সাবেক স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী কারাগারে

সাবেক স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী কারাগারে

বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতির ইতিহাসে অন্যতম দীর্ঘকালীন স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর ভাগ্যে যুক্ত হলো নতুন এক অধ্যায়। রাজধানীর লালবাগ থানায় দায়েরকৃত একটি হত্যাচেষ্টা মামলায় আদালত তার রিমান্ড আবেদন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন।

গত কয়েক ঘণ্টার নাটকীয়তা, মধ্যরাতের অভিযান এবং আদালত প্রাঙ্গণের উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে সমাপ্তি ঘটল এক সময়ের ক্ষমতাধর এই ব্যক্তিত্বের মুক্ত অবস্থানের।

ঘটনার সূত্রপাত সোমবার দিবাগত গভীর রাতে। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে রাজধানীর ধানমন্ডির ৮/এ রোডে একটি বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। জানা গেছে, ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী সেখানে তার চাচাতো ভাই আরিফ মাসুদ চৌধুরীর বাসায় অবস্থান করছিলেন।

রাত আনুমানিক সাড়ে ৪টার দিকে তাকে ওই বাসা থেকে আটক করা হয়। আটকের পর তাকে সরাসরি রাজধানীর মিন্টো রোডে অবস্থিত ডিবি (গোয়েন্দা) কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শেষে আজ দুপুরে তাকে আদালতে হাজির করা হয়।

মঙ্গলবার দুপুর ১টা ৫৫ মিনিটে কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীকে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে আনা হয়। তাকে হাজতখানায় রাখার সময় থেকেই আদালত প্রাঙ্গণে তার অনুসারী ও আইনজীবীদের ভিড় বাড়তে থাকে।

শুনানি শুরু হলে এজলাসের ভেতরেই শুরু হয় চরম হট্টগোল। শিরীন শারমিনের পক্ষের আইনজীবীরা মামলার আইনি ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং পুলিশের রিমান্ড আবেদনের তীব্র বিরোধিতা করেন। পরিস্থিতির সামাল দিতে আদালতকে বেশ বেগ পেতে হয়।

আসামিপক্ষের আইনজীবীরা দাবি করেন, মূল মামলায় শিরীন শারমিন চৌধুরীর সরাসরি কোনো সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ নেই। রিমান্ড আবেদনে কোথাও উল্লেখ করা হয়নি যে তিনি নিজে গুলি করেছেন বা সরাসরি কোনো সহিংসতায় নেতৃত্ব দিয়েছেন। তারা এটিকে একটি ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ‘মামলা হিসেবে অভিহিত করে তার জামিন প্রার্থনা করেন।

উভয় পক্ষের দীর্ঘ শুনানি শেষে আদালত পুলিশের করা রিমান্ড আবেদনটি নাকচ করে দেন। তবে একই সাথে জামিন আবেদনও তাৎক্ষণিকভাবে গ্রহণ না করে তাকে জেলহাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন। এই আদেশের পরপরই তাকে প্রিজন ভ্যানে করে কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়।

ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর পতন ও বর্তমান পরিস্থিতি অনেকের কাছেই অপ্রত্যাশিত। দেশের প্রথম নারী স্পিকার হিসেবে তিনি দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে জাতীয় সংসদের অভিভাবকের দায়িত্ব পালন করেছেন।

২০১৩ সালের ৩০ এপ্রিল তিনি প্রথমবারের মতো স্পিকার নির্বাচিত হন। ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচনগুলোর পরও তিনি টানা এই সম্মানজনক পদে বহাল ছিলেন।তিনি রংপুর-৬ (পীরগঞ্জ) আসন থেকে সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়ে আসছিলেন।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দেশজুড়ে যে অস্থিরতা তৈরি হয়, তার ধারাবাহিকতায় তিনিও স্পিকারের পদ থেকে পদত্যাগ করেন।

সম্প্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদে উঠে এসেছে যে, ৫ আগস্ট সরকার পতনের চূড়ান্ত মুহূর্তে ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীসহ আওয়ামী লীগের অন্তত ১২ জন প্রভাবশালী নেতা সংসদ ভবনের ভেতরে আত্মগোপন করেছিলেন। সেখান থেকে পরবর্তী সময়ে তিনি নিরাপদ আশ্রয়ে চলে গেলেও শেষ পর্যন্ত আইনের হাত থেকে রক্ষা পাননি।

লালবাগ থানার এই হত্যাচেষ্টা মামলায় আরও অনেক হেভিওয়েট নেতার নাম জড়িয়েছে। ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীকে কারাগারে পাঠানোর মাধ্যমে মামলাটি এখন নতুন দিকে মোড় নিতে পারে। আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ডিবির জিজ্ঞাসাবাদে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে আগামীতে আরও তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে।

বর্তমানে তিনি কেন্দ্রীয় কারাগারে সাধারণ বন্দি হিসেবে থাকবেন নাকি বিশেষ কোনো সুবিধা পাবেন, তা নিয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো নির্দেশনা পাওয়া যায়নি। তবে একজন সাবেক স্পিকার হিসেবে জেল কোড অনুযায়ী তিনি কিছু সুযোগ-সুবিধা পেতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

দেশের সর্বোচ্চ আইনসভার অভিভাবক থেকে আজ আদালতের কাঠগড়ায় ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী এই পরিবর্তন বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এক বড় বার্তা বহন করছে। আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারের প্রক্রিয়ায় এই মামলার গতিপ্রকৃতি কোন দিকে যায়, এখন সেটাই দেখার বিষয়।

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
Share on email