
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) চিফ প্রসিকিউটর পদ থেকে অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ তাজুল ইসলামকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের প্রথিতযশা আইনজীবী মো. আমিনুল ইসলামকে নতুন চিফ প্রসিকিউটর হিসেবে স্থলাভিষিক্ত করা হয়েছে।
সোমবার এক বিশেষ প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সলিসিটর অনুবিভাগ থেকে জারি করা এই আদেশটি অবিলম্বে কার্যকর করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, নবনিযুক্ত চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম রাষ্ট্রের অ্যাটর্নি জেনারেলের পদমর্যাদা, বেতন-ভাতা এবং যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা ভোগ করবেন। এই পরিবর্তনের মাধ্যমে ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন টিমে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো বলে ধারণা করা হচ্ছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার ৫ সেপ্টেম্বর মোহাম্মদ তাজুল ইসলামকে চিফ প্রসিকিউটর হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিল। ছাত্র-জনতার বিপ্লবের পর গুম, খুনের বিচার এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের তদন্তে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সোচ্চার।
তবে ২০২৬ সালের শুরুতে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার পটপরিবর্তন ঘটে। নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিচার বিভাগে যে সংস্কারের ঢেউ শুরু হয়েছে, তাজুল ইসলামের বিদায় তারই একটি বড় অংশ বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। উল্লেখ্য, তাজুল ইসলাম এর আগে ট্রাইব্যুনালে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের ডিফেন্স আইনজীবী হিসেবে কাজ করেছিলেন, যা তাঁর নিয়োগের সময় বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছিল।
অ্যাডভোকেট মো. আমিনুল ইসলাম আইন অঙ্গনের একজন পরিচিত মুখ। বিশেষ করে সুপ্রিম কোর্টে দীর্ঘকাল আইন পেশায় নিয়োজিত থাকার পাশাপাশি তিনি গুরুত্বপূর্ণ মামলার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন। নতুন সরকার তাঁর ওপর যে আস্থা রেখেছে, তার প্রধান কারণ হতে পারে আইনি প্রক্রিয়ায় তাঁর দীর্ঘদিনের স্বচ্ছতা ও পেশাদারিত্ব। আমিনুল ইসলাম অতীতে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার আইনজীবী প্যানেলেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।
তাঁর নিয়োগের পর বিচারপ্রার্থী সাধারণ মানুষের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে। বিশেষ করে ৫ই আগস্ট পরবর্তী অপরাধের বিচার প্রক্রিয়া এবং গুমের সংস্কৃতি অবসানে ট্রাইব্যুনাল এখন কীভাবে এগোবে, তা দেখার অপেক্ষায় দেশবাসী।
তাজুল ইসলামের মেয়াদে ট্রাইব্যুনাল কেবল মানবতাবিরোধী অপরাধ নয়, বরং বিডিআর হত্যাকাণ্ড ও গুমের মামলার তদন্ত শুরুরও ইঙ্গিত দিয়েছিল। এখন প্রশ্ন উঠেছে, নতুন চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলামের অধীনে এই স্পর্শকাতর মামলাগুলোর গতিপ্রকৃতি কী হবে?
তাজুল ইসলাম বারবার বলে আসছিলেন যে, মানবতাবিরোধী অপরাধের ধারা অনুযায়ী বিডিআর হত্যাকাণ্ডের বিচার ট্রাইব্যুনালে সম্ভব। নতুন প্রসিকিউটর এই আইনি ধারা অব্যাহত রাখবেন কি না, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞ মহলে কৌতূহল রয়েছে।
গত ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে সংগঠিত হত্যাকাণ্ডের বিচারে এই ট্রাইব্যুনালই এখন মূল ভরসা। নতুন নেতৃত্বের অধীনে মামলার চার্জশিট দাখিল ও বিচার শুরু হওয়ার সময়সীমা নিয়ে এখন বড় পরীক্ষা।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর পদটি কেবল একটি পেশাদার পদ নয়, এটি একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল সাংবিধানিক অবস্থান। সরকার পরিবর্তন হলে এ ধরনের পদে রদবদল বাংলাদেশে অস্বাভাবিক নয়। তবে বিচারিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হলে প্রসিকিউশন টিমে রাজনৈতিক মেরুকরণের চেয়ে আইনগত দক্ষতাকে প্রাধান্য দেওয়া প্রয়োজন।
একজন জ্যেষ্ঠ কলামিস্টের ভাষায়, “তাজুল ইসলাম একটি অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে দায়িত্ব পালন করেছেন। আমিনুল ইসলামের নিয়োগ হলো পূর্ণাঙ্গ সরকারের অধীনে বিচারিক প্রক্রিয়াকে স্থায়ী রূপ দেওয়ার চেষ্টা। তবে বিচার যেন কোনোভাবেই প্রতিহিংসামূলক না হয়, সেদিকে সজাগ থাকতে হবে।
নতুন চিফ প্রসিকিউটরকে অ্যাটর্নি জেনারেলের সমান মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। এর অর্থ হলো, তিনি সরাসরি রাষ্ট্রের হয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধের আইনি লড়াই লড়বেন। তাঁর বেতন-ভাতা এবং অন্যান্য সুবিধাদিও হবে সর্বোচ্চ পর্যায়ের। প্রজ্ঞাপনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, পুনরাদেশ না দেওয়া পর্যন্ত তিনি এই দায়িত্বে বহাল থাকবেন।
ব্যক্তি বা পদের পরিবর্তন স্বাভাবিক, কিন্তু জনগণের মূল চাওয়া হলো ‘ন্যায়বিচার’। মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম তাঁর সময়ে যে ভিত্তি গড়েছেন, আমিনুল ইসলাম তা কতটুকু টেকসই করতে পারেন, সেটাই দেখার বিষয়। ২০২৬-এর এই নয়া বাংলাদেশে বিচার বিভাগের প্রতিটি পদক্ষেপে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা না গেলে আন্তর্জাতিক মহলে ট্রাইব্যুনালের গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।
আমিনুল ইসলামের হাত ধরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল একটি নিরেট বিচারিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে—এটাই আজ সারা দেশের মানুষের প্রত্যাশা। গুম, হত্যা ও ক্ষমতার অপব্যবহারের যে বিচারহীনতার সংস্কৃতি দীর্ঘ সময় ধরে চলেছে, তার সঠিক ও নিরপেক্ষ বিচারই হবে নতুন চিফ প্রসিকিউটরের সাফল্যের প্রধান মাপকাঠি।







