টানা বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা, স্থবির চট্টগ্রাম

টানা বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা, স্থবির চট্টগ্রাম
টানা তিন দিনের রেকর্ড বৃষ্টিতে চট্টগ্রাম মহানগরীর বিভিন্ন এলাকায় এবং জেলার বিভিন্ন উপজেলায় অনেক অংশ পানির নিচে তলিয়েগেছে।রাত এবং বুধবার সারাদিন বৃষ্টি হয়েছে।  জলাবদ্ধতার পানি কমতে সময় লাগায় নগরের জনজীবন কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে।অন্যদিকে নগরী ও জঙ্গল সলিমপুরে পাহাড় ধসে দুই শিশু নিহত হয়েছেন।সকাল থেকে সিটি মেয়র ও সিডিএ চেয়ারম্যান নগরীর বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করেন। সড়ক, অলিগলি, বাসাবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল থেকে শুরু করে ব্যবসা কেন্দ্রগুলোও পানিতে ডুবে মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়িয়েছে। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির চিত্র দেখা গেছে নগরের ঐতিহ্যবাহী রিয়াজউদ্দিন বাজারে, যেখানে হাঁটু সমান পানিতে দিনের শুরু করেছেন ব্যবসায়ীরা।চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত করে আগেরদিন রাতে।

জলাবদ্ধতায় বিপর্যস্ত নগরজীবন

চকবাজার, কাতালগঞ্জ, আগ্রাবাদ, হালিশহর, চান্দগাঁও, মোহরা, কুয়াইশ ও অক্সিজেনসহ নগরের বিভিন্ন নিচু এলাকায় সড়ক, অলিগলি, ভবনের নিচতলা এবং দোকানপাটে পানি উঠে গেছে। অনেক পরিবারের রান্নাঘরের চুলা পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় স্বাভাবিক রান্নাবান্নাও ব্যাহত হচ্ছে। অনেকেই ঘরবন্দি অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন।

জলাবদ্ধতার পানি ঢুকেছে বিভিন্ন স্কুল, কলেজ, মাদরাসা ও হাসপাতালের নিচতলাতেও। পরিস্থিতি বিবেচনায় বুধবারের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা স্থগিত করেছে চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ড। একই সঙ্গে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অভ্যন্তরীণ পরীক্ষা ও শ্রেণি কার্যক্রমও বন্ধ রেখেছে। এতে অভিভাবকদের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে।

হাঁটু পানিতে শুরু ব্যবসার দিন

বুধবার (৮ জুলাই) সকালে সরেজমিনে রিয়াজউদ্দিন বাজারে গিয়ে দেখা যায়, বাজারের অধিকাংশ গলি ও দোকানের সামনে হাঁটু সমান পানি জমে আছে। অনেক দোকানের ভেতরেও পানি ঢুকে পড়েছে। ব্যবসায়ীরা মালামাল উঁচু স্থানে তুলে রাখছেন, কেউ বালতি দিয়ে পানি সেচছেন, আবার কেউ ভেজা পণ্য শুকানোর চেষ্টা করছেন। কিন্তু ক্রেতার উপস্থিতি ছিল খুবই কম। ফলে সকাল থেকেই ব্যবসা কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে।

রিয়াজউদ্দিন বাজারের বিক্রয়কর্মী ধনঞ্জয় বলেন, ‘বৃষ্টি কমেছে, কিন্তু সকালে দোকানে এসে দেখি পুরো রিয়াজউদ্দিন বাজার এক হাঁটু পানিতে ডুবে গেছে। সকাল সাড়ে ১১টার দিকে পানি নেমে গেছে। তবে বাজারে কোনো ক্রেতা নেই। এদিকে পানিতে ভেজায় অনেক পণ্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।’

নগরের বাইরে বন্যা, ব্যাহত যোগাযোগ

নগরের বাইরেও দুর্যোগের প্রভাব বিস্তৃত হয়েছে। হাটহাজারী, রাউজান, রাঙ্গুনিয়া, বোয়ালখালী, সাতকানিয়া ও সীতাকুণ্ডসহ প্রায় সব উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। কোথাও কোথাও মহাসড়ক পানিতে তলিয়ে গেছে। ডুবে গেছে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথের কিছু অংশও। ফলে নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে ষোলশহর স্টেশনে আটকে পড়া কক্সবাজারগামী একটি ট্রেনের যাত্রা বাতিল করা হয়েছে। সন্দ্বীপের সঙ্গে যাতায়াতও কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে।

রেকর্ড বৃষ্টির পরও সতর্কতা বহাল

পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, বুধবার সকাল ৯টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় ২৩৭ দশমিক ৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এর আগের দিন মঙ্গলবার ২৪ ঘণ্টায় ৪১২ দশমিক ৩ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে, যা গত ৪২ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এর আগে ২০০৭ সালে ৪০৮ মিলিমিটার এবং ১৯৮৩ সালে ৫১১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছিল।

পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ বিশ্বজিৎ চৌধুরী বলেন, ‘সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত বহাল রয়েছে। পাশাপাশি জলাবদ্ধতা ও পাহাড়ধসের ঝুঁকিও এখনো বিদ্যমান।’

আকাশপথ স্বাভাবিক, পাহাড়ে সতর্কতা

দুর্যোগের মধ্যেও আকাশপথে স্বস্তির খবর দিয়েছে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ। জনসংযোগ কর্মকর্তা প্রকৌশলী মোহাম্মদ ইব্রাহিম খলিল জানান, বুধবার কোনো ফ্লাইট বাতিল, বিলম্ব বা ডাইভার্ট হয়নি। বিমানবন্দরের নিয়মিত ফ্লাইট পরিচালনা স্বাভাবিক রয়েছে।

অন্যদিকে পাহাড়ধসের ঝুঁকি মোকাবিলায় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ও জেলা প্রশাসন আশ্রয়কেন্দ্র চালু রেখেছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় মাইকিং করে মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে। মেয়রের নির্দেশনায় ১০১ সদস্যের কুইক রেসপন্স টিম জলাবদ্ধতা নিরসন ও জরুরি সেবায় মাঠে কাজ করছে।

 পাহাড়ধসে শিশুর মৃত্যু

ভারী বৃষ্টির কারণে চট্টগ্রাম নগরীর শুলকবহর এলাকায় পাহাড়ধসে সুমাইয়া আক্তার নামে ১১ বছর বয়সী এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। বুধবার (৮ জুলাই) টানা ভারী বর্ষণের মধ্যে নগরের ৮ নম্বর শুলকবহর ওয়ার্ডের স্টেশনসংলগ্ন মুক্তিযোদ্ধা পাহাড় এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে।

পাঁচলাইশ থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) রিয়াজুল সালেহীন বলেন, কলোনিতে পাহাড়ের পাদদেশে ছয়টি ঘর ছিল। তার মধ্যে ৩ ও ৪ নম্বর ঘরের ওপর পাহাড়ের মাটি ধসে পড়ে এবং ৩ নম্বর ঘরে সুমাইয়ার মৃত্যু হয়।

বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন চমেক হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির উপ-পরিদর্শক (এসআই) আলাউদ্দীন মজুমদার। তিনি বলেন, দুপুরে নগরীর চশমা হিল এলাকায় দেয়াল ধসে সুমাইয়া নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে।টানা ভারী বর্ষণের কারণে চট্টগ্রামের পাহাড়ঘেঁষা এলাকাগুলোতে পাহাড়ধসের ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় জেলা প্রশাসন ও সিটি করপোরেশন ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে বসবাসকারীদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

 

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
Share on email