হাবিবুর রহমানসহ ৩ জনের মৃত্যুদণ্ড, ২ জনের আমৃত্যু কারাদণ্ড

হাবিবুর রহমানসহ ৩ জনের মৃত্যুদণ্ড, ২ জনের আমৃত্যু কারাদণ্ড

চব্বিশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে রাজধানীর রামপুরা-বনশ্রী এলাকায় নিরস্ত্র আন্দোলনকারীদের ওপর চালানো হামলাকে ‘রাষ্ট্রীয় নীতির অংশ হিসেবে পরিচালিত ব্যাপক ও পরিকল্পিত আক্রমণ’ বলে মন্তব্য করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১।

এই মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ পুলিশের তিন কর্মকর্তাকে মৃত্যুদণ্ড এবং দুই কর্মকর্তাকে যাবজ্জীবন ও বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

গত ১৬ জুলাই প্রকাশিত ১৪৭ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়ে ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, খিলগাঁও জোনের তৎকালীন অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার (এডিসি) মো. রাশেদুল ইসলাম এবং রামপুরা থানার তৎকালীন ওসি মো. মশিউর রহমানকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

এছাড়া কার্নিশে ঝুলন্ত এক তরুণকে পরপর গুলি করার দায়ে এসআই তারিকুল ইসলামকে যাবজ্জীবন এবং এএসআই চঞ্চল চন্দ্র সরকারকে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত তিন আসামি এবং যাবজ্জীবনপ্রাপ্ত তারিকুল পলাতক থাকলেও চঞ্চল চন্দ্র সরকার কারাগারে রয়েছেন।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের আইন অনুযায়ী, পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা যাবে।

ট্রাইব্যুনালের observaciones (পর্যবেক্ষণে) বলা হয়, রামপুরা-বনশ্রীর ঘটনাগুলো ছিল রাষ্ট্রীয় বাহিনী এবং ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের সদস্যদের সমন্বয়ে বেসামরিক জনগণের বিরুদ্ধে পরিচালিত একটি ব্যাপক ও সুসংগঠিত আক্রমণের অংশ।

তিন অভিযোগ: এ মামলার প্রথম অভিযোগে বলা হয়, ২০২৪ সালে কোটা সংস্কার আন্দোলন দমনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সরাসরি নির্দেশনায় এবং তখনকার ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমানের আদেশে আসামিরা নিজেদের দায়িত্বপ্রাপ্ত এলাকার বাইরে গিয়ে ছাত্র-জনতার ওপর প্রাণঘাতী অস্ত্র দিয়ে আক্রমণ চালান।

ওই বছরের ১৯ জুলাই দুপুর আনুমানিক ২টা থেকে আড়াইটার দিকে বনশ্রী ‘এইচ’ ব্লকে জামে মসজিদের সামনের গলিতে পুলিশ এলোপাতাড়ি গুলি চালায়। তখন মো. নাদিম (৩৮) নামে এক ব্যক্তির পেটে দুটি গুলি লাগে এবং তিনি ঘটনাস্থলেই মারা যান।

দ্বিতীয় অভিযোগে কার্নিশে ঝুলে থাকা ১৮ বছরের তরুণ আমির হোসেনকে হত্যার উদ্দেশ্যে গুলি ও গুরুতর জখম করার ঘটনার বর্ণনা দেওয়া হয়। বলা হয়, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই বিকেলে কর্মস্থল থেকে বাড়ি ফেরার পথে পুলিশের এলোপাতাড়ি গুলি ও ধাওয়া খেয়ে বনশ্রী জামে মসজিদের পাশে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের একটি নির্মাণাধীন ভবনে আশ্রয় নেন আমির হোসেন। আত্মরক্ষায় তিনি ওই ভবনের তৃতীয় তলার ছাদ ঢালাইয়ের পাইপ ধরে ঝুলে ছিলেন। সেখানে এএসআই চঞ্চল চন্দ্র সরকার ও এসআই তারিকুল ইসলাম ভূঁইয়া উপস্থিত হয়ে তাকে নিচে লাফ দিতে বলেন। ওই তরুণ লাফ না দেওয়ায় পরপর ছয়টি গুলি করা হয়। এতে তিনি গুরুতর জখম হন।

তৃতীয় অভিযোগে মায়া ইসলাম (৬০) নামে এক বৃদ্ধাকে গুলি করে হত্যা এবং তার ছয় বছরের নাতি বাসিত খান মুসাকে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ আনা হয়।

২০২৪ সালের ১৯ জুলাই বিকেলে বনশ্রী ‘জি’ ব্লকে রামপুরা থানার সামনের একটি বাসার নিচতলায় গেটের ভেতরে দাদি-নাতি অবস্থান করছিলেন। আসামিরা যখন ক্রমাগত গুলি চালাচ্ছিল, তখন পুলিশের একটি বুলেট শিশু মুসার মাথা ভেদ করে বেরিয়ে যায় এবং তা সরাসরি তার দাদি মায়া ইসলামের পেটে বিদ্ধ হয়। আহত অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মায়া ইসলাম মারা যান।

রায়ের পর্যবেক্ষ “ ট্রাইব্যুনাল বলেছে, নাদিম, মায়া ইসলাম, শিশু বাসিত খান মুসা ও আমির হোসেনের ঘটনাগুলো ‘সেই বৃহত্তর হামলার’ অংশ হিসেবেই সংঘটিত হয়।

‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, রাষ্ট্রীয় নীতির অংশ’: পূর্ণাঙ্গ রায়ে ট্রাইব্যুনাল বলেছে, রামপুরা-বনশ্রীর ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন কোনো ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি ছিল দেশজুড়ে আন্দোলন দমনে পরিচালিত বৃহত্তর অভিযানের অংশ।

পর্যবেক্ষণে বলা হয়, রামপুরা-বনশ্রীর ঘটনাগুলো ছিল রাষ্ট্রীয় বাহিনী এবং ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের সদস্যদের সমন্বয়ে বেসামরিক জনগণের বিরুদ্ধে পরিচালিত একটি ব্যাপক ও সুসংগঠিত আক্রমণের অংশ।

ট্রাইব্যুনাল উল্লেখ করে, তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের বাসভবনে অনুষ্ঠিত একটি ‘কোর কমিটি’র বৈঠকে সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যেখানে প্রাণঘাতী অস্ত্র, ড্রোন ও হেলিকপ্টার ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। শুধু গুলিবর্ষণই নয়, ইন্টারনেট বন্ধ রাখা, মৃতদেহ গুম, অ্যাম্বুলেন্স চলাচলে বাধা, চিকিৎসায় বিঘ্ন সৃষ্টি এবং চিকিৎসকদের ভয়ভীতি প্রদর্শন—এসব ঘটনাও ছিল ‘বেসামরিক জনগণের বিরুদ্ধে পরিচালিত একই পদ্ধতিগত হামলার অংশ’।

আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইনের ৩ ও ৪ ধারা এবং রোম সংবিধির ৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী এই অভিযান মানবতাবিরোধী অপরাধের সংজ্ঞা পূরণ করেছে বলে ট্রাইব্যুনাল সিদ্ধান্ত দিয়েছে।

আদালতে প্রসিকিউশনের জমা দেওয়া একটি পেনড্রাইভ এবং সিআইডির ডিজিটাল ল্যাবের ফরেনসিক পরীক্ষায় সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমানের সরাসরি সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হয়েছে।

ওয়্যারলেসের মাধ্যমে হাবিবুর রহমান নির্দেশ দিয়েছিলেন, “আপনারা সর্বোচ্চ ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারেন… আপনারা নীলিং পজিশনে গিয়ে হাঁটু গেঁড়ে, হাঁটু গেঁড়ে কোমরের নিচে আপনারা গুলি করে দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনবেন, ওভার।”

অডিওটির ফরেনসিক পরীক্ষায় হাবিবুর রহমানের কণ্ঠের সাথে ইতিবাচক মিল পাওয়া যায়।

আসামিপক্ষ আত্মরক্ষার্থে এই নির্দেশের যুক্তি দিলেও ট্রাইব্যুনাল তা নাকচ করে বলেছে, যুদ্ধক্ষেত্রের মতো পরিস্থিতিতে হাঁটু গেড়ে বসে ‘সর্বোচ্চ শক্তি’ প্রয়োগের দাবি বাস্তবসম্মত নয়। বরং তিনি এই শব্দগুলো অত্যন্ত উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ব্যবহার করেছিলেন।

ডিএমপি কমিশনার হিসেবে হাবিবুর রহমানের ভূমিকার ক্ষেত্রে ‘সুপিরিয়র কমান্ড রেসপনসিবিলিটি’ নীতি প্রয়োগ করেছে আদালত। রায়ে বলা হয়, হত্যাযজ্ঞ শেষে ২১ বা ২২ জুলাই রামপুরা থানায় গিয়ে তৎকালীন ওসি মশিউর রহমানকে নগদ এক লাখ টাকা পুরস্কার দেন হাবিবুর রহমান, যা অধস্তন সদস্যদের কর্মকাণ্ডের প্রতি তার ‘সমর্থনেরই প্রতিফলন’।

দাদি-নাতি ও যুবক নাদিমকে হত্যা: রায়ের নথিতে বলা হয়, ১৯ জুলাই জুমার নামাজের পর রামপুরা-বনশ্রী এলাকায় আন্দোলনকারীদের ওপর এলোপাতাড়ি গুলি চালানো হয়। এডিসি রাশেদুল ইসলামের তদারকিতে এবং ওসি মশিউর রহমানের নেতৃত্বে এই হামলা হয়। খোদ ওসি মশিউর তার নিজের করা জিডিতে চাইনিজ রাইফেল থেকে ৬০ রাউন্ড গুলি ছোড়ার কথা স্বীকার করেছিলেন।

সেদিন বনশ্রী মসজিদের সামনে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান মো. নাদিম (৩৮)। একই সময় একটি বাড়ির গেটের ভেতরে থাকা শিশু বাসিত খান মুসার মাথায় চাইনিজ রাইফেলের গুলি বিদ্ধ হয় এবং তা অপর পাশ দিয়ে বেরিয়ে তার দাদি মায়া ইসলামের (৬০) পেটে লাগে। চিকিৎসাধীন অবস্থায় মায়া ইসলাম মারা যান। গুরুতর আহত শিশু মুসা ঢাকা সিএমএইচ ও সিঙ্গাপুরে চিকিৎসা নিয়ে বর্তমানে সিএমএইচে চিকিৎসাধীন।

কার্নিশে ঝুলন্ত তরুণকে গুলির সেই ঘটনা: জুলাই আন্দোলনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও ভাইরাল হয়। সেখানে দেখা যায়, পুলিশের ধাওয়া খেয়ে আত্মরক্ষার্থে নির্মাণাধীন ভবনের তৃতীয় তলার কার্নিশের রড ধরে ঝুলছেন ১৮ বছরের তরুণ আমির হোসেন।

সেখানে এসআই তারিকুল ইসলাম ও এএসআই চঞ্চল চন্দ্র সরকার উপস্থিত হয়ে তাকে নিচে লাফ দিতে বলেন। লাফ না দেওয়ায় পরপর ছয়টি গুলি করা হয় তার দুই পায়ে। ২৯ জুলাই রামপুরা থানায় এডিসি রাশেদুলের নেতৃত্বে এক সভায় ওই ভিডিও চালিয়ে অভিযুক্ত দুই পুলিশকে শনাক্ত করা হয়।

এছাড়া খাগড়াছড়িতে গ্রেপ্তারের পর প্রসিকিউটরের কাছে এএসআই চঞ্চল চন্দ্র সরকারের দেওয়া একটি স্বীকারোক্তিমূলক ভিডিওর ফরেনসিক পরীক্ষায় সত্যতা মেলে। অন্যদিকে এসআই তারিকুল নিজের করা একটি জিডিতেও অভিযানে অংশ নেওয়ার কথা স্বীকার করেছিলেন।

সাজা নির্ধারণ ও বিচারপ্রক্রিয়া: সার্বিক পর্যালোচনায় ট্রাইব্যুনাল বলেছে, মানবতাবিরোধী অপরাধের ভয়াবহতা বিবেচনায় হাবিবুর রহমান, রাশেদুল ইসলাম ও মশিউর রহমান সর্বোচ্চ দণ্ডের উপযুক্ত।

অন্যদিকে এসআই তারিকুল ও এএসআই চঞ্চল অধস্তন কর্মকর্তা হওয়া, তাদের ছোড়া গুলিতে ভুক্তভোগী আমির হোসেন প্রাণে বেঁচে যাওয়া এবং তিনটি অভিযোগের মধ্যে শুধু একটি (আমিরকে গুলি) প্রমাণিত হওয়ায় তাদের মৃত্যুদণ্ডের বদলে যাবজ্জীবন ও ২০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এর মধ্যে চঞ্চল চন্দ্র সরকার পলাতক না থেকে বিচারের মুখোমুখি হওয়ায় তার সাজা আরও লঘুকরণ করে ২০ বছর করা হয়েছে।

এ মামলায় গত বছরের ৩১ জুলাই তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয় এবং ১৮ সেপ্টেম্বর অভিযোগ গঠন করা হয়। ট্রাইব্যুনালে ভুক্তভোগী আমির হোসেন, নিহত মায়া ইসলামের ছেলে, শিশু মুসার বাবা ও নিহত নাদিমের স্ত্রীসহ মোট ১৪ জন সাক্ষী জবানবন্দি দিয়েছেন।

সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দ্রুত এই রায় কার্যকর করতে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে ট্রাইব্যুনাল-১।

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
Share on email