জন-প্রতিরক্ষা থেকে সার্বভৌমত্ব: শহীদ জিয়ার কালজয়ী উদ্যোগ

জন-প্রতিরক্ষা থেকে সার্বভৌমত্ব: শহীদ জিয়ার কালজয়ী উদ্যোগ

শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের বৃহত্তম জননিরাপত্তা বাহিনী আনসার-ভিডিপি-র সংস্কারের পথপ্রদর্শক ছিলেন।

তিনি ৫ জানুয়ারি ১৯৭৬ তারিখে গ্রাম প্রতিরক্ষা দল (ভিডিপি) প্রতিষ্ঠা করেন। এর লক্ষ্য ছিল ৫০ লক্ষ সদস্যের একটি জন প্রতিরক্ষা বাহিনী গড়ে তোলার মাধ্যমে একটি অপ্রচলিত (unconventional) বাহিনী তৈরি করা।

জিয়াউর রহমানের এই দূরদর্শী উদ্যোগ—যিনি ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা এবং মুক্তিযুদ্ধকালীন নেতৃত্বের জন্য ‘শহীদ জিয়া’ হিসেবে সমাদৃত—একটি বিশাল এবং তৃণমূল পর্যায়ের নিরাপত্তা কাঠামোর ভিত্তি স্থাপন করেছিল। এই বাহিনী আজও দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য:

স্বাধীনতার পরবর্তী বছরগুলোতে বাংলাদেশ চরম প্রতিকূলতার সম্মুখীন হয়েছিল: অর্থনৈতিক অস্থিরতা, গ্রামীণ আইনহীনতা এবং একটি ভয়াবহ যুদ্ধের পর জাতীয় ঐক্য সুসংহত করার প্রয়োজনীয়তা। একজন সামরিক নেতা এবং পরবর্তীকালে রাষ্ট্রপতি হিসেবে জিয়াউর রহমান বুঝতে পেরেছিলেন যে, বিশাল গ্রামীণ জনসংখ্যা এবং সীমিত সম্পদের এই নবীন রাষ্ট্রের জন্য কেবল প্রথাগত সশস্ত্র বাহিনীর ওপর নির্ভর করা যথেষ্ট নয়।
৫ জানুয়ারি ১৯৭৬ সালে তিনি ভিডিপি (তৎকালীন আনসার কাঠামোকে একীভূত ও সম্প্রসারিত করে) প্রতিষ্ঠা করেন একটি “জন প্রতিরক্ষা বাহিনী” হিসেবে। লক্ষ্য ছিল লাখ লাখ প্রশিক্ষিত গ্রামবাসী ও সাধারণ মানুষকে নিয়ে একটি অপ্রচলিত ও গণভিত্তি সম্পন্ন সহায়ক বাহিনী তৈরি করা। এই বাহিনী অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা রক্ষা, পুলিশকে আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সাহায্য করা, গ্রামীণ উন্নয়নে অংশ নেওয়া এবং জাতীয় জরুরি অবস্থা বা বহিঃশত্রুর হুমকির সময় রিজার্ভ ফোর্স হিসেবে কাজ করবে।
আনসার ব্যাটালিয়ন গঠন এবং তৃণমূল পর্যায়ে ভিডিপি সংগঠিত করার মাধ্যমে জিয়া আনসার-ভিডিপিকে বিশ্বের বৃহত্তম আধা-সামরিক/সহায়ক বাহিনীতে রূপান্তরিত করেন, যা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে বেসামরিক স্বেচ্ছাসেবক এবং প্রশিক্ষিত সদস্যদের একটি সমন্বয়।
বর্তমান কাঠামো ও শক্তি
বর্তমানে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আনসার-ভিডিপি) সম্মিলিত সদস্য সংখ্যা ৬০ লক্ষের বেশি (স্বেচ্ছাসেবক এবং সংগঠিত ইউনিটসহ), যা এই ধরনের বাহিনীর ক্ষেত্রে বিশ্বজুড়ে অতুলনীয়। এর মধ্যে রয়েছে:

* প্রায় ৪২টি আনসার ব্যাটালিয়ন (পুরুষ, মহিলা এবং আনসার গার্ড ব্যাটালিয়নের মতো বিশেষায়িত ইউনিটসহ)।

* গ্রাম, ইউনিয়ন এবং উপজেলা পর্যায়ে বিশাল ভিডিপি নেটওয়ার্ক।
এই বাহিনী বাংলাদেশ পুলিশ, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এবং সশস্ত্র বাহিনীকে বিভিন্ন কাজে সহায়তা করে: যেমন নির্বাচনী নিরাপত্তা, দুর্যোগ মোকাবিলা, সন্ত্রাস দমন, গ্রামীণ পুলিশিং, মাদকবিরোধী অভিযান এবং কমিউনিটি উন্নয়ন। উদাহরণস্বরূপ, সাম্প্রতিক জাতীয় নির্বাচনে (২০২৬ সালের হিসাব অনুযায়ী), শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠু ভোট নিশ্চিত করতে হাজার হাজার ভোটকেন্দ্রে ৫ লক্ষ ৬০ হাজারেরও বেশি আনসার-ভিডিপি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছিল।

বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় গুরুত্ব:

সীমান্ত উত্তেজনা, আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ থেকে শুরু করে অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা, সাইবার ঝুঁকি এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগের মতো আধুনিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আনসার-ভিডিপির বিকেন্দ্রীকৃত কাঠামো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর কারণগুলো হলো:

১. তৃণমূল পর্যায়ের প্রতিরোধ ও দ্রুত সাড়া প্রদান:

গ্রামের প্রতিটি স্তরে সদস্য থাকায় এই বাহিনী অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা বা বহিরাগত অনুপ্রবেশের বিরুদ্ধে প্রাথমিক সতর্কবার্তা প্রদানকারী এবং প্রথম প্রতিরক্ষা স্তর হিসেবে কাজ করে। এই “জনগণের ঢাল” স্থানীয় পর্যায়ের হুমকি প্রতিরোধ করে জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষা করে।

২. সংকটের সময় জাতীয় প্রতিরক্ষা জোরদার করা:

জরুরি অবস্থায় (প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বিদ্রোহ বা যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি) আনসার-ভিডিপি সামরিক বাহিনীর সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করে। শান্তি রক্ষার জন্য পার্বত্য চট্টগ্রামের মতো সংবেদনশীল অঞ্চলে এই বাহিনীর ইউনিট মোতায়েন করা হয়েছে। এটি নিয়মিত বাহিনীর ওপর অতিরিক্ত চাপ না কমিয়েই আঞ্চলিক অখণ্ডতা বজায় রাখতে সাহায্য করে।

৩. অ-প্রথাগত হুমকি মোকাবিলা:

চরমপন্থা, চোরাচালান এবং মাদকপাচারের মতো আধুনিক চ্যালেঞ্জগুলো পরোক্ষভাবে সার্বভৌমত্বকে দুর্বল করে। আনসার-ভিডিপির কমিউনিটি পুলিশিং, যুব প্রশিক্ষণ এবং মাদকবিরোধী কার্যক্রম সামাজিক স্থিতিশীলতা বৃদ্ধি করে, যা বিদেশি শক্তির সুযোগ নেওয়ার পথ বন্ধ করে দেয়।

৪. নির্বাচনী স্বচ্ছতা ও গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিতকরণ:

মুক্ত ও সুষ্ঠু নির্বাচন সার্বভৌমত্বের ভিত্তি। নির্বাচনের সময় বিশাল সংখ্যক আনসার-ভিডিপি মোতায়েন সহিংসতা ও কারচুপি রোধ করে—যা স্বাধীন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে সুরক্ষিত রাখে।

৫. জাতীয় সংহতি ও আত্মনির্ভরশীলতা বৃদ্ধি:

সাধারণ নাগরিকদের (বিশেষ করে নারীদের) ক্ষমতায়নের মাধ্যমে এই বাহিনী সামাজিক বন্ধন ও অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ সুদৃঢ় করে। এটি জিয়াউর রহমানের সেই আত্মনির্ভরশীল জাতির স্বপ্নের সাথে সংগতিপূর্ণ, যা কেবল অভিজাত বাহিনীর ওপর নির্ভর না করে সম্মিলিত শক্তির মাধ্যমে নিজেকে রক্ষা করতে সক্ষম।

সারসংক্ষেপে, শহীদ জিয়াউর রহমানের আনসার-ভিডিপি গঠন ছিল একটি কৌশলগত মাস্টারস্ট্রোক: বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ সম্পদ—’মানুষকে’ তার শক্তিশালী প্রহরীতে পরিণত করা। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই জন প্রতিরক্ষা বাহিনী নিশ্চিত করে যে, স্বাধীনতা কেবল একটি ঐতিহাসিক অর্জন নয়, বরং একটি জীবন্ত বাস্তবতা। এটি ১৯৭১ সালের সেই অবিনাশী চেতনারই প্রতিফলন, যেখানে সাধারণ বাংলাদেশিরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে তাদের কষ্টার্জিত সার্বভৌমত্ব রক্ষায় অটল।

রচনায়:
মোহাম্মদ ইমরান চৌধুরী
ফ্রিল্যান্স লেখক, চট্টগ্রাম, বাংলাদেশ।
ই-মেইল: [email protected]
মোবাইল/হোয়াটসঅ্যাপ: 01818669065

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
Share on email