যুক্তরাজ্যের ক্ষমতাধর ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটের বাতাস এখন গুঞ্জনে ভারী। প্রশ্ন উঠছে, তবে কি কিয়ার স্টারমার যুগের অবসান হতে চলেছে? আর যদি হয়, তবে কি ব্রিটেনের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম ও নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইতিহাস গড়বেন শাবানা মাহমুদ? ওয়াশিংটনে যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্রদূত নিয়োগকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট কেলেঙ্কারি এবং লেবার পার্টির অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা এখন এক নতুন নেতৃত্বের দাবি তুলছে, যেখানে সবার আগে উচ্চারিত হচ্ছে ৪৫ বছর বয়সী ব্যারিস্টার শাবানা মাহমুদের নাম।
কিয়ার স্টারমারের নেতৃত্বের জন্য বর্তমান সময়টি সবচেয়ে কঠিন। যুক্তরাষ্ট্রে কুখ্যাত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টিন সংক্রান্ত নথি ফাঁসের রেশ এসে লেগেছে লন্ডনের ওয়েস্টমিনস্টারে। ওয়াশিংটনে নিযুক্ত ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত পিটার ম্যান্ডেলসনের সঙ্গে এপস্টিনের পুরোনো সম্পর্কের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসায় লেবার পার্টির ভেতরেই বিদ্রোহের সুর বেজে উঠেছে।
স্টারমারের অত্যন্ত বিশ্বস্ত চিফ অব স্টাফ মরগান ম্যাকসুইনি পদত্যাগ করে পরিস্থিতি সামলানোর চেষ্টা করলেও, সরকারের জনসমর্থন এখন তলানিতে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, স্টারমারের টিকে থাকার সম্ভাবনা এখন পঞ্চাশ শতাংশ।
বার্মিংহামে জন্ম নেওয়া শাবানা মাহমুদের শিকড় মূলত পাকিস্তান শাসিত কাশ্মীরের মিরপুরে। তবে তাঁর বেড়ে ওঠা এবং শিক্ষা পুরোপুরি ব্রিটিশ ঘরানার। তিনি অক্সফোর্ডের লিঙ্কন কলেজ থেকে ২০০২ সালে আইন বিষয়ে ডিগ্রি অর্জন করেন।
রাজনীতিতে পূর্ণকালীন প্রবেশের আগে তিনি একজন দক্ষ ব্যারিস্টার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। ২০১০ সালে তিনি যখন হাউস অব কমন্সে নির্বাচিত হন, তখন তিনি ছিলেন ব্রিটেনের প্রথম তিন মুসলিম নারী এমপির একজন। ২০২৫ সাল থেকে তিনি যুক্তরাজ্যের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করছেন। কিয়ার স্টারমারের ডান হাত হিসেবে পরিচিত এই নেত্রী এখন দলের ক্রান্তিকালের ত্রাতা হিসেবে আবির্ভূত হতে পারেন।
শাবানা মাহমুদের রাজনৈতিক দর্শন তাঁকে অন্যদের চেয়ে আলাদা করেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে তিনি অভিবাসন ইস্যুতে অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। তিনি প্রস্তাব করেছেন যে, স্থায়ী আবাসের জন্য আবেদনের সময়সীমা ৫ বছর থেকে বাড়িয়ে ১০ বছর করা উচিত। তাঁর মতে, ব্রিটেনে স্থায়ীভাবে বসবাস কোনো জন্মগত অধিকার নয়, এটি একটি বিশেষ সুযোগ।
এই অবস্থান তাঁকে লেবার পার্টির রক্ষণশীল ও ডানপন্থী ভোটারদের কাছে জনপ্রিয় করেছে, যদিও দলের বামপন্থী অংশ তাঁর ওপর কিছুটা নাখোশ। তবে বিশ্লেষকরা মনে করেন, এই কঠোর ভাবমূর্তিই তাঁকে সংকটের সময়ে নেতৃত্বের দৌড়ে এগিয়ে রাখছে।
শাবানা মাহমুদের নেতৃত্বের সম্ভাবনা নিয়ে লেবার পার্টির অন্দরে চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে। আইনি স্বচ্ছতা, বাগ্মিতা এবং কিয়ার স্টারমারের সঙ্গে দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ততা তাঁর মূল শক্তি। তিনি লেবার পার্টির কট্টর ডান হিসেবে পরিচিত এবং জাতীয় নিরাপত্তা ও সীমান্তে অত্যন্ত কঠোর।
তাঁর বিশেষ সুযোগ হলো গাজা যুদ্ধ ইস্যুতে ক্ষুব্ধ মুসলিম ভোটারদের আবার দলে ফেরানোর ক্ষমতা। তবে তাঁর প্রধান চ্যালেঞ্জ দলের বামপন্থী অংশের বিরোধিতা এবং নেতৃত্বের জন্য ৮১ জন এমপির সমর্থন অর্জন করা।
লেবার পার্টির জন্য বড় একটি মাথাব্যথার কারণ ছিল গাজা যুদ্ধে ইসরায়েলের প্রতি স্টারমার সরকারের সমর্থন। এর ফলে ব্রিটেনের বড় একটি মুসলিম জনগোষ্ঠী লেবার পার্টি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।
কৌশলগতভাবে, শাবানা মাহমুদকে নেতৃত্বে আনা হলে সেই ভোটারদের আবার দলের ছায়াতলে ফিরিয়ে আনা সম্ভব বলে মনে করছেন দলের নীতিনির্ধারকরা। তিনি একই সঙ্গে একজন ধর্মপ্রাণ মুসলিম এবং ব্রিটিশ মূল্যবোধের কঠোর অনুসারী, এই দ্বৈত পরিচয় তাঁকে এক অনন্য ভারসাম্য দান করেছে।
শাবানা মাহমুদ একক দাবিদার নন। তাঁর সঙ্গে আলোচনার টেবিলে রয়েছেন আরও কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা। ৪৩ বছর বয়সী স্বাস্থ্যমন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং অত্যন্ত চমৎকার বক্তা হিসেবে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বেশ জনপ্রিয়। এ ছাড়াও মন্ত্রিসভার আরও দু-একজন জ্যেষ্ঠ সদস্য নীরবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন।
যদি শাবানা মাহমুদ শেষ পর্যন্ত লেবার পার্টির নেতৃত্ব পান এবং প্রধানমন্ত্রী হন, তবে সেটি হবে যুক্তরাজ্যের সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসের এক বিশাল মাইলফলক। ঋষি সুনাকের পর দ্বিতীয় এশীয় বংশোদ্ভূত এবং প্রথম মুসলিম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি ব্রিটিশ বৈচিত্র্যের এক নতুন প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠবেন।
রাজনীতিতে এক সপ্তাহও দীর্ঘ সময়। কিয়ার স্টারমার কি শেষ পর্যন্ত এই ম্যান্ডেলসন কাণ্ড সামলে উঠতে পারবেন, নাকি তাঁকে সরে দাঁড়াতে হবে, তা আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই স্পষ্ট হবে।
তবে শাবানা মাহমুদ যেভাবে নিজেকে তৈরি করেছেন, তাতে তিনি কেবল একজন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে নয়, বরং আগামীর ব্রিটেনের কাণ্ডারি হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করতে প্রস্তুত। লন্ডনের ক্ষমতার অলিন্দে এখন একটাই প্রশ্ন, শাবানা মাহমুদ কি পারবেন ওয়েস্টমিনস্টারের ইতিহাসে তাঁর নাম স্বর্ণাক্ষরে লিখে রাখতে?