,

সমুদ্র গবেষণা ও প্রযুক্তি খাতে সহযোগিতার নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন

সমুদ্র গবেষণা ও প্রযুক্তি খাতে সহযোগিতার নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন

সমুদ্রবিজ্ঞান, স্যাটেলাইটভিত্তিক সমুদ্র পর্যবেক্ষণ এবং উচ্চতর গবেষণার পরিধি সম্প্রসারণের লক্ষ্যে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল সম্প্রতি চীন সফর সম্পন্ন করেছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মাননীয় উপাচার্য প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আল্-ফোরকান-এর নেতৃত্বে ১৪ থেকে ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত অনুষ্ঠিত এ সফরে সমুদ্র গবেষণায় প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি, যৌথ গবেষণা, আন্তর্জাতিক অর্থায়ন, শিক্ষক-শিক্ষার্থী বিনিময় এবং বঙ্গোপসাগরে সামুদ্রিক পর্যবেক্ষণ বয় স্থাপনের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়।

প্রতিনিধিদলে ছিলেন চবি মাননীয় উপ-উপাচার্য (একাডেমিক) প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আল-আমীন, মাননীয় উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) প্রফেসর ড. মো. সফিকুল ইসলাম, চবি স্যাটেলাইট ওশান অবজারভেশন অ্যান্ড ডাটা ইনোভেশন সেন্টারের পরিচালক প্রফেসর ড. মোহাম্মদ মোসলেম উদ্দিন এবং উপাচার্য দপ্তরের উপ-রেজিস্ট্রার মুহাম্মদ রিয়াজুল হারুন।

প্রতিনিধিদলটি গত ১৪ অক্টোবর সন্ধ্যায় চীনের ঝেজিয়াং প্রদেশের প্রযুক্তিনগরী ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য বিখ্যাত হাংঝুতে পৌঁছায়। সফরের প্রথম দিন ১৫ অক্টোবর সকালে প্রতিনিধিদল চীনের প্রাকৃতিক সম্পদ মন্ত্রণালয়ের (MNR) অধীনস্থ শীর্ষস্থানীয় সামুদ্রিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেকেন্ড ইনস্টিটিউট অব ওশানোগ্রাফি (SIO) পরিদর্শন করে। ১৯৬৬ সালে প্রতিষ্ঠিত এ প্রতিষ্ঠানটির প্রযুক্তিগত সহযোগিতায় গত ৯ জুন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশের প্রথম ওশান স্যাটেলাইট গ্রাউন্ড স্টেশন উদ্বোধন করা হয়।

প্রতিষ্ঠানটি সামুদ্রিক বিজ্ঞান গবেষণা, গভীর সমুদ্র অনুসন্ধান এবং স্যাটেলাইট ওশানোগ্রাফিতে চীনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাকেন্দ্র। স্যাটেলাইটভিত্তিক সমুদ্র পরিবেশের গতিবিদ্যা নিয়ে গবেষণায় প্রতিষ্ঠানটির বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। এ ছাড়া সমুদ্রতলের ভূবিজ্ঞান, গভীর সমুদ্র প্রযুক্তি, সামুদ্রিক লেজার রিমোট সেন্সিং এবং দক্ষিণ-পশ্চিম ভারত মহাসাগরে খনিজ সম্পদ অনুসন্ধানেও প্রতিষ্ঠানটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। প্রতিষ্ঠানটির গবেষণা কার্যক্রমে ‘সিয়াংইয়াংহং-১০’ ও ‘দাইয়াং’ গবেষণা জাহাজ এবং ‘ব্লু হোয়েল’-এর মতো মানবহীন সাবমার্সিবল প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়।

SIO পরিদর্শনকালে প্রতিনিধিদলটির সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির মহাপরিচালক ফাং ইয়িনক্সিয়া (Fang Yinxia), আন্তর্জাতিক সহযোগিতা কেন্দ্রের পরিচালক ওয়াং ইউনতাও (Wang Yuntao) এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাউন্ড স্টেশন প্রকল্পের চীনা পক্ষের প্রকল্পপ্রধান প্রফেসর ড. মাও চিহুয়ার (Mao Zhihua) ফলপ্রসূ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে উত্তর বঙ্গোপসাগরে রিমোট সেন্সিং প্রযুক্তির প্রয়োগ, অ্যালগরিদম উন্নয়ন, সফটওয়্যার কাস্টমাইজেশন, মডেলিং, সমুদ্রের পূর্বাভাস প্রদান এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধির বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়। পাশাপাশি শিক্ষক ও গবেষক বিনিময় এবং যৌথ গবেষণা কার্যক্রম সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।

একই দিন সন্ধ্যায় প্রতিনিধিদল SIO-এর লিন’আন (Lin’an) বেসে অবস্থিত স্যাটেলাইট গ্রাউন্ড স্টেশন পরিদর্শন করে। এ সময় প্রফেসর মাও চিহুয়ার নেতৃত্বাধীন গবেষক দলের সঙ্গে মতবিনিময় হয়। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে স্থাপিত ওশান স্যাটেলাইট গ্রাউন্ড স্টেশনের কার্যক্রম, প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাপনা এবং গবেষণার সম্ভাবনা নিয়ে এ মতবিনিময়ে আলোচনা করা হয়।

সফরের দ্বিতীয় দিন ১৬ অক্টোবর সকালে SIO-এর গবেষণা অধ্যাপক হে চিয়ানচিয়াংয়ের (He Xianqiang) নেতৃত্বে প্রতিনিধিদল বিশ্বখ্যাত ঝেজিয়াং বিশ্ববিদ্যালয় (Zhejiang University) পরিদর্শন করে। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়টির আর্থ সায়েন্সেস স্কুল, বিগ ডাটা সেন্টার এবং আর্থ সায়েন্স মিউজিয়াম ঘুরে দেখেন প্রতিনিধিদলের সদস্যরা। ন্যাচার ইনডেক্স ২০২৬-এর একাডেমিক প্রতিষ্ঠানভিত্তিক মূল্যায়নে শীর্ষস্থান অর্জনকারী বিশ্ববিদ্যালয়টির গবেষণা অবকাঠামো, তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর গবেষণা কার্যক্রম এবং জাদুঘর ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে প্রতিনিধিদল ধারণা লাভ করে।

ঝেজিয়াং বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত দ্বিপাক্ষিক আলোচনা সভায় বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিনিধি কিয়ান চিয়ান (Qian Zhigan), অধ্যাপক ঝাং বাওহুয়া, অধ্যাপক ইয়াং রং ও অধ্যাপক কাও লং অংশ নেন। আলোচনায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও ঝেজিয়াং বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা প্রতিষ্ঠা, আন্তর্জাতিক গবেষণা তহবিল সংগ্রহ, শিক্ষক-শিক্ষার্থী বিনিময়, যৌথ গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা এবং বিজ্ঞানকেন্দ্র ও জাদুঘর ব্যবস্থাপনায় অভিজ্ঞতা বিনিময়ের বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়। এ ধরনের সহযোগিতা দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার পরিধি বিস্তার এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একাডেমিক যোগাযোগ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়।

একই দিন দুপুরে হাংঝুর বিখ্যাত ওয়েস্ট লেকসংলগ্ন একটি মুসলিম রেস্তোরাঁয় SIO-এর গবেষণা পরিচালক অধ্যাপক ড. বাই এবং ঝেজিয়াং বিশ্ববিদ্যালয়ের সমুদ্রের রিমোট সেন্সিংবিষয়ক অধ্যাপক ড. হ্যার সঙ্গে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিদলের আরেকটি আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সমুদ্র গবেষণায় যৌথ উদ্যোগ গ্রহণ, গবেষণার অগ্রাধিকার নির্ধারণ এবং আন্তর্জাতিক অর্থায়নের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করা হয়।

সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল বঙ্গোপসাগরে সামুদ্রিক পর্যবেক্ষণ বয় (Ocean Observation Moored Buoy) স্থাপন এবং এর মাধ্যমে সামুদ্রিক ও বায়ুমণ্ডলীয় তথ্য সংগ্রহের পরিকল্পনা। এ লক্ষ্যে ১৬ অক্টোবর সন্ধ্যায় SIO-এর গবেষক অধ্যাপক রান এবং জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলী কুং ঝাংয়ের সঙ্গে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিদলের একটি কারিগরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ইতোমধ্যে SIO-এর পক্ষ থেকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি অত্যাধুনিক সামুদ্রিক পর্যবেক্ষণ বয় প্রদান করা হয়েছে। বঙ্গোপসাগরে বয়টি স্থাপনের উপযুক্ত স্থান নির্বাচন, স্থাপনপ্রক্রিয়া, পরিচালনা এবং সেখান থেকে সংগৃহীত তথ্য ব্যবহারের বিষয়ে বৈঠকে বিস্তারিত আলোচনা হয়। এর মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরের পরিবেশ, সমুদ্রের অবস্থা এবং আবহাওয়াসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাসক্ষমতা আরও সম্প্রসারিত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বৈঠক শেষে SIO-এর মহাপরিচালকের পক্ষ থেকে প্রতিনিধিদলের সম্মানে নৈশভোজের আয়োজন করা হয়।

সফর শেষে গত ১৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় প্রতিনিধিদল চীনের হাংঝু থেকে বাংলাদেশের উদ্দেশে যাত্রা করে এবং ১৮ অক্টোবর সকালে নিরাপদে দেশে ফিরে আসে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এ সফর সামুদ্রিক গবেষণা, স্যাটেলাইটভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণ, প্রযুক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক গবেষণা সহযোগিতার ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে ওশান স্যাটেলাইট গ্রাউন্ড স্টেশনের কার্যক্রম সম্প্রসারণ, বঙ্গোপসাগরে সামুদ্রিক পর্যবেক্ষণ বয় স্থাপন এবং চীনের শীর্ষস্থানীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশের সমুদ্রসম্পদ, সামুদ্রিক পরিবেশ ও জলবায়ুসংক্রান্ত গবেষণায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা আরও শক্তিশালী হবে বলে আশা করা হচ্ছে।