চুয়াডাঙ্গার জীবননগরে যৌথ বাহিনীর বিশেষ অভিযান চলাকালে আটক হওয়া পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শামসুজ্জামান ডাবলুর (৫০) অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুকে কেন্দ্র করে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে সেনাবাহিনী।
এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে সংশ্লিষ্ট ক্যাম্পের ক্যাম্প কমান্ডারসহ অভিযানে অংশগ্রহণকারী সকল সেনাসদস্যকে তাৎক্ষণিকভাবে প্রত্যাহার করে সেনানিবাসে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তে একটি উচ্চপদস্থ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
মঙ্গলবার আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর বা আইএসপিআর এর পক্ষ থেকে পাঠানো এক বিশেষ সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। সেনাবাহিনী এই মৃত্যুকে দুঃখজনক ও কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় বলে অভিহিত করেছে।
আইএসপিআর এর বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, সোমবার রাত ১১টার দিকে সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে জীবননগর এলাকায় অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে যৌথ বাহিনীর একটি বিশেষ দল অভিযান চালায়। জীবননগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পাশেই অবস্থিত হাফিজা ফার্মেসি থেকে মো. শামসুজ্জামান ডাবলুকে আটক করা হয়।
যৌথ বাহিনীর দাবি অনুযায়ী, আটকের পর ডাবলুর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তল্লাশি চালিয়ে একটি ৯ মিলিমিটার পিস্তল, একটি ম্যাগাজিন এবং চারটি তাজা গুলি উদ্ধার করা হয়। তবে অভিযান শেষ হওয়ার পরপরই তিনি আকস্মিকভাবে অসুস্থ হয়ে অচেতন হয়ে পড়েন। দ্রুততম সময়ের মধ্যে তাকে পার্শ্ববর্তী জীবননগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে রাত ১২টা ২৫ মিনিটের দিকে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। অভিযান চলাকালে একজন রাজনৈতিক নেতার এমন মৃত্যুর ঘটনাটি গুরুত্বের সাথে নিয়েছে সেনা সদরদপ্তর।
আইএসপিআর স্পষ্ট জানিয়েছে, এ ধরনের ঘটনা কোনোভাবেই কাম্য নয়। ঘটনার প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় ওই ক্যাম্পের কমান্ডার এবং অভিযানে অংশ নেওয়া সকল সদস্যকে ডিউটি থেকে সরিয়ে ব্যারাকে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, একটি উচ্চপদস্থ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে যা ঘটনার প্রতিটি পর্যায় খতিয়ে দেখবে। তদন্তে যদি কারও অবহেলা বা সরাসরি দোষ প্রমাণিত হয়, তবে সেনা আইন অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে কঠোরতম শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। শামসুজ্জামান ডাবলুর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথেই জীবননগর এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
নিহত ডাবলু কেবল একজন ব্যবসায়ীই ছিলেন না, তিনি ছিলেন জীবননগর পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক। গভীর রাতেই দলীয় নেতা-কর্মী ও স্থানীয় বাসিন্দারা হাসপাতালের সামনের সড়কে টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন।
বিক্ষোভকারীদের দাবি, এটি কোনো স্বাভাবিক মৃত্যু নয় বরং পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। তারা এই ঘটনার পেছনে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও নির্যাতনের অভিযোগ তুলে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে স্লোগান দেন। চুয়াডাঙ্গা-২ আসনের বিএনপি প্রার্থী মাহমুদ হাসান খান এবং জেলা বিএনপির শীর্ষ নেতারা এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বিচার দাবি করেছেন।
মঙ্গলবার সকালে জীবননগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বা ইউএনও এবং পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে মরদেহের সুরতহাল করা হয়। স্থানীয় প্রশাসন ও জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে আগেই জানানো হয়েছিল যে, ময়নাতদন্তের রিপোর্ট অনুযায়ী পরবর্তী আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সেনাবাহিনীর দ্রুত পদক্ষেপ এবং তদন্ত কমিটি গঠনের খবর পাওয়ার পর পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন রয়েছে। জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে বা অভিযান চলাকালে মৃত্যু অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়।
সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে ঘটনাটিকে অগ্রহণযোগ্য বলা এবং পুরো ইউনিটকে প্রত্যাহার করা একটি ইতিবাচক ও স্বচ্ছ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। এতে জনমনে বিচার পাওয়ার আস্থা তৈরি হতে পারে। শামসুজ্জামান ডাবলুর মৃত্যু নিয়ে যে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে, উচ্চপদস্থ তদন্ত কমিটির মাধ্যমেই তার প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। হার্ট অ্যাটাক নাকি অন্য কোনো কারণে এই মৃত্যু, তা নির্ধারণে ময়নাতদন্তের রিপোর্ট এবং তদন্ত কমিটির পর্যবেক্ষণই এখন মূল চাবিকাঠি। জীবননগরের সাধারণ মানুষ এখন বিচার ও শান্তিশৃঙ্খলার অপেক্ষায়।