সামাজিক সুরক্ষায় নতুন দিগন্ত: ‘ফ্যামিলি কার্ড’ যুগে বাংলাদেশ

সামাজিক সুরক্ষায় নতুন দিগন্ত: ‘ফ্যামিলি কার্ড’ যুগে বাংলাদেশ

বাংলাদেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক মুক্তি ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এক অভিনব অধ্যায়ের সূচনা করলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আজ মঙ্গলবার রাজধানীর বনানীর কড়াইল বস্তি সংলগ্ন টিঅ্যান্ডটি খেলার মাঠে এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন।

এই প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের নারীপ্রধান পরিবারগুলো সরাসরি রাষ্ট্রীয় অর্থ সহায়তার আওতায় এলো, যা দেশের দারিদ্র্য বিমোচন কৌশলে একটি বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বেলা ১১টা ৩০ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছালে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। প্রধানমন্ত্রী নিজ হাতে কয়েকজন ভাগ্যবঞ্চিত নারীর হাতে এই বহুমুখী ‘ফ্যামিলি কার্ড’ তুলে দেন। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন তাঁর স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন এই কার্ডকে একটি ‘ভরসার নাম’ হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, ‘ফ্যামিলি কার্ড আজ আর কেবল নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বা স্বপ্ন নয়; এটি আজ প্রতিটি অসহায় মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে গেছে। এটি একটি আস্থার প্রতীক।’

ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় নির্বাচিত প্রতিটি পরিবার মাসিক ২ হাজার ৫০০ টাকা করে সরাসরি সরকারি অনুদান পাবে। এই টাকা বিতরণে কোনো মধ্যস্বত্বভোগীর সুযোগ রাখা হয়নি। উপকারভোগীরা তাদের পছন্দ অনুযায়ী মোবাইল ওয়ালেট (বিকাশ, নগদ ইত্যাদি) অথবা ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে ঘরে বসেই এই টাকা উত্তোলন করতে পারবেন। এটি সরকারের ‘ডিজিটাল ফিন্যান্সিয়াল ইনক্লুশন’ নীতির একটি বড় সাফল্য।

এই কর্মসূচির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো এর স্বচ্ছতা। সরকার কেবল মুখের কথায় নয়, বরং উন্নত সফটওয়্যারের মাধ্যমে দারিদ্র্য সূচক নির্ধারণ করে উপকারভোগী নির্বাচন করেছে। পরীক্ষামূলক পর্যায়ে ৬৭ হাজার ৮৫৪টি নারীপ্রধান পরিবারের তথ্য সংগ্রহ করা হয়।

সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে পরিবারগুলোকে হতদরিদ্র, দরিদ্র, নিম্নমধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত এই পাঁচটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে। দ্বৈত সুবিধা ভোগকারী, সরকারি চাকরিজীবী বা পেনশনভোগীদের বাদ দিয়ে কঠোর যাচাই-বাছাইয়ের পর ৩৭ হাজার ৫৬৭টি পরিবারকে এই ভাতার জন্য চূড়ান্তভাবে মনোনীত করা হয়েছে।

সরকার স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, এই কার্ড কেবল প্রকৃত অভাবী মানুষের জন্য। যদি কোনো পরিবারের কোনো সদস্য সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান থেকে বেতন-ভাতা বা পেনশন পান, তবে তারা এই সুবিধার বাইরে থাকবেন। এছাড়া ৫ লাখ টাকার বেশি সঞ্চয়পত্র, গাড়ি বা এসির মতো বিলাসদ্রব্য অথবা বড় বাণিজ্যিক লাইসেন্সধারী পরিবারগুলো এই ভাতার জন্য যোগ্য বিবেচিত হবে না। তবে পরিবারের অন্য সদস্যরা যদি অন্য কোনো নিয়মিত ভাতা (যেমন বয়স্ক বা বিধবা ভাতা) পান, তবে তা অব্যাহত থাকবে।

আগামী জুন পর্যন্ত চার মাসের পরীক্ষামূলক পর্যায়ের জন্য সরকার ৩৮ কোটি ৭ লাখ টাকা বরাদ্দ রেখেছে। সমাজকল্যাণ মন্ত্রী এ জেড এম জাহিদ হোসেনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এটি কেবল শুরু। ২০৩০ সালের মধ্যে এই ফ্যামিলি কার্ডকে বাংলাদেশের প্রত্যেক নাগরিকের জন্য একটি ‘সর্বজনীন সোশ্যাল আইডি কার্ড’ হিসেবে রূপান্তর করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে নাগরিকের যাবতীয় সামাজিক সুবিধা ও রাষ্ট্রীয় তথ্য একটি মাত্র কার্ডের মাধ্যমে পরিচালিত হবে।

কর্মসূচি পরিচালনায় কোনো প্রকার অনিয়ম বা স্বজনপ্রীতি ঠেকাতে কঠোর অবস্থান নিয়েছে সরকার। সমাজসেবা অধিদপ্তরের বিদ্যমান ‘চাইল্ড হেল্পলাইন ১০৯৮’-কে সাময়িকভাবে ফ্যামিলি কার্ডের অভিযোগ কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহারের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। খুব শীঘ্রই এ সংক্রান্ত একটি স্বতন্ত্র হটলাইন চালু করা হবে।

সরকার জোর দিয়ে বলেছে, ভাতাভোগী নির্বাচনে কোনো রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা করা হচ্ছে না। লক্ষ্য কেবল দারিদ্র্য বিমোচন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান উদ্বোধনী বক্তব্যে উল্লেখ করেন যে, এই প্রকল্প সফল হলে পরবর্তী ধাপে হতদরিদ্র পুরুষপ্রধান পরিবারগুলোকেও এই ভাতার আওতায় আনা হবে।

‘ফ্যামিলি কার্ড’ কেবল একটি প্লাস্টিকের কার্ড নয়; এটি রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যে এক নতুন সামাজিক চুক্তির প্রতিফলন। বিশেষ করে নারীপ্রধান পরিবারগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে সরকার নারীর ক্ষমতায়ন ও শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করার পথে একধাপ এগিয়ে গেল। রাজধানীর কড়াইল থেকে শুরু হওয়া এই পদযাত্রা যদি দেশব্যাপী সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে ২০৩০ সালের ‘উন্নত বাংলাদেশ’ গড়ার লক্ষ্যমাত্রা অর্জন অনেক সহজ হবে।

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
Share on email