বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি এখন ঢাকার দিকে। বিশেষ করে ওয়াশিংটন এই নির্বাচনকে কীভাবে দেখছে, তা নিয়ে দীর্ঘদিনের জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়েছেন নবনিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন। আজ বুধবার আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিনের সাথে এক সৌজন্য সাক্ষাৎ শেষে তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন—যুক্তরাষ্ট্র কোনো বিশেষ দলের পক্ষ নেবে না, বরং বাংলাদেশের জনগণের রায়ে গঠিত যেকোনো সরকারের সাথেই অংশীদারিত্ব বজায় রাখতে তারা অঙ্গীকারবদ্ধ।
ঢাকায় দায়িত্ব গ্রহণের পর এটিই ছিল সিইসির সাথে ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেনের প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈঠক। মার্কিন প্রতিনিধি দলের এই সফরকে কেন্দ্র করে নির্বাচন কমিশন এলাকায় কড়া নিরাপত্তা ও সংবাদকর্মীদের ভিড় ছিল লক্ষণীয়। প্রায় ঘণ্টাব্যাপী চলা এই বৈঠকে নির্বাচন আয়োজনের কারিগরি দিক, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং অন্তর্বর্তী সরকারের নেওয়া বিভিন্ন সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা হয়।
বৈঠক শেষে ব্রিফিংয়ে রাষ্ট্রদূত ক্রিস্টেনসেন তার বক্তব্যে তিনটি মূল বিষয়ের ওপর জোর দেন:
নিরপেক্ষতা: যুক্তরাষ্ট্র কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠীকে সমর্থন দিচ্ছে না।
প্রক্রিয়ার ওপর গুরুত্ব: নির্বাচনের ফলাফল নয়, বরং নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও প্রক্রিয়াটিই ওয়াশিংটনের কাছে মুখ্য।
জনগণের ম্যান্ডেট: ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে বাংলাদেশের মানুষ যাদের বেছে নেবে, তাদের সাথেই কাজ করবে বাইডেন প্রশাসন (বা তৎকালীন মার্কিন সরকার)।
রাষ্ট্রদূত তার বক্তব্যে গত সপ্তাহে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার সাথে হওয়া আলোচনার সূত্র টেনে বলেন, প্রধান উপদেষ্টা একটি উৎসবমুখর ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের স্বপ্ন দেখছেন। আমরাও চাই বাংলাদেশের মানুষ একটি আনন্দঘন পরিবেশে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করুক।
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, মার্কিন সিনেটে তার নিয়োগের শুনানির সময় থেকেই তিনি বাংলাদেশের এই ঐতিহাসিক নির্বাচন নিয়ে ব্যক্তিগতভাবে অত্যন্ত উচ্ছ্বসিত। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় এই নির্বাচনকে তিনি একটি মাইলফলক হিসেবে দেখছেন।
সিইসি এ এম এম নাসির উদ্দিনের সাথে আলাপকালে ক্রিস্টেনসেন আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারির ভোটের প্রস্তুতি সম্পর্কে অবহিত হন। অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচনের জন্য যে নতুন নীতিমালা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার প্রক্রিয়া গ্রহণ করেছে, সে বিষয়ে সিইসি তাকে বিস্তারিত ব্রিফ করেন। মার্কিন রাষ্ট্রদূত এই প্রস্তুতিমূলক ব্যবস্থার প্রশংসা করেন এবং একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রতি পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করেন।
তিনি বলেন, আমরা ফলাফল নিয়ে নয়, বরং একটি সুন্দর গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার সাফল্য নিয়ে আগ্রহী। বাংলাদেশের মানুষ তাদের ভবিষ্যৎ নেতা নির্বাচনের যে সুযোগ পাচ্ছে, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন, মার্কিন রাষ্ট্রদূত,
বিশ্লেষকদের মতে, ক্রিস্টেনসেনের এই বক্তব্য বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে একটি শক্তিশালী বার্তা দিচ্ছে। সাধারণত বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ থাকে, সেখানে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের এই 'নিরপেক্ষ অবস্থান' নির্বাচন কমিশনের ওপর আস্থা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে।
ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেনের এই সফরের মধ্য দিয়ে এটি স্পষ্ট যে, ওয়াশিংটন বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা ও গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিচ্ছে। কূটনৈতিক মহলের ধারণা, নির্বাচনের পর গঠিত নতুন সরকারের সাথে ব্যবসা-বাণিজ্য, নিরাপত্তা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো ইস্যুগুলোতে আরও নিবিড়ভাবে কাজ করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র।
আজকের এই বৈঠক কেবল একটি প্রথাগত সাক্ষাৎ ছিল না, বরং এটি ছিল বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি একটি শক্তিশালী আন্তর্জাতিক সমর্থন। এখন দেখার বিষয়, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ কীভাবে তাদের ম্যান্ডেট প্রদান করে এবং সেই রায়ের ভিত্তিতে বৈশ্বিক রাজনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান কোন দিকে মোড় নেয়।