নতুন সরকারের শপথ আজ

নতুন সরকারের শপথ আজ
বঙ্গভবনের দরবার হলের দীর্ঘদিনের প্রথা ভেঙে এবার প্রথমবার জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় হতে যাচ্ছে সরকার প্রধান ও মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠান।

মঙ্গলবার বিকাল ৪টায় জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় বাংলাদেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিতে যাচ্ছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। একই সঙ্গে মন্ত্রিসভার অন্যান্য সদস্যরা শপথ নেবেন।

শপথবাক্য পাঠ করাবেন রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন। সংসদ সচিবালয় সূত্রে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। আজ দিনটি শুরু হবে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথের মধ্য দিয়ে।

সংসদ সচিবালয় সূত্রে জানা গেছে, সকাল ১০টায় সংসদ ভবনের শপথ কক্ষে নবনির্বাচিত এমপিদের শপথ পাঠ করাবেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন। বিকাল ৪টায় দক্ষিণ প্লাজায় আয়োজিত অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন প্রথমে নতুন প্রধানমন্ত্রীকে এবং পরে মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ বাক্য পাঠ করাবেন।

পুরো অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করবেন নতুন মন্ত্রিপরিষদ সচিব এম সিরাজ উদ্দিন মিয়া। বিএনপির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই অনুষ্ঠানে প্রায় এক হাজার ২০০ দেশি-বিদেশি অতিথিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। আমন্ত্রিতদের মধ্যে ভারতের লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা দিল্লির প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থিত থাকছেন।

এছাড়া বিদেশি অতিথিদের তালিকায় রয়েছেন- ভুটানের প্রধানমন্ত্রী শেরিং তোবগে, মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুইজ্জু, পাকিস্তানের পরিকল্পনামন্ত্রী আহসান ইকবাল, নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বালা নন্দ শর্মা ও শ্রীলঙ্কার স্বাস্থ্যমন্ত্রী নলিন্দা জয়তিসার। যুক্তরাজ্যের ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরবিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি সীমা মালহোত্রারও অনুষ্ঠানে  যোগ দেয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে দলীয় সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।

শপথ অনুষ্ঠানে সার্কভুক্ত দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে বলে আইন উপদেষ্টা গত রোববার সাংবাদিকদের জানিয়েছেন। নতুন সরকারের এই শপথ অনুষ্ঠান ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। উল্লেখ্য, এবারের শপথ অনুষ্ঠানে একটি বিশেষত্ব থাকছে। জানা গেছে, নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা সাধারণ শপথের পাশাপাশি ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদের’ সদস্য হিসেবেও একটি পৃথক শপথ গ্রহণ করবেন।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শেষ দিন আজ : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের পর আজ মঙ্গলবার সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় নতুন সরকারের শপথ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সংসদ সদস্যদের শপথ শেষে সংসদীয় দলের বৈঠকে নেতা নির্বাচন করা হবে। এরপর সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নির্বাচিত নেতা রাষ্ট্রপতির কাছে সরকার গঠনের দাবি উপস্থাপন করবেন। রাষ্ট্রপতির আমন্ত্রণে শপথ গ্রহণের মাধ্যমে নতুন মন্ত্রিসভা আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব নেবে। আর এভাবেই নতুন সরকার গঠন করা হবে।

অন্যদিকে আজ নতুন সরকার গঠন পর্যন্ত অফিস করতে পারবেন অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টারা। সে হিসেবে আজই বর্তমান সরকারের শেষ কার্যদিবস। এদিন নতুন সরকার গঠনের মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ শেষ হবে। আর মেয়াদ শেষে উপদেষ্টারাও দায়িত্ব ছেড়ে দেবেন।

এরই মধ্যে অধিকাংশ উপদেষ্টা নিজ নিজ দপ্তর ও সরকারি বাসায় নিজস্ব জিনিসপত্র গোছাচ্ছেন। জমা দিয়েছেন কূটনৈতিক পাসপোর্ট, সম্পদের হিসাব। কেউ কেউ নতুন পাসপোর্ট ও বাসা ছাড়ার আবেদনও করেছেন। ফলে সচিবালয়ে এখন বিদায়ের সুর। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। এরপর ৮ আগস্ট দায়িত্ব নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। বর্তমানে উপদেষ্টা পরিষদে প্রধান উপদেষ্টা ছাড়াও ২০ জন উপদেষ্টা রয়েছেন।

জানা গেছে, নতুন সরকারের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী এবং উপদেষ্টারা পদাধিকারবলে ঢাকা শহরে সরকারি আবাসন পরিদপ্তরের মাধ্যমে বিশেষ শর্তে ও কোটায় মিনিস্টার্স অ্যাপার্টমেন্ট বা বাংলো বরাদ্দ পান। পদ থেকে পদত্যাগ বা মেয়াদ শেষ হলে সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাসা হস্তান্তর করতে হয়। এরই মধ্যে দুজন উপদেষ্টা তাদের বসবাসের জন্য সরকার থেকে দেয়া বাসা ছেড়ে দিয়েছেন। বাসাটি বুঝে নেয়ার জন্য তারা গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছেন।

এ বিষয়ে অর্থ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, আমি কূটনৈতিক পাসপোর্ট জমা দিয়ে দিয়েছি। আমি সাধারণত জরুরি মিটিং ছাড়া কোনো মিটিংয়ে যাই না। সেজন্য আমি দিয়ে দিয়েছি, অনেকেই দিয়ে দিচ্ছে। এটা নিয়ম, দিয়ে দেয়া।

তার সঙ্গে তার স্ত্রীর পাসপোর্ট জমা দেয়া হয়েছে বলেও জানান সালেহউদ্দিন আহমেদ। অর্থনৈতিক সংস্কার ও নীতিগত উদ্যোগ বাস্তবায়নে সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করে নিজের কাজের মূল্যায়নে ১০০ নম্বরের মধ্যে ৭০ নম্বর দিয়েছেন তিনি। এক প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, অনেক উদ্যোগ শুরু করা গেলেও সবকিছু শেষ পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। অন্তর্বর্তী সময়ে অর্থনীতি পরিচালনা করা সহজ ছিল না।

আমাদের অনেক ইচ্ছা ছিল, অনেক কাজ শুরু করেছি, কিন্তু সব শেষ করে যেতে পারিনি। কাঠামোগত দুর্বলতা, প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা এবং দীর্ঘদিনের অনিয়মের কারণে অনেক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সময় লেগেছে। তবুও জনগণের স্বার্থে কোনো রাজনৈতিক এজেন্ডা ছাড়াই কাজ শুরু করা হয়েছে, সেটিই বড় অর্জন। পাসপোর্ট ও সম্পদের হিসাব দিয়েছেন পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান।

তিনি বলেছেন, আমরা একটা ডিগ্রি অফ স্যাটিসফ্যাকশন নিয়ে যাচ্ছি, যে আমরা বাড়তি কোনো ঝামেলার সৃষ্টি করিনি। আমরা কিছু ঝামেলা, কিছু কাঁটা দূর করতে পেরেছি। সব তো আর দেড় বছরে সম্ভব না। বাকি কাজগুলো নিশ্চয়ই পরের সরকার করবে এবং আমরা তাদের শুভকামনা জানাই।

নৌপরিবহন উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, পাসপোর্ট ও সম্পদের হিসাব জমা দিয়েছি। মন্ত্রিসভা যেদিন হবে, সেদিনই আমাদের কার্যক্রম শেষ। এরপর আমরা চলে যাব। মন্ত্রিসভা গঠিত হলেই আগের মন্ত্রিসভার বিলুপ্তি। মৎস্য ও প্রাণিসস্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতারের দপ্তরের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. মামুন হাসান বলেন, ম্যাডামের কূটনৈতিক পাসপোর্ট জমা দেয়া হয়েছে। তিনি কোনো সরকারি বাড়ি নেননি। আর সম্পত্তির হিসাবও জমা দেয়া হয়েছে। তার দপ্তরও গোছানো হয়েছে, নির্বাচনের পর তিনি অফিস করেননি।

এ বিষয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার বলেন, ব্যর্থতার দায় নিয়ে বিদায় নিচ্ছি না। মোটেও ব্যর্থতা নিয়ে বিদায় নিচ্ছি না। আমাদের কাজ হলো উৎপাদন আহরণ এটাকে নিশ্চিত করা, এটাকে নিরাপদ করা। আমরা চেয়েছি যে আমাদের দেশে যা উৎপাদন, সেটা দিয়ে আমরা চালাই। বাণিজ্য, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন এবং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা শেখ বশিরউদ্দীন কোনো সরকারি বাড়ি কিংবা গাড়ি নেননি। তিনি কূটনৈতিক পাসপোর্ট ও সম্পদের হিসাব জমা দিয়েছেন।

এক প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, গত দেড় বছর বিভিন্ন প্রশ্ন ও অনুসন্ধানের মাধ্যমে সাংবাদিকরা আমাকে জবাবদিহিতার মধ্যে রেখেছেন। এতে কাজের গতি যেমন বেড়েছে, তেমনি যেসব জায়গায় ভুল ছিল, সেগুলো সংশোধনের সুযোগও তৈরি হয়েছে। ইনশাআল্লাহ নতুন সরকার গঠন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমি আমার কর্মজীবনে ফেরত যাব। আশা করি, আপনারা আমাকে ভুলে যাবেন এবং মাফ করে দেবেন। আমি ভুলে থাকতে চাই।

গৃহায়ন ও গণপূর্ত, শিল্প এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান গত ৩১ জানুয়ারি তার সরকারি বাসা ছেড়ে দিয়েছেন। তিনি তার কূটনৈতিক পাসপোর্টও জমা দিয়েছেন। উপদেষ্টার দপ্তর থেকে এ তথ্য জানা যায়। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ, রেল, সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান তার পাসপোর্ট জমা দিয়েছেন। বাসা ছাড়ারও প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি। ধর্ম উপদেষ্টার দায়িত্বে আছেন ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন।

তার দপ্তরের একজন কর্মকর্তা জানান, উপদেষ্টা তার কূটনৈতিক পাসপোর্ট জমা দিয়েছেন। সচিবালয়ের দপ্তরে থাকা নিজের বইপত্রসহ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গোছাচ্ছেন। দায়িত্ব শেষ হওয়ার পরই বাসা ছেড়ে দেবেন। পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদের সহকারী একান্ত সচিব কামরুন নাহার জানান, স্যার কূটনৈতিক পাসপোর্ট নেননি। সরকারি বাড়িও নেননি। তাই স্যারের এগুলো ফিরিয়ে দেয়ার বিষয় নেই। আর সম্পদের হিসাব স্যার জমা দিয়েছেন। মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার দায়িত্বে রয়েছেন শারমীন এস মুরশিদি।

তার দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, কিছুদিন আগে কূটনৈতিক পাসপোর্ট জমা দিয়েছেন তিনি। বাসা ছাড়ার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম সরকারি বাড়ি নেননি। তিনি তার কূটনৈতিক পাসপোর্ট জমা দিয়েছেন বলে তার দপ্তর থেকে জানা যায়। এদিকে জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সচিব কানিজ মওলা গণমাধ্যমকে জানান, বঙ্গভবনের পক্ষ থেকে সংসদ সচিবালয়কে নতুন সরকারের শপথ আয়োজনের প্রস্তুতি নিতে বলা হলে তাৎক্ষণিকভাবে প্রস্তুতি শুরু করা হয়।

আজ মঙ্গলবার সকালে সংসদ সদস্যদের এবং বিকেলে নতুন সরকারের শপথ গ্রহণের আয়োজন করা হচ্ছে সংসদের দক্ষিণ প্লাজায়। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, ১৭ ফেব্রুয়ারি শপথ অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। শপথ অনুষ্ঠানটি স্মরণীয়ভাবে আয়োজনের নির্দেশনা রয়েছে এবং আমন্ত্রিত অতিথিদের তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে।

শপথ অনুষ্ঠান বঙ্গভবনের দরবার হলে হলেও এবার সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় অনুষ্ঠিত হবে। এবার স্থান পরিবর্তনের মাধ্যমে সেই রীতিতে ব্যতিক্রম ঘটতে যাচ্ছে। সংবিধান অনুযায়ী গেজেট প্রকাশের পর তিনদিনের মধ্যে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ নিতে হয়।

শুক্রবার রাতে নির্বাচন কমিশন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের ২৯৯ আসনের মধ্যে ২৯৭টির গেজেট প্রকাশ করে। নির্বাচনে বিএনপি এককভাবে ২০৯ আসন পেয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। তাদের এক সময়ের মিত্র জামায়াতে ইসলামী পেয়েছে ৬৮ আসন। বাকি আসনগুলোতে জয় পেয়েছেন অন্যান্য দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা।

 

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
Share on email