ষ্য নয়, জনগণের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়াই আমাদের রাজনীতি। আমাদের নীতি হবে বৈষম্য নয় ন্যায্যতা, ভয় নয় অধিকার।
বিএনপি বলছে, তারা যদি জনগণের রায় পায়, তবে এমন একটি বাংলাদেশ নির্মাণ করবে যেখানে ভোটের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ থাকবে এবং প্রতিটি নাগরিক বুক ফুলিয়ে বলতে পারবেন সবার আগে বাংলাদেশ। বিএনপির এ জনমুখী ইশতেহার ভোটের মাঠে কতটা প্রভাব ফেলে, তা এখন দেখার বিষয়।
ফ্যামিলি কার্ড এবং পেপাল চালুর মতো প্রতিশ্রুতিগুলো সাধারণ মানুষ ও তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করেছে। ১২ ফেব্রুয়ারির ব্যালট যুদ্ধে জনগণ এ ইশতেহারের প্রতি কতটা সায় দেয়, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।







