চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেছেন, মশাবাহিত রোগ বিশেষ করে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া নিয়ন্ত্রণে কেবল সাময়িক ব্যবস্থা নয়, বরং গবেষণাভিত্তিক, আধুনিক ও টেকসই সমাধান গ্রহণ করা জরুরি। তিনি বলেন, বৈজ্ঞানিক গবেষণা, আধুনিক যন্ত্রপাতি, কার্যকর ওষুধ এবং আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার সমন্বয় ঘটাতে পারলে মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম আরও ফলপ্রসূ হবে।
বুধবার (১৪ জানুয়ারি ২০২৫) আন্তর্জাতিক মানবিক চিকিৎসা সংস্থা Médecins Sans Frontières (MSF)–এর প্রতিনিধি দলের সঙ্গে চসিক কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভায় এসব কথা বলেন তিনি। এ সময় মেয়র চট্টগ্রাম নগরীর মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে এমএসএফের কারিগরি জ্ঞান, আধুনিক ইকুইপমেন্ট ও গবেষণালব্ধ সমাধান দিয়ে সহযোগিতার আহ্বান জানান।
মেয়র বলেন, ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া বিষয়ে চসিক ইতোমধ্যে বিভিন্ন গবেষণার ফলাফল জনসম্মুখে উপস্থাপন করেছে এবং গণসচেতনতা তৈরিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। তবে রোগের প্রকৃতি পরিবর্তনশীল হওয়ায় সর্বশেষ মেডিকেল সল্যুশন, আধুনিক স্প্রে যন্ত্রপাতি ও টেকনিক্যাল গাইডলাইনের প্রয়োজন রয়েছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সহযোগিতায় এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা গেলে নগরবাসীর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় আরও ইতিবাচক ফল পাওয়া যাবে।
তিনি আরও বলেন, এডিস প্রজাতির মশা মূলত স্বচ্ছ পানিতে জন্মায়, যা অনেক সময় অল্প পরিমাণ পানিতেই সম্ভব। প্লাস্টিক, পলিথিন, পরিত্যক্ত বোতল, টব, টায়ারসহ যেকোনো খোলা পাত্রে জমে থাকা পরিষ্কার পানি মশার বংশবিস্তারের বড় উৎস। এসব উৎস নির্মূলে নাগরিক সচেতনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সিভিক অ্যাওয়ারনেস কার্যক্রমের মাধ্যমে মানুষকে বোঝাতে পারলে যে সামান্য অবহেলাতেই মশার লার্ভা তৈরি হতে পারে, তবে মশা নিয়ন্ত্রণে বড় অগ্রগতি সম্ভব হবে।
এমএসএফ প্রতিনিধিরা সভায় জানান, ২০১৯ সালে মূলত আগস্ট মাসে সংক্রমণের প্রবণতা বেশি ছিল। ২০২১ ও ২০২২ সালে পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে থাকলেও ২০২৩ সালে তা আবার আশঙ্কাজনক রূপ নেয়। বর্তমানে ডেঙ্গি আর মৌসুমি রোগ নয়; বরং এটি সারা বছরব্যাপী একটি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে। মাসভিত্তিক ডাটা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এখন আর কোনো মাসেই সংক্রমণের সংখ্যা শূন্যে নামছে না। বিশেষ করে ২০২৩ সালের ডাটা পূর্বের সব পূর্বাভাস অতিক্রম করেছে।
তারা আরও জানান, ২০২৪ সালের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী ঢাকায় ডেঙ্গির সংক্রমণ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। ডেঙ্গি শূন্যে নামিয়ে আনার লক্ষ্যে প্রতিরোধ কার্যক্রমকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে কেস সংখ্যা, ভর্তি রোগীর সংখ্যা ও কেস ফ্যাটালিটি রেট বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সংক্রমণ বাড়লেও উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার কারণে মৃত্যুহার আগের তুলনায় কমেছে—যা একটি ইতিবাচক অগ্রগতি।
এমএসএফ প্রতিনিধিরা বলেন, ডেঙ্গি মোকাবিলা একটি সম্মিলিত যুদ্ধ। সরকার, সিটি কর্পোরেশন, স্বাস্থ্য বিভাগ, সিভিল সার্জন অফিসসহ সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়।
সভায় মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, চসিক একটি সার্ভিস ওরিয়েন্টেড প্রতিষ্ঠান। নগরবাসীর স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে নিয়মিত ওষুধ ক্রয় ও প্রয়োগ করতে হয়। গবেষণাভিত্তিক দিকনির্দেশনা ও কার্যকর ওষুধ ব্যবস্থাপনায় আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সহযোগিতা চসিকের সক্ষমতা আরও বাড়াবে। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন, ভবিষ্যতে এমএসএফসহ সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে যৌথভাবে মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধে আরও কার্যকর কর্মসূচি গ্রহণ করা সম্ভব হবে।
মতবিনিময় সভায় উপস্থিত ছিলেন চসিকের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও সচিব মো. আশরাফুল আমিন, প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন ইখতিয়ার উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী, প্রধান শিক্ষা কর্মকর্তা ড. কিসিঞ্জার চাকমা, ম্যালেরিয়া ও মশক নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা মো. শরফুল ইসলাম মাহি, উপ-প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা প্রণব কুমার শর্মা, আরো ছিলেন এমএসএফের প্রকল্প সমন্বয়কারী দিনালি ডি জয়সা, মেডিকেল টিম লিডার ফ্রান্সিসকো রাউল সালভাদোর, কীটতত্ত্ববিদ বাউডেউইন ভেইফহাউজেন, হেড অব মিশন সহায়তা কর্মকর্তা জামাল উদ্দিন, মেডিকেল লিয়াজোঁ কর্মকর্তা ফাতেমা ফেরদৌসী, প্রকল্প সমন্বয় সহায়তা কর্মকর্তা সৈয়দ রাশেদসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাবৃন্দ।