ইরান-যুক্তরাষ্ট্র গঠনমূলক সংলাপের প্রত্যাশায় পাকিস্তান

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র গঠনমূলক সংলাপের প্রত্যাশায় পাকিস্তান

এই ছবির ডান পাশে থাকা মোহাম্মদ ইসহাক দার, ভ্যান্স পৌঁছালে তাকে অভ্যর্থনা জানান।

সম্প্রতি ইসলামাবাদের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অঙ্গন এক বিশেষ তৎপরতার সাক্ষী হলো। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের পাকিস্তান সফরের মধ্য দিয়ে দক্ষিণ এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে এক নতুন সমীকরণ উন্মোচিত হয়েছে।

পাকিস্তানের উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ ইসহাক দার মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্টকে স্বাগত জানানোর পাশাপাশি একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা প্রদান করেছেন। তিনি আশা প্রকাশ করেছেন যে, ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদী আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শান্তি বজায় রাখার স্বার্থে একে অপরের সাথে গঠনমূলক সংলাপে লিপ্ত হবে।

ইসলামাবাদে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স যখন অবতরণ করেন, তখন তাঁকে স্বাগত জানান পাকিস্তানের সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসনের শীর্ষ ব্যক্তিবর্গ। পাকিস্তানের চিফ অফ ডিফেন্স ফোর্সেস ও সেনাবাহিনী প্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির এবং উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ ইসহাক দারের উপস্থিতি এই সফরের গুরুত্বকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার যুক্তরাষ্ট্রের এই প্রচেষ্টাকে সাধুবাদ জানিয়েছেন।

তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি প্রশংসনীয়। তবে পাকিস্তানের মূল বার্তাটি ছিল ইরান কেন্দ্রিক। পাকিস্তান মনে করে, মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা প্রশমনে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে সরাসরি ও ইতিবাচক যোগাযোগ এখন সময়ের দাবি।

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার বৈরিতা কয়েক দশকের পুরনো। ১৯৭৯ সালের ইসলামিক বিপ্লবের পর থেকে এই দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রায় বিচ্ছিন্ন। পরমাণু কর্মসূচি, আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার এবং বিভিন্ন ছায়া যুদ্ধের কারণে এই সম্পর্ক বারবার তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। ২০১৫ সালে স্বাক্ষরিত পরমাণু চুক্তি থেকে ২০১৮ সালে তৎকালীন ট্রাম্প প্রশাসনের সরে আসা এবং পরবর্তীতে ইরানের ওপর একের পর এক নিষেধাজ্ঞা আরোপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।

বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান অস্থিতিশীলতায়, এই দুই দেশের বৈরিতা কেবল এই অঞ্চলেই নয়, বরং সারা বিশ্বের জ্বালানি নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পাকিস্তান ঐতিহাসিকভাবেই ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্র, উভয় দেশের সাথেই সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করে। ইরানের সাথে পাকিস্তানের রয়েছে দীর্ঘ সীমান্ত, ধর্মীয় বন্ধন এবং সাংস্কৃতিক সংযোগ। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বিদ্যমান। পাকিস্তান এমন এক অবস্থানে রয়েছে যেখানে তারা ইরানের প্রতিবেশী এবং যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র।

ইসহাক দারের বক্তব্যে এই ভারসাম্য রক্ষার সুস্পষ্ট ছাপ পাওয়া যায়। তিনি কেবল শান্তি কামনা করেননি, বরং পাকিস্তান যে দুই পক্ষের মধ্যে একটি স্থায়ী ও টেকসই সমাধান নিশ্চিত করতে মধ্যস্থতা করতে আগ্রহী, সেই সংকল্পও পুনর্ব্যক্ত করেছেন। মধ্যপ্রাচ্যে কোনো বড় ধরনের সংঘর্ষ শুরু হলে তার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়বে পাকিস্তানের ওপর। জ্বালানি সংকট থেকে শুরু করে শরণার্থী সমস্যা, সবকিছুই পাকিস্তানের ভঙ্গুর অর্থনীতিকে বিপদে ফেলতে পারে। তাই ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের গঠনমূলক সম্পৃক্ততা পাকিস্তানের নিজস্ব জাতীয় স্বার্থের সাথে জড়িত।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার কেন গঠনমূলক সম্পৃক্ততার ওপর জোর দিচ্ছেন, তার পেছনে কয়েকটি যৌক্তিক কারণ রয়েছে। ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে চলমান অচলাবস্থা নিরসনে আলোচনার বিকল্প নেই। নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং পরমাণু সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা, এই দুইয়ের মধ্যে একটি সমতা আনয়ন জরুরি।

এছাড়া পারস্য উপসাগরে স্থিতিশীলতা বজায় থাকলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম স্বাভাবিক থাকে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা কমলে বৈশ্বিক সরবরাহ চেইন নিরাপদ হবে। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্য ও আফগানিস্তানে উগ্রবাদ দমনে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়েরই স্বার্থ রয়েছে। গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান বা ছায়া যুদ্ধ বন্ধের মাধ্যমে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব।

মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের সফরটি কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ায় মার্কিন প্রভাব বজায় রাখার একটি কৌশলগত পদক্ষেপ। জেডি ভ্যান্সের সাথে ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের সাক্ষাৎ নির্দেশ করে যে, পাকিস্তান তার নিরাপত্তা ও বৈদেশিক নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

তবে প্রশ্ন থেকে যায়, ইরান এই সংলাপে কতটা আগ্রহী হবে? সম্প্রতি তেহরান বারবার বলে এসেছে যে, সংলাপের আগে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং যথাযথ সম্মানের পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। অন্যদিকে, ওয়াশিংটন চায় ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব এবং ব্যালেস্টিক মিসাইল কর্মসূচিতে লাগাম টানতে।

পাকিস্তান তার ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে সবসময়ই একটি কূটনৈতিক সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করতে চায়। মোহাম্মদ ইসহাক দারের দেওয়া বিবৃতিতে পাকিস্তানের সেই দীর্ঘদিনের পররাষ্ট্রনীতির প্রতিফলন ঘটেছে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি স্থায়ী ও টেকসই সমাধান কেবল পাকিস্তানের কাম্য নয়, বরং এটি সারা বিশ্বের শান্তির জন্য জরুরি। যদি পাকিস্তান সত্যিই এই দুই পরাশক্তিকে আলোচনার টেবিলে আনতে পারে, তবে তা হবে দেশটির ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কূটনৈতিক সাফল্য।

তবে এর জন্য প্রয়োজন প্রবল ধৈর্য, নিরপেক্ষতা এবং বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর আন্তরিক সহযোগিতা। জেডি ভ্যান্সের এই সফর হয়তো সেই দীর্ঘ যাত্রার একটি সূচনা মাত্র হতে পারে। পরিশেষে বলা যায়, মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ থেকে যুদ্ধের মেঘ সরানোর জন্য সংলাপের কোনো বিকল্প নেই। পাকিস্তান সেই সংলাপের অনুঘটক হিসেবে কাজ করতে প্রস্তুত, যা একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। তথ্যসূত্র: রয়টার্স।

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
Share on email