বাংলাদেশের মৎস্য শিল্পে অভাবনীয় উন্নতি হয়েছে। বর্তমানে দেশটি মিঠা পানির মাছ উৎপাদনে বিশ্বে তৃতীয় স্থানে রয়েছে, যেখানে ২০২০ সালে উৎপাদন ১.২৫ মিলিয়ন মেট্রিক টন ছাড়িয়ে গেছে। দেশের ৮০ শতাংশ মানুষের প্রোটিনের প্রধান উৎস হিসেবে মাছের চাহিদা মেটাতে এই সাফল্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে মাছের উৎপাদন দ্রুত বাড়াতে কৃত্রিম হরমোন, অ্যান্টিবায়োটিক এবং অন্যান্য রাসায়নিকের ব্যাপক ব্যবহার জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের ভারসাম্যের ওপর বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে। এই নিবন্ধটি জনস্বাস্থ্যের ওপর এসব পদার্থের ক্ষতিকর প্রভাব এবং মাছের আকার বাড়াতে নিরাপদ ও টেকসই বিকল্পগুলো নিয়ে আলোচনা করছে।
মাছ চাষে ক্ষতিকর কৃত্রিম হরমোন ও রাসায়নিক
বাংলাদেশের মাছ চাষিরা মাছের দ্রুত বৃদ্ধি, লিঙ্গ পরিবর্তন এবং কৃত্রিম প্রজননের জন্য ১৭α-মিথাইলটেস্টোস্টেরন (17α-methyltestosterone), হিউম্যান কোরিওনিক গোনাডোট্রপিন (hCG) এবং পিটুইটারি গ্রন্থির নির্যাস জাতীয় হরমোন ব্যবহার করেন। বিশেষ করে মনোসেক্স তেলাপিয়া (যা দ্রুত বড় হয়) উৎপাদনের জন্য বা নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে মাছের ডিম ছাড়ার জন্য এগুলো ব্যবহৃত হয়। এছাড়া বিভিন্ন রোগ মোকাবিলায় অ্যান্টিবায়োটিক ও কীটনাশক এবং পানির মান ঠিক রাখতে বিভিন্ন অ্যাকুয়া-কেমিক্যাল ব্যবহার করা হয়।
২০২১ সালের এক জরিপে দেখা গেছে, রাজশাহী জেলার ৮৮% মাছ চাষির অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার সম্পর্কে সঠিক ধারণা নেই এবং ৮১% চাষি রাসায়নিকের সঠিক মাত্রা সম্পর্কে জানেন না। এছাড়া মাদারীপুর ও ময়মনসিংহে পরিচালিত গবেষণায় রুই ও কাতলা মাছের দেহে ইস্ট্রোজেনসহ বিভিন্ন হরমোনের অবশিষ্টাংশ পাওয়া গেছে যা অনুমোদিত মাত্রার চেয়ে অনেক বেশি।
জনস্বাস্থ্যের ওপর হরমোন ও রাসায়নিকের প্রভাব
মাছের মাধ্যমে এসব রাসায়নিক মানবদেহে প্রবেশ করে নিচের স্বাস্থ্যঝুঁকিগুলো তৈরি করতে পারে:
১. হরমোন জনিত সমস্যা (Endocrine Disruption): মাছের থাকা হরমোনের অবশিষ্টাংশ শিশুদের অকাল পরিপক্কতা বা দ্রুত বয়ঃসন্ধি, হাড়ের বয়সের অস্বাভাবিক পরিবর্তন এবং প্রজননগত জটিলতা তৈরি করতে পারে। এছাড়া স্তন ও প্রোস্টেট ক্যান্সারের মতো হরমোন-সংশ্লিষ্ট রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
২. অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ ক্ষমতা (AMR): মাছের শরীরে উচ্চমাত্রার অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ফলে মাছের দেহে এমন ব্যাকটেরিয়া তৈরি হয় যা অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে ধ্বংস করা যায় না। এই মাছ খেলে মানুষের শরীরেও সেই প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া চলে আসে, ফলে সাধারণ অসুখেও মানুষের শরীরে আর ওষুধ কাজ করে না।
৩. স্নায়বিক ও শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যা: রাসায়নিক মিশ্রিত মাছ খাওয়ার ফলে মানুষের স্নায়ুতন্ত্র, শ্বাসতন্ত্র এবং পরিপাকতন্ত্রের দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি হতে পারে।
৪. ভারী ধাতুর বিষক্রিয়া: কলকারখানার বর্জ্য থেকে আসা সিসা, ক্যাডমিয়াম এবং আর্সেনিক মাছের শরীরে জমা হয়। এসব মাছ খেলে কিডনি নষ্ট হওয়া এবং ক্যানসার হওয়ার উচ্চ সম্ভাবনা থাকে।
পরিবেশের ওপর প্রভাব
এই রাসায়নিকগুলো শুধু মানুষের নয়, প্রাকৃতিক জলাশয়ের বাস্তুসংস্থানেরও ক্ষতি করে। অতিরিক্ত হরমোন ব্যবহারের ফলে অনেক সময় মা মাছ (Brood fish) মারা যায় এবং জলজ জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হয়।
মাছের আকার বৃদ্ধিতে টেকসই ও নিরাপদ বিকল্প
কৃত্রিম হরমোন ছাড়াই মাছের উৎপাদন বাড়ানোর কিছু বিজ্ঞানসম্মত উপায় নিচে দেওয়া হলো:
* ইন্টিগ্রেটেড মাল্টি-ট্রফিক অ্যাকুয়াকালচার (IMTA): একই জলাশয়ে মাছের সাথে ঝিনুক বা শৈবাল চাষ করা। এটি পানির মান ভালো রাখে এবং প্রাকৃতিক উপায়ে মাছের পুষ্টি নিশ্চিত করে।
* উন্নত জাতের মাছের চাষ: হরমোন ছাড়াই দ্রুত বৃদ্ধি পায় এমন মাছের জাত (যেমন: GIFT তেলাপিয়া) ব্যবহার করা।
* উন্নত খাবার প্রয়োগ: ওমেগা-৩ এবং প্রোবায়োটিক সমৃদ্ধ খাবার মাছের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও বৃদ্ধি বাড়াতে সাহায্য করে।
* পানির গুণগত মান নিয়ন্ত্রণ: বায়োফ্লক (Biofloc) প্রযুক্তির মতো আধুনিক পদ্ধতি ব্যবহার করে প্রাকৃতিক উপায়ে পানি পরিষ্কার রাখা এবং মাছের সুস্থ বৃদ্ধি নিশ্চিত করা।
* প্রাকৃতিক প্রজনন: হরমোন ব্যবহার না করে পানির তাপমাত্রা ও প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে মাছকে প্রাকৃতিকভাবে ডিম ছাড়তে উৎসাহিত করা।
নীতি ও নিয়ন্ত্রণমূলক সুপারিশসমূহ
সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের করণীয়:
* হরমোন ও অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার কঠোরভাবে মনিটরিং করা।
* কলকারখানার বর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলা বন্ধ করতে ইটিপি (ETP) ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা।
* মাছ চাষিদের টেকসই চাষ পদ্ধতি সম্পর্কে যথাযথ প্রশিক্ষণ দেওয়া।
উপসংহার
মাছের উৎপাদন বাড়ানো দেশের অর্থনীতির জন্য জরুরি হলেও, জনস্বাস্থ্যকে ঝুঁকিতে ফেলে তা করা ঠিক নয়। হরমোন ও রাসায়নিকের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে বাঁচতে আমাদের টেকসই মাছ চাষ পদ্ধতির দিকে এগোতে হবে। সরকারি কঠোর নজরদারি এবং চাষিদের সচেতনতাই পারে নিরাপদ মৎস্য উৎপাদন নিশ্চিত করতে। একটি সুস্থ ও সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য নিরাপদ মৎস্য চাষের কোনো বিকল্প নেই।
"লিখেছেন:
মোহাম্মদ ইমরান চৌধুরী, চট্টগ্রাম, বাংলাদেশ। লেখক চট্টগ্রাম, বাংলাদেশ ভিত্তিক একজন ফ্রিল্যান্স লেখক। তাঁর সাথে যোগাযোগের মাধ্যম: ই-মেইল: [email protected], মোবাইল/হোয়াটসঅ্যাপ: +৮৮০১৮১৮৬৬৯০৬৫"