রাজধানীর পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে ক্ষমতার অপব্যবহার ও তথ্য গোপনের মাধ্যমে সরকারি প্লট বরাদ্দ নেওয়ার অভিযোগে দায়েরকৃত পৃথক দুই মামলায় ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেছেন আদালত। এই রায়ে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তাঁর বোন শেখ রেহানার তিন সন্তান টিউলিপ সিদ্দিক, আজমিনা সিদ্দিক ও রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ববিকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড প্রদান করা হয়েছে।
সোমবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৪–এর বিচারক রবিউল আলম জনাকীর্ণ আদালতে এই যুগান্তকারী রায় পাঠ করেন।
আদালত আজ পৃথক দুটি মামলার রায় ঘোষণা করেন। একটি মামলা ছিল আজমিনা সিদ্দিকের নামে বরাদ্দকৃত প্লট নিয়ে এবং অন্যটি রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিকের প্লট সংক্রান্ত।
আজমিনা সিদ্দিক: ৭ বছরের কারাদণ্ড।
শেখ হাসিনা: ৫ বছরের কারাদণ্ড।
টিউলিপ সিদ্দিক: ২ বছরের কারাদণ্ড।
প্রত্যেককে ১ লাখ টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও ৬ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড।
রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ববি: ৭ বছরের কারাদণ্ড।
শেখ হাসিনা: ৫ বছরের কারাদণ্ড।
টিউলিপ সিদ্দিক: ২ বছরের কারাদণ্ড।
এই মামলাতেও প্রত্যেকের ১ লাখ টাকা জরিমানা এবং অনাদায়ে ৬ মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
দুদকের দায়ের করা এই মামলা দুটির মূল অভিযোগ ছিল— আসামিরা ক্ষমতার সর্বোচ্চ অপব্যবহার করে পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পের ২৭ নম্বর সেক্টরে ১০ কাঠার দুটি প্লট অবৈধভাবে বরাদ্দ নিয়েছেন।
তথ্য গোপন: শেখ হাসিনা পরিবারের সদস্যদের নামে আগে থেকেই শহরে একাধিক ফ্ল্যাট ও বাড়ি থাকার তথ্য গোপন করে রাজউকের প্লটের জন্য আবেদন করা হয়।
প্রভাব বিস্তার: তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর পদের প্রভাব খাটিয়ে রাজউক ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে এই বরাদ্দ নিশ্চিত করেন।
বিধি লঙ্ঘন: প্লট বরাদ্দের ক্ষেত্রে রাজউকের বিদ্যমান আইন, নীতিমালা এবং সাধারণ পদ্ধতিকে সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করা হয়েছে।
বিচারিক প্রক্রিয়ার মাইলফলক
গত বছরের ১৩ জানুয়ারি দুদকের সহকারী পরিচালক আফনান জান্নাত কেয়া এবং এস এম রাশেদুল হাসান পৃথকভাবে এই মামলা দুটি দায়ের করেন।
অভিযোগপত্র: ১৮ জন করে আসামির বিরুদ্ধে গত বছরের ১০ মার্চ চার্জশিট দাখিল করা হয়।
সাক্ষ্য গ্রহণ: আজমিনার মামলায় ৩১ জন এবং রাদওয়ানের মামলায় ২৮ জন সাক্ষী আদালতে জবানবন্দি দেন।
আসামিদের অবস্থা: মামলার ১৮ জন আসামির মধ্যে কেবল রাজউকের সাবেক সদস্য খুরশীদ আলম কারাগারে আছেন। শেখ হাসিনা ও তাঁর পরিবারের সদস্যসহ বাকি ২১ জন আসামি বর্তমানে পলাতক।
উল্লেখ্য যে, আজকের এই দুই মামলার সাজার আগে পূর্বাচলের অন্য চারটি প্লট দুর্নীতি মামলায় শেখ হাসিনাকে ইতিমধ্যে ২৬ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। আজকের ১০ বছর (৫+৫) যোগ হওয়ায় শুধুমাত্র প্লট দুর্নীতিতেই তাঁর মোট সাজার মেয়াদ দাঁড়িয়েছে ৩৬ বছর। এছাড়া এর আগে অপর একটি মামলায় শেখ রেহানাকে ৭ বছর এবং টিউলিপকে ২ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।
এই রায়ের মাধ্যমে দেশের ইতিহাসে প্রথমবার কোনো সরকারপ্রধানের পরিবারের সদস্যদের দুর্নীতির দায়ে বড় ধরণের সাজা কার্যকর হলো। আইনি বিশ্লেষকরা মনে করছেন, পলাতক আসামিদের ক্ষেত্রে এই রায় কার্যকর করা এখন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। তবে এই রায়ের ফলে রাজউকের অনিয়ম ও প্রভাবশালীদের ভূমি দখলের সংস্কৃতিতে একটি শক্ত বার্তা পৌঁছাল।