ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাথমিক প্রবণতা ও বেসরকারি ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে যে, ৩০০টি সংসদীয় আসনের মধ্যে বিএনপি ও তাদের সমর্থিত জোট অন্তত ২১৩টি আসনে শক্ত অবস্থানে থেকে জয় নিশ্চিতের পথে এগিয়ে রয়েছে। এই ফলের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের প্রধানমন্ত্রী হওয়া এখন কেবল সময়ের ব্যাপার মাত্র।
২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত প্রথম এই প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনে জনমতের একচ্ছত্র প্রতিফলন ঘটেছে ধানের শীষের পক্ষে। আজকের এই ফলাফল কেবল একটি রাজনৈতিক দলের জয় নয়, বরং গত দেড় দশকের রুদ্ধশ্বাস রাজনৈতিক পরিবেশের বিপরীতে এক নতুন বাংলাদেশের সূচনার বার্তা দিচ্ছে। আজ সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ শেষে নির্বাচন কমিশন ও বেসরকারি সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্যমতে, দেশজুড়ে বিএনপি জোয়ার বইছে। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গ, চট্টগ্রাম ও ঢাকার আশপাশের আসনগুলোতে বিএনপি প্রার্থীরা বিপুল ভোটের ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছেন।
১৭০টি আসনে এগিয়ে থাকার খবরটি রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে একটি ভূমিধস বিজয়ের ইঙ্গিত। রাজধানীর ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, ঢাকা-১৭ আসনে তারেক রহমান নিজেই বিপুল ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছেন। রাজধানীর অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ আসনগুলোতেও বিএনপি প্রার্থীরা প্রাধান্য বিস্তার করছেন। বিভাগীয় পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চট্টগ্রাম বিভাগ, সিলেট বিভাগ, ঢাকা বিভাগ, ময়মনসিংহ বিভাগ ও বরিশাল বিভাগে বিএনপি জোটের অবস্থান সবচেয়ে সুসংহত। অন্যদিকে সিলেটেও জোটগতভাবে তারা শক্তিশালী প্রতিপক্ষ জামায়াতে ইসলামীকে কড়া চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
জুলাই বিপ্লবের নতুন প্রজন্মের বিশাল একটি অংশ এবার প্রথমবার ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছে। জরিপ অনুযায়ী এই তরুণদের বড় অংশই আগামীর সমৃদ্ধ অর্থনীতির প্রত্যাশায় তারেক রহমানের নেতৃত্বের ওপর আস্থা রেখেছে। লন্ডন থেকে নির্বাসিত জীবন শেষে গত ডিসেম্বরে দেশে ফেরার পর থেকেই তারেক রহমান রাজনীতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করেন।
তাঁর ঘোষিত ৩১ দফা সংস্কার প্রস্তাব এবং পরিবার কার্ডের মতো যুগান্তকারী প্রতিশ্রুতি সাধারণ মানুষের মন জয় করেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তারেক রহমান নিজেকে কেবল জিয়ার সন্তান হিসেবে নয়, বরং একজন দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন। বিশেষ করে দুর্নীতিবিরোধী কঠোর অবস্থান এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি তাঁকে জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে।
২০২৬ সালের এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে লড়াইটি মূলত হয়েছে বিএনপি বনাম জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোটের মধ্যে। তবে নির্বাচনী ময়দানে তারেক রহমানের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা ও দলীয় সংহতির কাছে অন্য কোনো জোট বা স্বতন্ত্র প্রার্থী টিকতে পারেনি। বিকেল সাড়ে ৪টা পরে ভোট গণনা শুরুর পর থেকেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বিজয় মিছিল করার প্রস্তুতি নিতে দেখা যায় বিএনপি নেতা-কর্মীদের। যদিও দলটির পক্ষ থেকে চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণার আগে ধৈর্য ধরার এবং উৎসবের বদলে শৃঙ্খলা বজায় রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ভোট দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার সময় সাংবাদিকদের এক সংক্ষিপ্ত বার্তায় তারেক রহমান বলেন যে, আজকের এই দিনটি কেবল ব্যালট বাক্সে সিল মারার দিন নয়, এটি বাংলাদেশের মানুষের মালিকানা ফিরে পাওয়ার দিন। ইনশাআল্লাহ জনগণের রায় প্রতিফলিত হলে আমরা একটি জবাবদিহিমূলক সরকার গঠন করব।
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, বিএনপির সরকার হবে ১৮ কোটি মানুষের সরকার, যেখানে কোনো দলীয়করণ বা প্রতিশোধের রাজনীতি থাকবে না। অর্থনৈতিক মুক্তি ও মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি প্রবৃদ্ধিকে এক ট্রিলিয়ন ডলারে নিয়ে যাওয়াই হবে তাঁর সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
এবারের নির্বাচনে মোট ভোটার সংখ্যা ছিল ১২ কোটি ৭৭ লাখের বেশি। সশস্ত্র বাহিনীর কঠোর নিরাপত্তায় ব্যালট পেপারে এই ভোট গ্রহণ করা হয়। সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি এবারই প্রথম সংবিধান সংস্কারের প্রশ্নে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে।
তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি জোটের এই অভাবনীয় জয় কেবল ক্ষমতার পালাবদল নয়, এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে এক সন্ধিক্ষণ। ১৭০টি আসনের ম্যাজিক সংখ্যা অতিক্রম করে তিনি কেবল প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পথে এগিয়ে যাচ্ছেন না, বরং শহীদ জিয়ার বহুদলীয় গণতন্ত্র এবং বেগম জিয়ার সংসদীয় গণতন্ত্রের উত্তরাধিকারকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করছেন। আজ রাতেই নির্বাচন কমিশন আনুষ্ঠানিকভাবে ফলাফল ঘোষণা করলে স্পষ্ট হবে আগামীর বাংলাদেশের পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা।
