বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০২৬ সালটি সম্ভবত এক নতুন মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হতে যাচ্ছে। কেবল ক্ষমতা দখল নয়, বরং নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের এক অনন্য নজির স্থাপনের পথে হাঁটছে বর্তমান সরকার।
মঙ্গলবার বনানীর টিঅ্যান্ডটি খেলার মাঠে 'ফ্যামিলি কার্ড' বিতরণ কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের মানুষের উদ্দেশ্যে এক জোরালো বার্তা দিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘নির্বাচনকালীন প্রতিশ্রুতি থেকে আমরা বিন্দুমাত্র বিচ্যুত হবো না।’
বনানীর জনাকীর্ণ এই অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে উঠে এসেছে রাষ্ট্র পরিচালনার আধুনিক দর্শন, নারীর ক্ষমতায়ন এবং একটি দায়বদ্ধ সরকারের রূপরেখা।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর ভাষণের শুরুতেই উল্লেখ করেন যে, বর্তমান বাংলাদেশ একটি পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, ‘বর্তমান বাংলাদেশে জনগণের প্রকৃত প্রতিনিধিমূলক সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই সরকার আকাশ থেকে নাজিল হওয়া কোনো শাসক গোষ্ঠী নয়, বরং জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত। ফলে এ দেশের প্রতিটি মানুষের কাছে এই সরকার জবাব দিতে আইনত ও নৈতিকভাবে বাধ্য।’
বিগত দিনগুলোতে প্রতিশ্রুতি দিয়ে তা পালন না করার যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, তা ভেঙে দেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি। তাঁর মতে, সরকার পরিচালনার প্রতিটি পদক্ষেপে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাই হবে তাঁর প্রধান লক্ষ্য।
বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকই নারী। এই বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে মূলধারার অর্থনীতিতে যুক্ত না করে একটি উন্নত রাষ্ট্র গড়া অসম্ভব বলে মনে করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি তাঁর বক্তব্যে বেগম খালেদা জিয়ার আমলের নারী শিক্ষা ব্যবস্থার উদাহরণ টেনে বলেন, ‘বিএনপি যখন অতীতে ক্ষমতায় ছিল, তখন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া নারীদের অবৈতনিক বা বিনামূল্যে শিক্ষার বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন। আজ আমাদের লক্ষ্য হলো সেই শিক্ষাকে অর্থনৈতিক সচ্ছলতায় রূপান্তর করা।‘
এই লক্ষ্য পূরণের প্রথম ধাপ হিসেবে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি চালু করা হয়েছে। এর মাধ্যমে নারীদের সরাসরি অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী জানান, প্রাথমিক পর্যায়ে ৩৭ হাজার নারী এই পাইলটিং কার্যক্রমে অংশ নিয়েছেন। আজকের অনুষ্ঠানে কড়াইল, ভাসানটেক এবং সাততলা বস্তি এলাকার প্রায় ১৫ হাজার নারীকে এই কার্ডের আওতায় আনা হয়েছে। আগামী ৫ বছরের মধ্যে বাংলাদেশের প্রায় ৪ কোটি পরিবারকে এই ডিজিটাল কার্ড সুবিধার আওতায় আনার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার।
ফ্যামিলি কার্ডের পাশাপাশি দেশের প্রাণভোমরা কৃষকদের নিয়েও বড় ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘আমরা নির্বাচনী ইশতেহারে যা বলেছি, তা কেবল স্লোগান ছিল না। আমরা কৃষকদের জন্য আলাদা 'কৃষক কার্ড' প্রদানের প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন করেছি।’
প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দেন যে, আগামী মাসের মধ্যেই সারা দেশের কৃষকদের হাতে এই বিশেষ কার্ড তুলে দেওয়া হবে। এছাড়াও কৃষকদের দীর্ঘদিনের দাবি অনুযায়ী, যাদের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণ ছিল, গত সপ্তাহেই সরকার সুদসহ সেই সম্পূর্ণ ঋণ মওকুফ করে দিয়েছে। এটি প্রান্তিক কৃষকদের অর্থনীতিতে প্রাণসঞ্চার করবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
সরকার গঠনের মাত্র এক মাসের মধ্যে ফ্যামিলি কার্ডের মতো বৃহৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু করাকে একটি বিরল প্রশাসনিক কৃতিত্ব হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘আমরা একটি দায়িত্বশীল সরকার হতে চাই। কাজ শুরু করার জন্য আমরা দীর্ঘ সময় নষ্ট করিনি। সরকার গঠনের এক মাসের মধ্যেই আমরা ফ্যামিলি কার্ড প্রদানের প্রস্তুতি ও বাস্তবায়নের কাজ শুরু করেছি।‘
বনানীর মাঠে উপস্থিত হাজারো মানুষের সামনে প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভবিষ্যৎ রূপরেখা তুলে ধরেন। তিনি বিশ্বাস করেন, প্রযুক্তিনির্ভর এই কার্ড ব্যবস্থার মাধ্যমে দুর্নীতি ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য বন্ধ হবে এবং সরকারি সুবিধা সরাসরি প্রকৃত প্রাপকের হাতে পৌঁছাবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তারেক রহমানের এই 'ফ্যামিলি কার্ড' ও 'কৃষক কার্ড' মডেলটি দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্য একটি আদর্শ হতে পারে, যেখানে সরাসরি জনকল্যাণের মাধ্যমে রাজনৈতিক ভিত্তি মজবুত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
তারেক রহমানের এদিনের বক্তব্য কেবল একটি উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্বোধন ছিল না, বরং এটি ছিল একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির ঘোষণা। যেখানে প্রতিশ্রুতি হবে পবিত্র এবং বাস্তবায়ন হবে দ্রুত। এখন দেখার বিষয়, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে ৪ কোটি পরিবারকে এই সুবিধার আওতায় আনার যে বিশাল লক্ষ্যমাত্রা প্রধানমন্ত্রী নির্ধারণ করেছেন, তা কতটা সফলভাবে সম্পন্ন হয়।