
চট্টগ্রামের পাহাড়তলীতে মাকসুদুল হক চৌধুরী হত্যা মামলার তদন্ত করতে গিয়ে একে একে বেরিয়ে আসে শীর্ষ সন্ত্রাসী চক্রের সদস্যদের তথ্য। মামলায় গ্রেপ্তার মো. মিঠু ওরফে ধামা ইলিয়াছকে দু’দিনের রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে যশোরে অভিযান চালায় চট্টগ্রাম জেলা গোয়েন্দা (ডিবি)। ওই অভিযানেই আলোচিত সন্ত্রাসী মোবারক হোসেন ওরফে ডেভিড ইমনসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ফটিকছড়িতে অভিযান চালিয়ে একটি বিদেশি পিস্তল, দুটি দেশীয় এলজিসহ বেশ কয়েকটি অস্ত্র উদ্ধার করে পুলিশ।
বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) সকালে নগরের দুই নম্বর গেটস্থ চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান পুলিশ সুপার (এসপি) মাসুদ আলম।গ্রেপ্তার অপর তিনজন হলেন মো. শামীম, আল ইসলাম আলিফ ওরফে তমাল এবং মো. সাফায়েত হোসেন।
যশোর থেকে ডেভিড ইমনকে গ্রেপ্তারের বিষয়ে এসপি বলেন, পুলিশের কাছে আগে থেকেই কিছু গোয়েন্দা তথ্য ও অন্যান্য আলামত ছিল। সেগুলোর ভিত্তিতেই তাকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। গ্রেপ্তার এড়াতে তিনি নিজের চেহারা পরিবর্তন করেছিলেন। এমনকি সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে পালানোর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে চুল-দাড়ির স্টাইলও পরিবর্তন করেন। এটি কোনো আকস্মিক অভিযান নয়। দীর্ঘদিনের ধারাবাহিক গোয়েন্দা নজরদারি, তথ্য সংগ্রহ এবং নিরলস পরিশ্রমের ফলেই এই সফল অভিযান পরিচালনা করা সম্ভব হয়েছে।
এসপি মাসুদ আলম জানান, গত ১৩ জুন চট্টগ্রামের পাহাড়তলী এলাকায় মাকসুদুল হক চৌধুরী হত্যাকাণ্ডের পর ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনে তদন্ত শুরু করে জেলা পুলিশ। ঘটনাস্থল ও আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ, প্রযুক্তিগত তথ্য এবং গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ করে হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা হয়।
এরপর গত ২২ জুলাই মামলার এজাহারভুক্ত আসামি মো. মিঠু ওরফে ধামা ইলিয়াছকে গ্রেপ্তার করা হয়। আদালতের অনুমতি নিয়ে তাকে দু’দিনের রিমান্ডে নেয় পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদে ধামা ইলিয়াছ সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক, অস্ত্রের মজুত এবং সহযোগীদের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেন বলে জানান তিনি।
তিনি বলেন, ওই তথ্যের সূত্র ধরেই পরবর্তী অভিযানের পরিকল্পনা করা হয়। পুলিশ জানতে পারে, চট্টগ্রামে দীর্ঘদিন ধরে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালানো ডেভিড ইমনসহ কয়েকজন চট্টগ্রামের বাইরে অবস্থান করছেন।
পুলিশ সুপার মাসুদ আলম বলেন, রিমান্ডে পাওয়া তথ্য ও গোয়েন্দা নজরদারির ভিত্তিতে গত ২৯ জুলাই যশোর জেলার কোতোয়ালি থানার ঝুমঝুমপুর এলাকায় অভিযান চালানো হয়। যশোর জেলা পুলিশের সহযোগিতায় পরিচালিত ওই অভিযানে ডেভিড ইমনসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
ডেভিড ইমন দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রাম মহানগর, ফটিকছড়ি ও রাঙ্গুনিয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত। তার বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম মহানগর ও জেলার বিভিন্ন থানায় হত্যা, অস্ত্র, চাঁদাবাজিসহ ১৩টি মামলা রয়েছে। রাউজান, রাঙ্গুনিয়া ও চট্টগ্রাম মহানগরের কয়েকটি হত্যাকাণ্ডেও তাঁর সম্পৃক্ততার তথ্য তদন্তে পাওয়া গেছে। অন্যদিকে, ধামা ইলিয়াছের বিরুদ্ধেও বিভিন্ন থানায় ২১টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে পাঁচটি হত্যা মামলাসহ অস্ত্র, চাঁদাবাজি ও অন্যান্য গুরুতর অপরাধের মামলা রয়েছে বলে জানান পুলিশ সুপার।
গ্রেপ্তারের পর পাঁচজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে তাদের ব্যবহৃত অস্ত্রের অবস্থান সম্পর্কে তথ্য পায় পুলিশ। ওই তথ্যের ভিত্তিতে বুধবার দিবাগত রাত সাড়ে ৩টার দিকে ফটিকছড়ি থানার কাঞ্চননগর ইউনিয়নের মানিকপুর গ্রামের পাইট্রাল টিলাপাড়ায় অভিযান চালানো হয়। সেখানে মৃত আবুল হোসেনের একটি পরিত্যক্ত বসতবাড়ি থেকে একটি বিদেশি পিস্তল, দুটি দেশীয় এলজি এবং অন্যান্য দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করা হয়।
পুলিশ সুপার মাসুদ আলম বলেন, অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে মামলা করার প্রক্রিয়া চলছে। একই সঙ্গে এই সন্ত্রাসী চক্রের অন্য সদস্যদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, পুরো অভিযানের সূত্রপাত হয়েছিল পাহাড়তলীর হত্যা মামলার তদন্ত থেকে। সিসিটিভি ও প্রযুক্তিগত তথ্যের মাধ্যমে প্রথমে মিঠু ওরফে ধামা ইলিয়াছকে শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তার রিমান্ডে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে দেশের আরেক জেলায় অভিযান চালিয়ে ডেভিড ইমনসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পরবর্তীতে অস্ত্র উদ্ধার করা সম্ভব হয়।







