
বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামকে মাদকমুক্ত করার উদ্যোগ থাকলেও মাদকের বিস্তার নিয়ন্ত্রণে আনা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান, মাদকদ্রব্য উদ্ধার এবং গ্রেপ্তারের খবর নিয়মিত প্রকাশিত হলেও মাদক কারবার ও মাদকাসক্তির সমস্যা নিয়ে উদ্বেগ কাটছে না। বিশেষ করে তরুণ ও যুবসমাজকে মাদকের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রক্ষা করা এখন নগরবাসীর অন্যতম বড় দাবি।
চট্টগ্রাম নগরের মনসুরাবাদ এলাকায় একটি ট্রাকের পাটাতনের নিচে বিশেষ কৌশলে তৈরি গোপন চেম্বার থেকে ৩ লাখ ২০ হাজার ইয়াবা উদ্ধার করেছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগ। এ ঘটনায় ট্রাকের চালক মো. রুহুল আমিনকে (৪৫) গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ইয়াবা পরিবহনে ব্যবহৃত ট্রাকটিও জব্দ করেছে পুলিশ।বুধবার (২১ অক্টোবর) দুপুরে সিএমপির মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান গোয়েন্দা দক্ষিণ বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার শেখ শরীফুল ইসলাম।
পুলিশ জানায়, মঙ্গলবার দিবাগত রাত ১২টা ২০ মিনিটে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গোয়েন্দা দক্ষিণ বিভাগের স্পেশাল টিম-১ জানতে পারে, কক্সবাজার থেকে ইয়াবার একটি চালান নিয়ে একটি ট্রাক কোতোয়ালি হয়ে সাগরিকার দিকে যাচ্ছে। পরে এ তথ্যের ভিত্তিতে ডবলমুরিং থানার মনসুরাবাদ পুলিশ লাইনের বিপরীতে ৪৩৮ ডিটি রোডে দরবার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সামনে চেকপোস্ট বসানো হয়।রাত ১টা ৫০ মিনিটের দিকে ট্রাকটি চেকপোস্টে পৌঁছালে পুলিশ সেটি থামিয়ে তল্লাশি চালায়। এ সময় ট্রাকের চালক রুহুল আমিনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ট্রাকের পাটাতনের নিচে বিশেষ কৌশলে তৈরি একটি গোপন চেম্বারের সন্ধান পাওয়া যায়।
চট্টগ্রাম নগরী দেশের গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী হওয়ায় এখানে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষের যাতায়াত ও ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালিত হয়। এ অবস্থায় মাদক পাচার, সরবরাহ ও বিক্রির নেটওয়ার্ক শনাক্ত করা এবং তা ভেঙে দেওয়া সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম মহানগর ও জেলা কার্যালয়ের প্রকাশিত তথ্যেও বিভিন্ন সময়ে ইয়াবাসহ মাদকদ্রব্য উদ্ধার এবং অভিযুক্ত ব্যক্তিদের আটকের ঘটনা উঠে এসেছে। তবে এসব অভিযান মাদকের সরবরাহ ও ব্যবহার কতটা কমাতে পেরেছে, তা নির্ধারণে ধারাবাহিক পরিসংখ্যান ও মূল্যায়ন প্রয়োজন।
মাদকাসক্তির প্রভাব শুধু একজন ব্যক্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; তা পরিবার, সামাজিক সম্পর্ক, শিক্ষা ও কর্মজীবনেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। পরিবারের সদস্যদের উদ্বেগ, আর্থিক সংকট এবং সামাজিক অস্থিরতার আশঙ্কা বাড়ে। তরুণদের একটি অংশ মাদকের সংস্পর্শে এলে তাদের স্বাভাবিক জীবন, পড়াশোনা ও কর্মসংস্থানের সম্ভাবনাও বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এ কারণে মাদক প্রতিরোধকে কেবল আইনশৃঙ্খলার বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না; এর সঙ্গে জনস্বাস্থ্য, পরিবার ও সামাজিক সচেতনতার বিষয়টিও যুক্ত করতে হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, মাদকবিরোধী অভিযান কার্যকর করতে হলে খুচরা বিক্রেতা বা ব্যবহারকারী আটকের পাশাপাশি মাদকের মূল সরবরাহকারী, অর্থের উৎস এবং বিতরণব্যবস্থা শনাক্ত করা জরুরি। একই সঙ্গে মাদক কারবারে জড়িত থাকার অভিযোগে যাদের বিরুদ্ধে তথ্য পাওয়া যায়, তাদের বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে প্রমাণ ছাড়া মাদক কারবারি হিসেবে চিহ্নিত করাও উচিত নয়।
নগরীর যেসব এলাকায় মাদক বিক্রি বা সেবনের অভিযোগ রয়েছে, সেসব স্থানে নিয়মিত নজরদারি, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপদে অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন। পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন, জনপ্রতিনিধি ও অভিভাবকদের সম্পৃক্ত করে মাদকবিরোধী সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো যেতে পারে। শুধু প্রচারাভিযান নয়, তরুণদের খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, কারিগরি শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোও মাদক প্রতিরোধে সহায়ক হতে পারে।
মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে চিকিৎসা, কাউন্সেলিং ও পুনর্বাসনের সুযোগ নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। আসক্তিকে শুধু অপরাধের দৃষ্টিতে দেখলে অনেকেই চিকিৎসা নিতে পিছিয়ে পড়তে পারেন। তাই মাদক কারবারের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি আসক্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসা ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার সুযোগ দিতে হবে।
চট্টগ্রামকে মাদকমুক্ত করার লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট পুলিশ প্রশাসন, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, স্থানীয় প্রশাসন এবং সামাজিক সংগঠনগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। নগরীতে গত এক বছরে কতটি অভিযান পরিচালিত হয়েছে, কতজন মাদক কারবারের অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছেন, কী পরিমাণ মাদক উদ্ধার হয়েছে এবং পুনর্বাসন কার্যক্রমে কতজন যুক্ত হয়েছেন—এসব তথ্য প্রকাশ করা হলে পরিস্থিতির প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্ট হবে।
নগরবাসীর প্রত্যাশা, মাদকবিরোধী অভিযান যেন কেবল সাময়িক কার্যক্রমে সীমাবদ্ধ না থাকে। মাদকের উৎস বন্ধ, অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা, তরুণদের সচেতন করা এবং আসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমেই চট্টগ্রামকে মাদকের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রক্ষার পথে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।







