বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার গঠিত হওয়ার পর প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন। বৈঠকে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উন্নয়ন, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়।
সোমবার সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দফতরে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঘোষিত ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ (Bangladesh First) পররাষ্ট্রনীতিকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাগত জানায় চীন। বেইজিং মনে করে, বাংলাদেশের এই স্বাধীন ও স্বকীয় অবস্থান দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে এক নতুন ভারসাম্য তৈরি করবে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই স্পষ্ট করেছেন যে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি পরিচালিত হবে সম্পূর্ণভাবে জাতীয় স্বার্থকে কেন্দ্র করে। কোনো নির্দিষ্ট বলয়ের আজ্ঞাবহ না হয়ে ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’ শহীদ জিয়ার এই দর্শনকে আধুনিক রূপ দিয়ে তিনি ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতি গ্রহণ করেছেন।
চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন বৈঠকে আশ্বস্ত করেছেন যে, বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতা রক্ষায় চীন সব সময় পাশে থাকবে। তিনি বলেন, চীন একটি সার্বভৌম বাংলাদেশকে দেখতে চায়, যেখানে বাইরের কোনো দেশের হস্তক্ষেপ থাকবে না।বিশেষ করে পশ্চিমা দেশগুলোর প্রভাব বলয় যখন দক্ষিণ এশিয়ায় বাড়ছে, তখন চীনের এই অবস্থান অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
বৈঠকের অন্যতম প্রধান আলোচনার বিষয় ছিল দীর্ঘকাল ধরে ঝুলে থাকা তিস্তা প্রকল্প। এর আগে রোববার (২২ ফেব্রুয়ারি) পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সঙ্গে বৈঠক শেষে ইয়াও ওয়েন তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়নে চীনের প্রবল আগ্রহের কথা জানিয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আজকের সাক্ষাতেও সেই প্রসঙ্গের পুনরাবৃত্তি ঘটে।
চীন তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে বিনিয়োগ করতে চায়। তবে ভারতের পক্ষ থেকে এ নিয়ে সংবেদনশীলতা থাকায় বাংলাদেশের নতুন সরকার কতটা ইতিবাচক ভূমিকা নেবে, তা নিয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো ঘোষণা আসেনি। রাষ্ট্রদূত বলেন, “তিস্তা প্রকল্প কেবল একটি নদী ব্যবস্থাপনা নয়, এটি বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের কোটি মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের হাতিয়ার। চীন এ কাজে প্রযুক্তিগত ও আর্থিক সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত।
বৈঠকে মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত হওয়া রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রত্যাবাসন নিয়ে আলোচনা হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পাশাপাশি চীনের সক্রিয় মধ্যস্থতা কামনা করেন। বেইজিং এই সংকটের একটি স্থায়ী ও শান্তিপূর্ণ সমাধান চায় এবং নতুন সরকারের স্থিতিশীল পরিচালনার ক্ষেত্রে সব ধরনের প্রশাসনিক ও কারিগরি সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। চীন চায় বাংলাদেশের নতুন সরকার একটি দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতার মধ্য দিয়ে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাক।
দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের প্রভাব ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্রের যে তৎপরতা, সে বিষয়ে চীনা রাষ্ট্রদূত কিছুটা কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। ইয়াও ওয়েন সরাসরি না বললেও তৃতীয় কোনো দেশের (যুক্তরাষ্ট্র) হস্তক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, “চীন এই অঞ্চলের মানুষের উপকারের জন্য কাজ করছে। এখানে তৃতীয় কোনো শক্তি বা দেশের খবরদারি এই অঞ্চলের শান্তি নষ্ট করতে পারে।‘
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অবশ্য কূটনীতিক শিষ্টাচার বজায় রেখে জানিয়েছেন, বাংলাদেশ প্রতিটি দেশের সঙ্গে সম্মানজনক সম্পর্ক চায়, তবে তা অবশ্যই বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্ব বজায় রেখে।
নতুন সরকারের অধীনে বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ বৃদ্ধির বিষয়েও ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে অবকাঠামো উন্নয়ন, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (SEZ) এবং আইসিটি খাতে চীনের বৃহৎ কোম্পানিগুলো বিনিয়োগ করতে আগ্রহী। প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য সরকার একটি ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে বদ্ধপরিকর।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে চীনা রাষ্ট্রদূতের এই বৈঠকটি নির্দেশ করে যে, বাংলাদেশ এখন আর কোনো একক শক্তির ওপর নির্ভরশীল নয়। ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির মাধ্যমে ঢাকা যেমন চীনের বিনিয়োগ নিতে চায়, তেমনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের সঙ্গেও নিরাপত্তার সমীকরণ বজায় রাখতে চায়। রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনের ‘সার্বভৌমত্ব রক্ষার’ প্রতিশ্রুতি আসলে বাংলাদেশের নতুন সরকারকে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে এক ধরনের মানসিক ও কূটনৈতিক ব্যাকআপ হিসেবে কাজ করবে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে চীনের রাষ্ট্রদূতের এই সাক্ষাৎ কেবল একটি সৌজন্যমূলক বৈঠক ছিল না, এটি ছিল আগামীর পথচলার একটি দৃঢ় সংকেত। বেইজিং স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, বাংলাদেশের নতুন গণতান্ত্রিক সরকারের সঙ্গে তারা দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত অংশীদারিত্বে আগ্রহী। এখন দেখার বিষয়, তারেক রহমানের ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতি কীভাবে বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে দেশের উন্নয়ন ত্বরান্বিত করে।