
চট্টগ্রামে ফের বেপরোয়া হয়ে উঠেছে ‘কিশোর গ্যাং’ অপরাধী। বয়সে কিশোর, ছোটরাই করছে বড় বড় অপরাধ। সবাই স্কুল ও কলেজপড়ুয়া। নগরীর প্রায় সব এলাকায় কিছু হতে না হতেই‘লাঠিসোঁটা ও অস্ত্র’ নিয়ে প্রকাশ্যে তাদের মহড়া নিত্যদিনের ঘটনায় পরিনত হয়েছে ।এলাকার কেউ এর প্রতিবাদ করলেই করা হয় মারধর। খুন, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, ডাকাতি, দাঙ্গা-হাঙ্গামাসহ প্রায় সব ধরনের অপরাধেই তারা সম্পৃক্ত। তাদের নিয়ন্ত্রণে রীতিমতো হিমশিম পুলিশ। নিজেদের মধ্যে আধিপত্যের বিরোধ, খেলতে গিয়ে কথা কাটাকাটির মতো তুচ্ছ ঘটনায়ও এরা জড়িয়ে পড়ছে খুনাখুনিতে।
গতকাল বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) রাতে বিটাক বাজার মোড়ের একটি কারখানার সামনে পূর্ব বিরোধের জেরে দুর্বৃত্তের ছুরিকাঘাতে আকাশ দাশ নামে এক যুবক নিহত হয়েছেন। পরিবারের দাবি, তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে।
আকাশ দাশের সহকর্মীরা জানান, এই চক্রটি কয়েকমাস আগে কারখানার শ্রমিকদের কাছে চাঁদা দাবি করেছিলেন। আকাশ দাশের প্রতিবাদের মুখে চাঁদা নিতে পারেননি তারা। এছাড়া নানা বিষয়ে তার সঙ্গে বিরোধ ছিল তাদের।
নিহতের ভাই সাগর দাশ জানান, রাত ৮টার দিকে বাসায় ভাত খেয়ে কর্মস্থলে যান আকাশ। কারখানার সামনে পৌঁছালে সহকর্মী মাইকেলের সঙ্গে স্থানীয় ফকিরবাড়ির রাতুল, ইমন, মহসিন, নাজমুলকে বাগবিতণ্ডা করতে দেখেন। একপর্যায়ে মাইকেলকে তারা মারধর করলে এগিয়ে যান আকাশ। তিনিও তাদের সঙ্গে বাগবিতণ্ডায় জড়ান। এই সময় ওই যুবকরা আরো কয়েকজনকে ডেকে এনে আকাশ দাশকে প্রথমে মাথায় হেলমেট দিয়ে আঘাত করেন। একপর্যায়ে ছুরিকাঘাত করে পালিয়ে যান। পরে পরিবারের সদস্য ও তার সহকর্মীরা তাকে উদ্ধার করে স্থানীয় আল আমিন হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখান থেকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে এলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।পুলিশ জানান, এই বিষয়ে মামলা দায়ের হলে আসামিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) ১৬ থানার ওসিকে পুলিশ কমিশনার নির্দেশনা দিয়েছেন কিশোর অপরাধ ও তাদের মদদদাতাদের তালিকা তৈরি করতে। এছাড়া ১৪৫ জন বিট কর্মকর্তা তাদের বিটের নির্ধারিত এলাকায় অবস্থান নিয়ে কিশোর গ্যাং ও তাদের মদদদাতাদের সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করার কথা ছিল।কিন্তু কিছুই হয়নি।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্র জানায়, নগরীতে ছিনতাইয়ের কবলে পড়েছেন-এমন কয়েক ব্যক্তির সঙ্গে আলাপ করে জানতে পেরেছেন, যারা তাদের টাকাপয়সা ছিনিয়ে নিয়েছে, তাদের বেশির ভাগের বয়স ১৪ থেকে ১৮ বছর। সন্ধ্যার পর নগরীর স্টেশন রোড, বিআরটিসি মোড়, কদমতলী, চকবাজার, মেডিকেল হোস্টেল, শিল্পকলা একাডেমি, সিআরবি, খুলশি, ফ’য়স লেক, ডেবারপাড়, চান্দগাঁও শমসের পাড়া, ফরিদের পাড়া, আগ্রাবাদ সিজিএস কলোনি, সিডিএ, ছোটপুল, হালিশহর, বন্দর কলোনি ও পতেঙ্গার বেশ কয়েকটি এলাকায় মাদক বেচাকেনা, মোটরসাইকেল ও সাইকেল ছিনতাই করছে তারা।এ ছাড়াও নগরীর অলি,গলিতে গ্রুফ হয়ে প্রতিনিয়ত আড্ডা তাকে কিশোর গ্যাংরা।
পুলিশ জানায়, সিএমপিতে আট থেকে নয় শতাধিক কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে। একেক দলে রয়েছে ১০ থেকে ১৫ জন। পুলিশের হিসাবে, নগরজুড়ে এসব গ্যাংয়ের সদস্যসংখ্যা অন্তত ১ হাজার ৪০০। কিশোর গ্যাংয়ের প্রশ্রয় দিয়ে ছিল পালাতক আওয়ামীলীগ নেতারা। চট্টগ্রামে ৪/৫ জন কিশোর গ্যাং নেতা সিটি কর্পোরেশন এর কাউন্সিলর হন।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) একজন কর্মাকর্তা জানান, গত আওয়ামীলীগ সরকারের সময় পুলিশ ও র্যাব চট্টগ্রামে কিশোর গ্যাংয়ের একটি তালিকা করে। তখন কিশোর গ্যাংয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় ছিল স্থানীয় ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগ নেতারা। ছিলেন ওয়ার্ড কাউন্সিলররা। তারা চট্টগ্রাম শহরে কিশোর গ্যাং-এর এমন ৬৪ জন ‘বড় ভাই’ চিহ্নিত করেছিল।আওয়ামীলীগের পতনের পর এ সব কিশোর গ্যাংরা পালিয়ে ছিল অনেক দিন।এখন আবার বের হয়ে নানান অপরাধে জড়িত হচ্ছে।প্রতি বছর ঈদের আগে ছিনতাই কারী এবং কিশোর গ্যাংরা ছিনতাই এর নেশায় পাগল হয়ে যায়।
২০১৮ সালে উত্তর ও দক্ষিণ জোনের ৮ থানায় কিশোরদের ১৭৮টি আড্ডার স্থান চিহ্নিত করা হয়েছিল। এরপর সেসব স্থানে বাড়ানো হয়েছিল নজরদারি। কিন্তু সেই কার্যক্রম বেশিদিন আর অব্যাহত থাকেনি। বর্তমানে আড্ডার স্থানগুলো নজরদারি বাইরে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে এসব খোঁজখবর রাখার ব্যাপারে অভিভাবকদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। অভিভাবকরা নিজ নিজ অবস্থান থেকে সচেতন হলে কিশোর অপরাধ অনেকেটাই রোধ করা সম্ভব।
আবার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পারিবারিক ও ধর্মীয় শিক্ষার অভাব, মাদক, ভার্চুয়াল জগতে আসক্ত ও কথিত বড় ভাইদের আশ্রয়-পশ্রয়ে কিশোররা বেপরোয়া হয়ে উঠছে। কিশোর বয়সের অপরিপক্কতাকে কাজে লাগিয়ে যারা তাদের খুনী বানাচ্ছে তাদেরও বিচারের আওতায় আনা প্রয়োজন।না হয় দিদি বাড়বে ।







