বাংলাদেশের আইনি অঙ্গনে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র এবং সুপ্রিম কোর্টের প্রথিতযশা সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল রাষ্ট্রের ১৮তম অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন।
বুধবার আইন মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এই নিয়োগ নিশ্চিত করা হয়। ছাত্রজীবন থেকে শুরু করে দীর্ঘ পেশাজীবনে মেধা, সততা এবং সাহসিকতার পরিচয় দেওয়া এই ব্যক্তিত্ব এখন থেকে রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করবেন।
বিদায়ী অ্যাটর্নি জেনারেল আসাদুজ্জামানের স্থলাভিষিক্ত হলেন তিনি, যিনি সম্প্রতি জাতীয় নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে বর্তমান মন্ত্রিসভায় আইনমন্ত্রীর দায়িত্বভার গ্রহণ করেছেন।
ব্যারিস্টার কাজলের জীবনের প্রতিটি পর্যায় ছিল সাফল্যের গল্পে মোড়ানো। ঝিনাইদহ জেলার মহেশপুর উপজেলার এক সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসা এই মেধাবী ছাত্র ১৯৮৮ সালে যশোর শিক্ষা বোর্ডে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় মানবিক বিভাগে সম্মিলিত মেধা তালিকায় ৮ম স্থান অধিকার করেছিলেন।
মেধার এই স্বাক্ষর তিনি বজায় রেখেছেন উচ্চশিক্ষাতেও। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করার পর তিনি আইন পেশাকেই নিজের ধ্যান-জ্ঞান হিসেবে বেছে নেন। পরবর্তীকালে লন্ডনের সম্মানজনক লিংকন’স ইন থেকে বার-অ্যাট-ল ডিগ্রি অর্জন করে তিনি নিজেকে বিশ্বমানের আইনি লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত করেন।
১৯৯৫ সালে ঢাকা জেলা ও দায়রা জজ আদালতে আইনজীবী হিসেবে তার যাত্রা শুরু হয়। এরপর ১৯৯৬ সালে তিনি সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সদস্য পদ লাভ করেন। ২০০৮ সালে তিনি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন।
দীর্ঘ তিন দশকের আইনি ক্যারিয়ারে তিনি অসংখ্য জটিল ও সংবেদনশীল মামলা পরিচালনা করেছেন। তার অসাধারণ আইনি দক্ষতা এবং গভীর পাণ্ডিত্যের স্বীকৃতি স্বরূপ ২০২৩ সালে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ তাকে 'সিনিয়র অ্যাডভোকেট' হিসেবে মর্যাদা প্রদান করে।
ব্যারিস্টার কাজল কেবল আইনি অঙ্গনেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না। ছাত্রজীবনে তিনি সাংবাদিকতার সাথে যুক্ত ছিলেন, যা তাকে সমাজের গভীর সমস্যাগুলো দেখার সুযোগ করে দিয়েছিল।
এছাড়া ২০০৩ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত তিনি লন্ডন হাইকমিশনে কূটনৈতিক কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই বৈচিত্র্যময় অভিজ্ঞতা তাকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে রাষ্ট্রীয় স্বার্থ সংরক্ষণে বিশেষ পারদর্শী করে তুলেছে।
আইনজীবীদের রাজনীতিতে ব্যারিস্টার কাজল একটি অতি পরিচিত নাম। তিনি বিএনপি-সমর্থিত জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব এবং বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সম্পাদক এবং বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের এক্সিকিউটিভ কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি সাধারণ আইনজীবীদের অধিকার আদায়ে সব সময় সোচ্চার ছিলেন।
তবে এই পথ তার জন্য সহজ ছিল না। বিগত সরকারের আমলে আইনজীবী সমিতির রাজনীতি করতে গিয়ে তাকে জেল-জুলুম এবং রিমান্ডের মতো কঠোর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে। প্রতিকূল পরিবেশেও তিনি তার আদর্শ থেকে বিচ্যুত হননি, বরং আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে বিচারহীনতার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে গেছেন।
জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে যখন বিচার বিভাগের স্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠার ডাক ওঠে, তখন ব্যারিস্টার কাজল অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। বিশেষ করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে দায়ের করা রিটের বিপক্ষে তার আইনি যুক্তি এবং সাবমিশন আইনজীবী মহলে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে।
এছাড়া দেশের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মামলা হিসেবে পরিচিত 'ষোড়শ সংশোধনী রিভিউ মামলা' এবং 'পঞ্চদশ সংশোধনী মামলা'র শুনানিতে তার অংশগ্রহণ ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সংবিধানের চেতনা রক্ষা এবং জনগণের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে তিনি উচ্চ আদালতে যে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছেন, তা তাকে রাষ্ট্রপ্রধানের নজরে নিয়ে আসে।
অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে ব্যারিস্টার কাজলের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিচার বিভাগের হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনা এবং রাষ্ট্রের আইনি স্বার্থ সঠিকভাবে রক্ষা করা। বর্তমান প্রেক্ষাপটে যখন দেশে বিচার বিভাগীয় সংস্কারের কাজ চলছে, তখন একজন অভিজ্ঞ ও সংগ্রামী আইনজীবীর এই পদে আসীন হওয়া অত্যন্ত ইতিবাচক বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
তিনি একদিকে যেমন সরকারের আইনি উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করবেন, অন্যদিকে উচ্চ আদালতে রাষ্ট্রের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে ভূমিকা রাখবেন।
তার এই নিয়োগের খবরে সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে আনন্দের জোয়ার বয়ে গেছে। সাধারণ আইনজীবীদের মতে, ব্যারিস্টার কাজল একজন আপাদমস্তক 'বার-ম্যান' বা আইনজীবীবান্ধব মানুষ। তার নিয়োগের ফলে আইনজীবীদের দীর্ঘদিনের দাবি এবং বিচার বিভাগের স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিশেষ করে তরুণ আইনজীবীদের কাছে তিনি এক অনুপ্রেরণার নাম।
ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল এমন এক সময়ে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন কর্মকর্তার দায়িত্ব নিলেন, যখন দেশ এক ক্রান্তিকাল পার করে নতুন ভোরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ঝিনাইদহের নিভৃত পল্লী থেকে উঠে এসে আজ রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইনি আসনে বসা এটি কেবল তার ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বরং মেধা ও সংগ্রামের জয়। আশা করা যায়, তার নেতৃত্বে অ্যাটর্নি জেনারেল অফিস আরও গতিশীল হবে এবং সাধারণ মানুষ আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারের সুফল পাবে।