৭৯ বছর বয়সী মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্বাস্থ্য কি দিন দিন ভেঙে পড়ছে, নাকি তিনি এখনও আগের মতোই কর্মক্ষম? সম্প্রতি এই প্রশ্নটি মার্কিন রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে। বিভিন্ন ক্যাবিনেট বৈঠক ও গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে ট্রাম্পকে প্রায়ই চোখ বন্ধ করে ঝিমাতে দেখা গেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া তার হাতের কালশিটে দাগ এবং এমআরআই সদৃশ স্বাস্থ্য পরীক্ষার ছবি এই বিতর্ককে আরও উসকে দিয়েছে। তবে ট্রাম্প ও তার বিশ্বস্ত সহযোগীরা এসব উদ্বেগকে কেবল উড়িয়েই দেননি, বরং বিষয়টিকে একটি কৌশল হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।
ওভাল অফিস ও মন্ত্রিসভার দীর্ঘ বৈঠকে ট্রাম্পকে প্রায়ই দেখা যায় সামনের দিকে ঝুঁকে চোখ বন্ধ করে আছেন। সমালোচকরা একে বার্ধক্যজনিত ক্লান্তি বা অনিদ্রার লক্ষণ হিসেবে দেখলেও তার সহযোগীদের বয়ান ভিন্ন।
মার্কো রুবিও ও ক্যারোলাইন লেভিট: মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও একে ‘মনোযোগ দিয়ে শোনার একটি বিশেষ পদ্ধতি’ বলে অভিহিত করেছেন। প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলাইন লেভিটের মতে, এটি কোনোভাবেই ঝিমানো নয়, বরং তথ্য হজম করার একটি প্রক্রিয়া।
উইল শার্ফের যুক্তি: হোয়াইট হাউসের স্টাফ সেক্রেটারি উইল শার্ফ জানান, ট্রাম্প যখন কোনো জটিল বিষয় নিয়ে ভাবেন, তখন তিনি নিচের দিকে তাকিয়ে থাকেন বা চোখ বন্ধ করেন, কারণ তিনি কোলের ওপর নোট নেন।
নিজের এই চোখ বুজে থাকা প্রসঙ্গে ট্রাম্প নিজেই একটি বিষ্ফোরক ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি ম্যাগাজিনটিকে জানান, গত ডিসেম্বরের মন্ত্রিসভার বৈঠকটি তার কাছে অসহ্য রকম বিরক্তিকর মনে হয়েছিল।
আমি সেখানে ২৮ জন মানুষের সঙ্গে প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা বসে ছিলাম। আমাকে কেবল সবার কথা শুনতে হচ্ছিল। আমি হাত নাড়াচাড়া করছিলাম যেন মানুষ ভাবে আমি শুনছি, কিন্তু আসলে আমি সেখান থেকে পালানোর জন্য ছটফট করছিলাম।
এই বক্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, ট্রাম্পের এই আচরণ শারীরিক অসুস্থতার চেয়েও তার ধৈর্যহীনতা বা দীর্ঘ রুটিনমাফিক কাজের প্রতি অনিহার বহিঃপ্রকাশ হতে পারে।
ট্রাম্পের হাতের পিঠে প্রায়ই গাঢ় কালশিটে দাগ দেখা যায়, যা সাধারণত বয়স্কদের রক্ত সঞ্চালনের সমস্যা বা ইনজেকশনের কারণে হয়ে থাকে। তবে ট্রাম্পের দাবি, অগণিত মানুষের সঙ্গে সজোরে হাত মেলানোর (হ্যান্ডশেক) কারণেই এই দাগ তৈরি হয়েছে। তার ব্যক্তিগত চিকিৎসক শন বারবাবেলাও এই দাবিতে সায় দিয়েছেন।
সম্প্রতি একটি সিটি স্ক্যান করানো নিয়ে ট্রাম্প চিকিৎসকদের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, চিকিৎসকদের পরামর্শে পরীক্ষাটি করিয়ে তিনি ভুল করেছেন, কারণ এতে মানুষের মনে ধারণা হয়েছে যে তার কোনো বড় অসুখ আছে। যদিও ওয়াল্টার রিড মেডিক্যাল সেন্টারের প্রধান জেমস জোনস নিশ্চিত করেছেন যে, তার রিপোর্ট ‘একদম নিখুঁত’ এবং বয়স অনুযায়ী তিনি বারাক ওবামার চেয়েও বেশি সুস্থ।
সাক্ষাৎকারে ট্রাম্পের স্মৃতিশক্তি নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। নিজের বাবা ফ্রেড ট্রাম্পের কথা বলতে গিয়ে তিনি ‘আলঝেইমার্স’ শব্দটি মনে করতে পারছিলেন না এবং কপালে আঙুল দিয়ে ইশারা করে প্রেস সেক্রেটারির সাহায্য চান। লেভিট শব্দটি মনে করিয়ে দিলে ট্রাম্প দ্রুত বলেন, ‘হ্যাঁ, তবে আমার সেটি নেই।এই মুহূর্তটি সমালোচকদের হাতে নতুন অস্ত্র তুলে দিয়েছে যে, ট্রাম্পের সচেতন মনের ওপর বয়সের ছাপ পড়ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হোয়াইট হাউসের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন যে, প্রেসিডেন্টের শ্রবণশক্তি কিছুটা কমেছে। যদিও ট্রাম্প নিজে এই দাবি সরাসরি নাকচ করে দিয়েছেন। সাধারণত বয়সের কারণে কানে কম শোনা একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হলেও, বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তির ক্ষেত্রে এটি সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে বড় বাধা হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
প্রতিবেদনে একটি স্পর্শকাতর দিক উঠে এসেছে। সাবেক প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের প্রয়াণের পর ট্রাম্প মন্তব্য করেছিলেন, আগামী ১০ বছরের মধ্যে আমার অবস্থাও এমন হবে। এই মন্তব্যটি ট্রাম্পের চিরচেনা ‘অজেয়’ ভাবমূর্তির বিপরীতে তার মানবিক দুর্বলতা এবং নিজের নশ্বরতা নিয়ে উদ্বেগের একটি বিরল বহিঃপ্রকাশ।
ট্রাম্পের স্বাস্থ্য নিয়ে এই প্রতিবেদনটি প্রকাশের আগে তিনি নিউইয়র্ক ম্যাগাজিনকে হুমকি দিয়েছিলেন যে, কোনো নেতিবাচক তথ্য প্রচার করলে তিনি মামলা করবেন। এটি প্রমাণ করে যে, নিজের শারীরিক সক্ষমতা নিয়ে যে কোনো প্রশ্নকে ট্রাম্প রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ মনে করছেন।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের বয়স এবং তার কর্মক্ষমতা নিয়ে বিতর্ক কেবল আমেরিকার অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়, বরং এটি বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির ওপরও প্রভাব ফেলে। হোয়াইট হাউস থেকে দেওয়া ‘ফিটনেস’ সার্টিফিকেট এবং ট্রাম্পের নিজের স্বীকারোক্তির মধ্যে যে বৈপরীত্য দেখা যাচ্ছে, তা মার্কিন নাগরিকদের মনে ধোঁয়াশা তৈরি করেছে। তিনি কি সত্যিই গভীর চিন্তায় মগ্ন থাকেন নাকি ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়েন—এই রহস্যের উত্তর হয়তো সময়ের সাথেই পরিষ্কার হবে। তবে ৭৭ থেকে ৭৯ বছর বয়সে এসে প্রেসিডেন্টের মতো একটি হাড়ভাঙা খাটুনির দায়িত্ব পালন করা যে কোনো মানুষের জন্যই কঠিন চ্যালেঞ্জ, তা ট্রাম্পের এই আচর থেকেই স্পষ্ট।