চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে অপরাধীদের অভয়ারণ্য হিসেবে পরিচিত জঙ্গল সলিমপুরে আবারও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর সশস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটেছে। গতকাল রোববার দিবাগত রাতে ‘ইয়াসিন বাহিনী’র একদল সন্ত্রাসী যৌথ বাহিনীর ক্যাম্পে অতর্কিত গুলিবর্ষণ করেছে। তাৎক্ষণিকভাবে পাল্টা গুলি চালায় যৌথবাহিনীর সদস্যরা।
আজ সোমবার ভোরে অভিযান চালিয়ে ক্যাম্পের চারপাশে প্রবেশ করে যৌথবাহিনী। কোনো ধরনের বাধা ছাড়াই অভিযান পরিচালনা করে। এসময় ১৫ থেকে ২০ জনকে আটক করা হয়েছে। আর এ ঘটনায় জঙ্গল সলিমপুরের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে আজ সকালে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়েছেন চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার (এসপি) মাসুদ আলম।
তিনি বলেন, ‘এই জঙ্গল সলিমপুর সন্ত্রাসীদের একটা বড় স্বার্থের এবং ইন্টারেস্টের জায়গা। এগুলো প্রতিটা টাকার বিষয়। কোটি কোটি টাকার বিশাল এ সাম্রাজ্য যখন তাদের হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে, তখন হাতছাড়া হওয়ার আগে তারা একটা ঝামেলার দিকে যাচ্ছে। তারা যতই ঝামেলার দিকে যাক, আমরা প্রতিহত করতে চেষ্টা করব।’
তিনি আরও বলেন, জঙ্গল সলিমপুরের সার্বিক পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশ ও অন্যান্য বাহিনী মাঠে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। আগামী দিনগুলোতে এই অবস্থান আরও জোরদার করা হবে। এখান থেকে পিছু হটার কোনো প্রশ্নই আসে না।
মাসুদ আলম বলেন, 'জঙ্গল সলিমপুরে অপরাধী যে হোক না কেন- ইয়াসিন, রোকন কিংবা অন্য যে কেউ সবাইকে খুঁজে বের করা হবে। এই চক্রের পেছনে যারা কলকাঠি নাড়ছে, তাদেরও আইনের মুখোমুখি হতে হবে।'
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মূল উদ্দেশের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের মূল লক্ষ্য হচ্ছে এই জনপদে যেকোনো মূল্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করে শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা। একে যেন আবার দেশের ভেতরে আরেক দেশ বা কোনো রাষ্ট্রের ভেতরে রাষ্ট্র না বানানো হয়, তার জন্য যা যা করা দরকার আমরা করব।’
উল্লেখ্য, গতকাল রোববার দিবাগত রাত ১টার দিকে জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় র্যাবের একটি ক্যাম্পকে লক্ষ্য করে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ‘ইয়াসিন বাহিনীর’ সদস্যরা গুলিবর্ষণ করেছে। তাৎক্ষণিকভাবে পাল্টা গুলি চালায় যৌথবাহিনীর সদস্যরা। রাত ৩টা পর্যন্ত উভয়পক্ষের মধ্যে গুলি বিনিময় অব্যাহত থাকে।
জানা গেছে, জঙ্গল সলিমপুর দুর্গম পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় এটি সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আস্তানায় পরিণত হয়েছে। সরকারি খাসজমি হওয়ায় এলাকাটিতে কারাগার, আইটি পার্ক নির্মাণসহ ১১টি প্রকল্পের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে বেহাত হওয়া জমি পুনরুদ্ধার করতে না পারায় এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না।
জঙ্গল সলিমপুর এলাকাটি দুটি অংশে বিভক্ত একদিকে ছিন্নমূল এলাকা, অন্যদিকে আলীনগর। দুটি অংশেই পাহাড় কেটে অবৈধভাবে গড়ে উঠেছে অসংখ্য ঘরবাড়ি, দোকানপাট ও মার্কেট। সীতাকুণ্ড ভূমি অফিসের তথ্যমতে, জঙ্গল সলিমপুরের মোট আয়তন প্রায় ৩ হাজার ১০০ একর। প্রায় চার দশক ধরে এই এলাকা সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে।
চলতি বছরের ১৯ জানুয়ারি জঙ্গল সলিমপুরে সন্ত্রাসীদের হামলায় র্যাবের উপসহকারী পরিচালক মোতালেব হোসেন নিহত হন। একই ঘটনায় র্যাবের আরও তিন সদস্য এবং মনা নামে একজন সোর্স গুরুতর আহত হন। নিহত মোতালেব বিজিবির নায়েব সুবেদার ছিলেন এবং প্রেষণে র্যাবে কর্মরত ছিলেন।
র্যাবের দাবি, যাকে গ্রেপ্তার করতে টিমটি গিয়েছিল, তিনি একাধিক মামলার গুরুত্বপূর্ণ আসামি এবং অস্ত্র লেনদেন চক্রের সঙ্গে যুক্ত।
পুলিশ ও র্যাব সূত্র জানায়, হামলাকারীদের মধ্যে চিহ্নিত সন্ত্রাসী, পাহাড়ি দখল গোষ্ঠী এবং অস্ত্র বেচাকেনার সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন থাকতে পারে।
গত ৯ মার্চ জঙ্গল সলিমপুরে অভিযান চালায় যৌথ বাহিনী। বিভিন্ন বাহিনীর প্রায় ৩ হাজার ১৮৩ জন সদস্য এ অভিযানে অংশ নেয়। এ অভিযান শেষে এলাকাটি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনে যৌথবাহিনী। সেখানে যৌথবাহিনীর দুটি ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে। সেই থেকে ওই এলাকা শান্ত থাকলেও রোববার রাতে আবার গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটেছে।