ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও ঐতিহাসিক জুলাই গণভোটের মাহেন্দ্রক্ষণে দাঁড়িয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দীন এক আশাজাগানিয়া মন্তব্য করেছেন। তিনি বিশ্বাস করেন, দীর্ঘ প্রতীক্ষা আর গণতান্ত্রিক লড়াইয়ের পর বাংলাদেশ অবশেষে সঠিক পথে যাত্রা শুরু করেছে।
আজ বৃহস্পতিবার সকালে রাজধানীর ইস্কাটন গার্ডেন উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রে নিজের ভোটাধিকার প্রয়োগের পর তিনি বলেন, দেশ গণতন্ত্রের ট্রেনে উঠে গেছে এবং এই ট্রেন অবশ্যই তার কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছাব।
ভোটের দিনটি যেন কেবল একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়া নয়, বরং সাধারণ মানুষের কাছে ধরা দিয়েছে এক মহোৎসব হিসেবে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার এই আমেজকে তুলনা করেছেন ঈদের খুশির সাথে।
তিনি বলেন, আমরা জাতিকে একটি উৎসবমুখর পরিবেশ উপহার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম। আজ গ্রাম-গঞ্জের চিত্র দেখুন, ঈদের মতোই মানুষ ট্রেন, বাস এবং লঞ্চে করে নাড়ির টানে ভোট দিতে ছুটে গেছে। অনেক বছর পর মানুষ কোনো ভয় বা দ্বিধা ছাড়া আনন্দের সাথে ভোট দিচ্ছে।
সিইসি নাসির উদ্দীন দাবি করেন, ২০২৬ সালের এই নির্বাচনটি আয়তনের দিক থেকে বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় নির্বাচন। তিনি জানান, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নির্বাচন কমিশন এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনাররা এই বিশাল আয়োজনের প্রস্তুতি দেখে বিস্মিত ও আনন্দিত হয়েছেন।
পরিসংখ্যানের আয়নায় এবারের নির্বাচনে গণভোট ও জাতীয় সংসদ নির্বাচন মিলিয়ে মোট ২৫৪ মিলিয়ন ব্যালট পেপার ছাপানো হয়েছে। প্রায় ১৭ লাখ মানুষ সরাসরি নির্বাচন কমিশনের অধীনে মাঠ পর্যায়ে কাজ করছেন।
সিইসি ঠাকুরগাঁওয়ের একটি কেন্দ্রের উদাহরণ দিয়ে বলেন, সেখানে বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থীদের পাশাপাশি দাঁড়িয়ে হাসিমুখে কথা বলা সুস্থ রাজনীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে সিইসি অত্যন্ত কঠোর ভাষায় গত এক দশকের নির্বাচনী সংস্কৃতির সমালোচনা করেন।
তিনি সাফ জানিয়ে দেন, এই দেশে আর কোনো পাতানো নির্বাচন হবে না। কেন্দ্র দখল বা ভোটের বাক্স ছিনতাইয়ের যে কালো ইতিহাস ছিল তা আমাদের ভুলে যেতে হবে। আমরা কোনো দল বা ব্যক্তির পক্ষে কাজ করছি না, আমরা কাজ করছি কেবল স্বচ্ছ পরিবেশ নিশ্চিত করতে।
তিনি আরও যোগ করেন যে, বড় কোনো অনিয়মের খবর পাওয়া গেলে নির্বাচন কমিশন তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিচ্ছে। দুই-একটি বিচ্ছিন্ন গোলযোগের খবর এলেও তা দ্রুত সমাধান করা হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
এবারের নির্বাচনে কমিশনের সামনে সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে দাঁড়িয়েছে ডিজিটাল অপপ্রচার। সিইসি স্বীকার করেন যে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে তৈরি করা ভুয়া তথ্য বা গভীর জালিয়াতি সম্বলিত ভিডিও ভোটারদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে।
এসব গুজবের একটি বড় অংশ দেশের বাইরে থেকে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে যেখানে ইসির সরাসরি নিয়ন্ত্রণ নেই। ইসি কেবল সত্য তথ্য সরবরাহের মাধ্যমে গুজবকে স্তিমিত করার কৌশল নিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের চেয়েও প্রথম সারির মূলধারার গণমাধ্যমের ওপর বেশি আস্থা রাখার জন্য তিনি সাধারণ মানুষের প্রতি আহ্বান জানান।
সিইসি যখন গণতন্ত্রের ট্রেনের কথা বলছেন, তখন রাজনৈতিক অঙ্গনে মিশ্র প্রতিক্রিয়াও দেখা যাচ্ছে। জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতা রুমিন ফারহানা অভিযোগ করেছেন যে, অন্তত ৯টি কেন্দ্র থেকে তাদের এজেন্টদের বের করে দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, বিএনপি ও জামায়াত নেতারা গত রাতের কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার কথা উল্লেখ করেছেন।
তবে সিইসি মনে করেন, বিশাল এই কর্মযজ্ঞে এসব ছোটখাটো সমস্যা নির্বাচনের মূল আবেদনকে ম্লান করতে পারবে না। ২৫৪ মিলিয়ন ব্যালট পেপার ছাপানো থেকে শুরু করে তা দুর্গম এলাকায় পৌঁছানো পর্যন্ত যে বিশাল চ্যালেঞ্জ ইসি মোকাবিলা করেছে, তার সফল পরিসমাপ্তি ঘটবে আজ বিকেল সাড়ে ৪টার পর।
প্রধান নির্বাচন কমিশনারের ভাষায়, বাংলাদেশ আজ যে পথে যাত্রা শুরু করেছে তা একটি টেকসই এবং শক্তিশালী গণতান্ত্রিক কাঠামো গঠনের ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবে কাজ করবে। পুরো দেশ এখন প্রতীক্ষায় আছে বিকেলের শেষ সূর্য ডোবার সাথে সাথে ব্যালট বাক্স থেকে কোন আগামীর বার্তা বেরিয়ে আসে তা দেখার জন্য।