
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারীতে ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজ ইয়ার্ডে স্ক্র্যাপ এলএনজি জাহাজের ট্যাংক থেকে গ্যাস লিকেজের ঘটনায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে সাতজনে দাঁড়িয়েছে।
শুক্রবার (১৪ আগস্ট) সকাল ৯টার দিকে ভাটিয়ারী স্টেশন রোডসংলগ্ন সাগর উপকূলে মো. লোকমানের মালিকানাধীন ওই জাহাজভাঙা ইয়ার্ডে এ দুর্ঘটনা ঘটে।
ইয়ার্ডের ম্যানেজার মোহাম্মদ ইউসুফ জানান, শুক্রবার ইয়ার্ডের কার্যক্রম বন্ধ ছিল। সকালে স্ক্র্যাপ এলএনজি জাহাজের একটি ট্যাংকে লিকেজ দেখা দেয়। এ সময় স্থানীয় ও বহিরাগত কয়েকজন লোক বিষয়টি দেখতে সেখানে গেলে গ্যাসে আক্রান্ত হন। এতে চারজনের মৃত্যু হয়। কয়েকজন আহত হয়েছেন।
খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার কার্যক্রম শুরু করেন।
কুমিরা ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের ইনচার্জ আল মামুন বলেন, ঘটনাস্থল থেকে তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। অপর কয়েকজনকে মুমূর্ষু অবস্থায় হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। তবে স্থানীয়রা নিহতের সংখ্যা আরও বেশি বলে দাবি করেন।
এদিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ নুরুল আলম আশেক জানান, শুক্রবার দুপুর ১২টার পরে ভাটিয়ারীর ফেরদৌস স্টিল ইয়ার্ডের ঘটনায় আহত ছয়জনকে চমেক হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাদের মধ্যে পাঁচজনকে মৃত ঘোষণা করেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্যমতে, ইয়ার্ডে দুজন এবং চমেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আরও পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। এতে মোট নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে সাতজনে।
নিহতদের মধ্যে চারজনের নাম ও পরিচয় জানা গেছে। তারা হলেন—সানি জলদাস (২২), পলাশ জলদাস (২৭) এবং দুই সহোদর মনসুর আলী (৪০) ও নাসির উদ্দিন (৩৮)। তারা সবাই ভাটিয়ারী এলাকার বাসিন্দা।
স্থানীয় জেলেরা জানান, কারখানার ভেতর থেকে বের হওয়া গ্যাসের গন্ধের তীব্রতা এত বেশি ছিল যে সাগরে ইলিশ ধরতে যাওয়া জেলেরা কারখানাটির পাশের খালে প্রবেশ করতে পারেননি। গ্যাসের তীব্র গন্ধের কারণে তাদের অন্তত আধা কিলোমিটার দূরে গিয়ে নৌকা ভেড়াতে হয়েছে।
স্থানীয় এক বাসিন্দা জানান, হঠাৎ কারখানার ভেতর থেকে মানুষের চিৎকার শুনতে পান তারা। পরে কয়েকজন কারখানা এলাকায় গিয়ে দেখেন, অসুস্থ কিছু লোককে গাড়িতে করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এরপর জাহাজের ভেতরে কয়েকজনের মরদেহ পড়ে থাকার খবর ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় লোকজন বিক্ষুব্ধ হয়ে কারখানার ভেতরে ঢুকে ভাঙচুর করেন। পরে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মোহাম্মদ মাহবুবুল হাসান বলেন, ‘জাহাজে বিষাক্ত গ্যাস নির্গমনের ঘটনায় হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। গ্যাস নির্গমনের কারণ এবং ইয়ার্ডে শ্রমিকদের নিরাপত্তাব্যবস্থা যথাযথ ছিল কি না, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।’
দুর্ঘটনার পর নিহতদের স্বজন ও স্থানীয় লোকজনের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দেয়। পরে স্থানীয় শতাধিক বিক্ষুব্ধ মানুষ ইয়ার্ডে গিয়ে ভাঙচুর চালান বলে জানিয়েছেন ইয়ার্ড কর্মকর্তারা। এ সময় ইয়ার্ডের বিভিন্ন মালামাল নিয়ে যাওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ফখরুল ইসলাম দুর্ঘটনার বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, খবর পাওয়ার পর সীতাকুণ্ড থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) অবহিত করা হয়েছে এবং ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছে। তিনিও ঘটনাস্থলে যাওয়ার কথা জানান।
সীতাকুণ্ড থানার ওসি মো. মহিনুল ইসলাম বলেন, খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছে। বিস্তারিত পরে জানানো হবে।
তবে দুর্ঘটনার কারণ নিয়ে ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। ফেরদৌস স্টিল শিপ ব্রেকিংয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ফেরদৌস ওয়াহিদ বলেন, স্ক্র্যাপ জাহাজ কাটার সময় বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। তবে কীভাবে বিস্ফোরণের সূত্রপাত হয়েছে, তাৎক্ষণিকভাবে তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তার দাবি, বিস্ফোরণে আহত ১০ শ্রমিককে হাসপাতালে নেওয়া হলে তাদের মধ্যে তিনজনের মৃত্যু হয়। তবে হতাহত শ্রমিকদের নাম-পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে জানাতে পারেননি তিনি।







