
পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের ২৪ বছরের বিশ্বকাপ খরা কাটানোর মিশন থমকে গেল নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামেই। শেষ ১৬-র রুদ্ধশ্বাস ও নাটকীয় মহাকাব্যে ব্রাজিলকে ২-১ ব্যবধানে হারিয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার ঐতিহাসিক রেকর্ড গড়েছে নরওয়ে। নরওয়েজিয়ান গোলমেশিন এরলিং হালান্ডের শেষ ১১ মিনিটের ম্যাজিক এবং গোলপোস্টের নিচে ওরিয়ান নাইল্যান্ডের অতিমানবীয় প্রাচীরের সামনে ভেঙে চুরমার হয়ে গেল কার্লো আনচেলত্তির ব্রাজিলের ‘হেক্সা’ স্বপ্ন। ১৯৯০ সালের পর এই প্রথম বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালের আগেই (শেষ ১৬ থেকে) বিদায় নেওয়ার চরম লজ্জায় ডুবল সেলেসাওরা।
সবশেষ ১৯৯০ সালে বিশ্বকাপে শেষ ষোলো থেকে বিদায় নিয়েছিল ব্রাজিল। সেবার গ্রুপ পর্বে তিন ম্যাচই জিতেছিল সেলেসাওরা। তবে শেষ ষোলোয় আর্জেন্টিনার কাছে ১-০ গোলে হেরে কোয়ার্টার ফাইনালের আগেই বিদায় নেয় ব্রাজিল।
জাপান ম্যাচের নায়ক গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেলিকে শুরু থেকেই নামিয়েছিলেন আনচেলত্তি। ম্যাচের প্রথমার্ধে ম্যাথিউস কুনিয়াক বক্সের ভেতর ক্রিস্টোফার আয়ের ফাউল করলে ভিএআর এর নাটকের পর পেনাল্টি পায় ব্রাজিল। কিন্তু ব্রুনো গিমারায়েসের দুর্বল পেনাল্টি শটটি বাম দিকে ঝাঁপিয়ে দুর্দান্তভাবে রুখে দেন নরওয়েজিয়ান কিপার নাইল্যান্ড।
পেনাল্টি সেভের পর নাইল্যান্ডের আত্মবিশ্বাস আকাশ ছুঁয়ে ফেলে। মার্তিনেলির শটে গিমারায়েসের সহজ ট্যাপ-ইন রুখে দেওয়া থেকে শুরু করে মার্টিন ওডেগার্ডের ভুলের পর ভিনিসিউস জুনিয়রের শট পা দিয়ে ঠেকানো- প্রথমার্ধে একাই ব্রাজিলকে গোলবঞ্চিত রাখেন তিনি। অন্যদিকে নরওয়ের প্যাট্রিক বার্গের ৩ মিনিটের গোলটি অফসাইডের কারণে বাতিল না হলে শুরুতেই ব্যাকফুটে চলে যেত সেলেসাওরা।
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে স্ট্রাইকার অ্যান্ড্রিয়াস শেল্ডেরুপ ও অস্কার ববকে মাঠে নামান নরওয়ে কোচ স্টেল সোলবাকেন। কিন্তু ব্রাজিলের হয়ে তরুণ বিস্ময় এনড্রিক মাঠে নেমেই সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া করেন। ভিনিসিউসের পাস থেকে ওয়ান-টু-ওয়ান পজিশনে বল পোস্টের বাইরে মারেন তিনি। রায়ানের বুলেট শটও রুখে দেন নাইল্যান্ড।
৬৭ মিনিটে গ্যালারির গর্জন কাঁপিয়ে মাঠে নামেন ইনজুরি কাটিয়ে ফেরা নেইমার জুনিয়র। কিন্তু ব্রাজিল যখন আক্রমণে ব্যস্ত, ঠিক তখনই কাউন্টার অ্যাটাক থেকে প্রথম আঘাতটি হানে নরওয়ে।
ম্যাচের ৭৯ মিনিটে বাম প্রান্ত থেকে শেল্ডেরুপের মাপা ক্রসে গ্যাব্রিয়েল মাগাহেসকে টপকে চোখধাঁধানো এক হেডে নরওয়েকে ১-০ গোলে এগিয়ে নেন হালান্ড। গোল খেয়ে ব্রাজিল যখন মরিয়া, তখন ডিফেন্ডার আয়েরের আত্মঘাতী বলও হাত দিয়ে ঠেকিয়ে দেন নাইল্যান্ড। ৯০ মিনিটে বক্সের প্রান্ত থেকে দুর্দান্ত এক লো-ড্রাইভ শটে বল জালে জড়িয়ে নরওয়েকে ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে নিয়ে ব্রাজিলের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠোকেন হালান্ড।
ম্যাচের অতিরিক্ত সময়ের ১০ম মিনিটে বক্সের ভেতর ক্যাসিমিরোকে কনুই দিয়ে আঘাত করায় পেনাল্টি পায় ব্রাজিল। গোলরক্ষক নাইল্যান্ডের সাথে পেনাল্টি নেওয়ার আগে একদফা অনাকাঙ্ক্ষিত হাতাহাতি ও স্লেজিংয়ের পর নেইমার পেনাল্টি থেকে গোল করে ব্যবধান ২-১ করলেও, তা কেবল সান্ত্বনাই বয়ে এনেছে। রেফারি শেষ বাঁশি বাজাতেই ইতিহাস গড়ার উল্লাসে মাতে নরওয়ে।
কোচ হিসেবে কার্লো আনচেলত্তির আগমনও ব্রাজিলের ভাগ্য ফেরাতে পারল না। ২০০২ সালের পর থেকে বিশ্বকাপের নকআউটে ইউরোপীয় কোনো দলকে হারাতে না পারার যে অপবাদ, তা আরও একবার সত্য প্রমাণিত হলো। ২০০৬ থেকে ২০২৬- টানা ছয়টি বিশ্বকাপে ইউরোপের দলের কাছে হেরেই বিদায় নিতে হলো ব্রাজিলকে।
এই ঐতিহাসিক জয়ের পর আগামী ১১ জুলাই মিয়ামির মাঠে কোয়ার্টার ফাইনালের মহারণে নরওয়ে মুখোমুখি হবে টুর্নামেন্টের সহ-আয়োজক মেক্সিকো অথবা থমাস টুখেলের ইংল্যান্ডের মধ্যকার ম্যাচের বিজয়ীর বিরুদ্ধে। আর মাঠের বাইরে সাদিয়ার মতো বড় স্পন্সরশিপের সুসংবাদ এলেও, মাঠের ভেতরে আরেকটি বিশ্বকাপ ট্র্যাজেডি নিয়ে চোখের জলে বিদায় নিতে হলো সেলেসাওদের।







