জুলাই স্মৃতি জাদুঘর ৫ আগস্ট উদ্বোধন

জুলাই স্মৃতি জাদুঘর ৫ আগস্ট উদ্বোধন

 

দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক দীর্ঘ অধ্যায়ে গণভবন ছিল ক্ষমতার প্রতীক। এখান থেকেই নেওয়া হতো সরকার পরিচালনার ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন-পীড়নের গুরুত্বপূর্ণ সব সিদ্ধান্ত।৫ আগস্ট জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

দুই বছর পর সেই একই ভবনে দর্শনার্থীদের স্বাগত জানাবে অন্য এক ইতিহাসের গল্প। ভবনের দেয়ালে দেয়ালে থাকছে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের গ্রাফিতি, কাচের বাক্সে সংরক্ষিত থাকবে আন্দোলনের স্মারক, বড় পর্দায় ভেসে উঠবে রাজপথে আন্দোলনের দৃশ্য, আর গ্যালারিজুড়ে ছড়িয়ে থাকবে একটি গণ-অভ্যুত্থানের দলিল।

আগামীকাল ৫ আগস্ট উদ্বোধন করা হচ্ছে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর। রক্তাক্ত জুলাই-আগস্টের সেই আন্দোলনের স্মৃতি, শহীদদের আত্মত্যাগ, আহতদের বেদনা, রাজপথের প্রতিরোধ, দেয়ালজুড়ে লেখা স্লোগান, গ্রাফিতি ও শিল্পকর্ম—সবকিছুকে এক ছাদের নিচে ধারণ করতেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এই জাদুঘর।

উদ্বোধন হতে যাওয়া জাদুঘরের বিভিন্ন গ্যালারিতে স্থান পেয়েছে জুলাই আন্দোলনের সময় ব্যবহৃত পোস্টার, ব্যানার, প্ল্যাকার্ড, দেয়াললেখা ও গ্রাফিতি। সংরক্ষণ করা হয়েছে আলোকচিত্র, ভিডিও, সংবাদপত্রের কাটিং, আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ের দলিল এবং ব্যক্তিগত ব্যবহার্য সামগ্রী। রয়েছে শহীদদের কিছু চিঠি, যেগুলো তাঁরা পরিবারের উদ্দেশে লিখে গিয়েছিলেন। আন্দোলনের বিরল আলোকচিত্র ও বিভিন্ন স্মারকও প্রদর্শনের জন্য রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া থাকছে জুলাই অভ্যুত্থানের সময় দুই হাত ছড়িয়ে থাকা শহীদ আবু সাঈদ, মীর মুগ্ধ, রিকশার পাদানিতে থাকা আলোচিত সেই শহীদ গোলাম নাফিজের লাশসহ অনান্য উল্লেখ্যযোগ্য দৃশের ভাস্কর্য। এখানে আরো সংরক্ষিত থাকছে আওয়ামী লীগের আমলের নানা গুম-খুনের নির্দেশনার কল রেকর্ড।

যেখানে এক গণ-অভ্যুত্থানের গল্প

ইতিহাসের সঙ্গে নতুন প্রজন্মের পরিচয় ঘটবে : জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের অনেক পোস্টার হারিয়ে গেছে, অনেক দেয়াললেখা মুছে গেছে, সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে শহরের দৃশ্য। কিন্তু সেই আন্দোলনের স্মৃতি, শিল্প, দলিল ও অভিজ্ঞতাকে স্থায়ীভাবে ধরে রাখাবে এই জাদুঘর। এখানে প্রবেশ করলে দর্শনার্থীরা শুধু কোনো ঘটনার বিবরণ পড়বেন না, তাঁরা একটি সময়কে অনুভব করার সুযোগ পাবেন, যে সময়ে রাজপথই হয়ে উঠেছিল প্রতিবাদের ভাষা, আর দেয়ালগুলো হয়ে উঠেছিল জনতার ক্যানভাস।

যে তরুণরা আন্দোলনের দিনগুলো দেখেননি, তাঁরা এখানে এসে জানতে পারবেন সেই সময়ের কথা। দেখতে পারবেন কিভাবে প্রতিবাদের ভাষা ছড়িয়ে পড়েছিল দেয়ালে, কিভাবে একটি আন্দোলনের স্মৃতি সংরক্ষিত হয়েছে দলিল, ছবি, শিল্পকর্ম ও ব্যক্তিগত স্মারকের মাধ্যমে।

ইতিহাস সংরক্ষণের আইনি ভিত্তি : জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের আইনি ভিত্তি তৈরি হয়েছে ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর অধ্যাদেশ, ২০২৫’-এর মাধ্যমে। অধ্যাদেশের প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে সংঘটিত গণ-অভ্যুত্থানের ইতিহাস, নিদর্শন ও দলিল সংরক্ষণ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তা পৌঁছে দেওয়ার জন্যই এই প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়েছে।

অধ্যাদেশ অনুযায়ী, জাদুঘরে শুধু দৃশ্যমান স্মারক নয়, সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করা হবে আন্দোলনসংক্রান্ত পোস্টার, ব্যানার, প্ল্যাকার্ড, দেয়াললেখা, গ্রাফিতি, আলোকচিত্র, ভিডিও, অডিও, সংবাদপত্র, ডিজিটাল নথি, ব্যক্তিগত ব্যবহার্য সামগ্রী এবং অন্যান্য ঐতিহাসিক নিদর্শন। গুরুত্বপূর্ণ আলামতের প্রতিরূপ তৈরি ও প্রদর্শনের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।

স্মৃতি থেকে গবেষণার পথে : জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরকে শুধু প্রদর্শনীর স্থান হিসেবে কল্পনা করা হয়নি। এটিকে গবেষণা, দলিলায়ন ও জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। এখানে ডিজিটাল আর্কাইভ তৈরি, গবেষণা পরিচালনা, বই ও সাময়িকী প্রকাশ, সেমিনার ও প্রদর্শনীর আয়োজন এবং ভার্চুয়াল মিউজিয়াম পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে। দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সহযোগিতার সুযোগও রাখা হয়েছে। অর্থাৎ জাদুঘরের ভূমিকা শুধু অতীতকে স্মরণ করা নয়; বরং সেই ইতিহাসকে গবেষণার উপযোগী করে সংরক্ষণ করাও।

স্মৃতিচিহ্নের সুরক্ষা : অধ্যাদেশে জাদুঘরের সংগ্রহে থাকা নিদর্শন নষ্ট, বিকৃত, চুরি বা অবৈধভাবে অপসারণের বিরুদ্ধে শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। এর মাধ্যমে আন্দোলনের স্মৃতিচিহ্নগুলোকে রাষ্ট্রের সুরক্ষার আওতায় আনা হয়েছে।

কেন গণভবনে এই জাদুঘর : জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে। প্রধান উপদেষ্টার সাবেক প্রেস সচিব শফিকুল আলমের ভাষ্য, গণভবনকে জাদুঘর হিসেবে বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্তের পেছনে রয়েছে এর প্রতীকী গুরুত্ব। তাঁর ভাষায়, ‘জুলুমের যে রাজনীতি করা হয়েছে, তার কেন্দ্র ছিল গণভবন। এখানে অনেক নথি পাওয়া গেছে। কাকে কী করতে হবে, কার মানবাধিকার লঙ্ঘন করতে হবে—এ ধরনের বিভিন্ন দলিলও এখানে রয়েছে। বাংলাদেশে যেভাবে গুম হয়েছে, আয়নাঘর তৈরি হয়েছে, মানুষ হত্যা হয়েছে এবং ব্যাংক লুট হয়েছে এসবেরও নানা তথ্য ও দলিল এখানে সংরক্ষিত হয়েছে।’

তিনি বলেন, ভবনটিকে ভেঙে ফেলা হয়নি; বরং এর ঐতিহাসিক তাৎপর্য অক্ষুণ্ন রেখে নতুন উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়েছে, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ক্ষমতার অপব্যবহার এবং গণ-অভ্যুত্থানের ইতিহাস একই পরিসরে দেখতে পারে।

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
Share on email