সিলেটের আকাশ-বাতাস আজ প্রকম্পিত স্লোগানে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে আধ্যাত্মিক নগরী সিলেটে শুরু হয়েছে বিএনপির প্রথম নির্বাচনী জনসভা। আজ বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা ৫০ মিনিটে সিলেট সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে পবিত্র কোরআন তিলওয়াতের মধ্য দিয়ে এই আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়। আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে আয়োজিত এই জনসভাকে ঘিরে সিলেট বিভাগজুড়ে বইছে উৎসবের আমেজ।
সকাল থেকেই সিলেটের বিভিন্ন উপজেলা এবং পার্শ্ববর্তী সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলা থেকে খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে নেতা-কর্মীরা সমাবেশস্থলে জড়ো হতে থাকেন। ব্যানার, ফেস্টুন আর 'ধানের শীষ' প্রতীকের প্রতিকৃতি নিয়ে নেতা-কর্মীদের মিছিলে নগরীর রাজপথগুলো জনস্রোতে পরিণত হয়। সিলেট জেলা ও মহানগর এবং সুনামগঞ্জ জেলা বিএনপির যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই বিশাল সমাবেশে সভাপতিত্ব করছেন সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী।
অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করছেন সিলেট মহানগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রেজাউল হাসান কয়েস লোদী এবং সাধারণ সম্পাদক ইমদাদ হোসেন চৌধুরী। মঞ্চে ইতিমধ্যে উপস্থিত হয়েছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি সকাল ১০টা ৫৪ মিনিটে সভাস্থলে পৌঁছালে নেতা-কর্মীরা তাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান।
আজকের জনসভার প্রধান আকর্ষণ বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। দীর্ঘ সময় পর সরাসরি নির্বাচনী জনসভায় অংশ নিতে তিনি সিলেটে এসেছেন। বেলা সাড়ে ১১টার পর তার সভামঞ্চে আসার কথা রয়েছে। এর আগে গতকাল বুধবার রাত ৮টার দিকে তিনি আকাশপথে সিলেটে পৌঁছান। সিলেটে নেমেই তিনি প্রথা অনুযায়ী হজরত শাহজালাল (রহ.) ও হজরত শাহপরান (রহ.)-এর মাজার জিয়ারত করেন। এছাড়া তিনি মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল এম এ জি ওসমানীর কবর জিয়ারত করে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
গতকাল রাতে তিনি তার শ্বশুরবাড়ি দক্ষিণ সুরমার বিরাইমপুর গ্রামে যান। সেখানে উপস্থিত নেতা-কর্মী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সাথে কুশল বিনিময় করেন এবং সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেন। উল্লেখ্য যে, তারেক রহমানের সহধর্মিণী ডা. জোবাইদা রহমানের পরিবারের সদ্য প্রয়াত সদস্যদের মাগফিরাত কামনায় সেখানে দোয়া মাহফিলও অনুষ্ঠিত হয়।
জনসভার শুরুতেই স্থানীয় ও অঙ্গ-সংগঠনের নেতারা বক্তব্য দিচ্ছেন। সিলেট মহানগর ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক ফজলে রাব্বি এহসান তার শুভেচ্ছা বক্তব্যে নেতা-কর্মীদের ঘরে ঘরে ধানের শীষের বার্তা পৌঁছে দেওয়ার আহ্বান জানান।
সিলেট মহানগর ছাত্রদলের সভাপতি সুদীপ জ্যোতি (এষ) আবেগময় কণ্ঠে বলেন, আজকের দিনটি আমাদের কাছে একটি স্বপ্নের মতো। আমরা দীর্ঘদিন অপেক্ষায় ছিলাম আমাদের দলের চেয়ারম্যানকে নিয়ে সিলেটে এমন একটি বিশাল জনসভা করার। আজ সেই স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। এখন আমাদের লক্ষ্য ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ধানের শীষকে বিজয়ী করে জনগণের অধিকার ফিরিয়ে আনা।
সিলেটের এই জনসভাকে কেন্দ্র করে বিএনপির কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় হেভিওয়েট প্রার্থীদের মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে আলিয়া মাদ্রাসা মাঠ। মঞ্চে উপস্থিত আছেন- খন্দকার আবদুল মুক্তাদীর (বিএনপি মনোনীত প্রার্থী, সিলেট-১ আসন), তাহসিনা রুশদীর (বিএনপি মনোনীত প্রার্থী, সিলেট-২ আসন), সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজার জেলার বিএনপি মনোনীত সংসদ সদস্য পদপ্রার্থীবৃন্দ এবং সিলেট জেলা ও মহানগর বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপির এই জনসভা দলটির জন্য একটি বড় শক্তি প্রদর্শনী। বিশেষ করে তারেক রহমানের সশরীরে উপস্থিতি নেতা-কর্মীদের মধ্যে নতুন প্রাণের সঞ্চার করেছে। দীর্ঘ দিন পর বড় কোনো সমাবেশে দলের শীর্ষ নেতৃত্বের উপস্থিতি সাধারণ ভোটারদের মধ্যেও ব্যাপক কৌতূহল সৃষ্টি করেছে।
বিভাগীয় এই জনসভা থেকে বিএনপি কী ধরনের বার্তা দেয়, বিশেষ করে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, ভোটাধিকার এবং স্থানীয় উন্নয়ন নিয়ে তারেক রহমান ও মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কী বলেন, সেদিকেই তাকিয়ে আছে সারা দেশের মানুষ।
জনসভাকে কেন্দ্র করে সিলেট নগরীতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। আলিয়া মাদ্রাসা মাঠের চারপাশ এবং শহরের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সতর্ক অবস্থানে দেখা গেছে। তবে এখন পর্যন্ত কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। নেতা-কর্মীরা শান্তিপূর্ণভাবে মিছিলে মিছিলে সমাবেশস্থলে আসছেন।
সিলেটের এই পুণ্যভূমি থেকে শুরু হওয়া বিএনপির নির্বাচনী প্রচারণা আগামী দিনগুলোতে রাজনীতিতে কী প্রভাব ফেলে, তা সময়ই বলে দেবে। তবে আজকের এই জনসমুদ্র প্রমাণ করছে যে, আসন্ন নির্বাচনকে ঘিরে সিলেটে বিএনপির অবস্থান বেশ সুসংহত। বেলা বাড়ার সাথে সাথে জনসভা আরও জনাকীর্ণ হয়ে উঠছে, এবং সবার দৃষ্টি এখন প্রধান অতিথির ভাষণের দিকে।