বিশ্ব মুসলিমের মিলনমেলায় মুখরিত হয়ে উঠেছে ঐতিহাসিক আরাফাতের ময়দান। লাখো হাজির ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক’ ধ্বনিতে আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত। গতকাল মিনায় দিনভর ইবাদতের মধ্য দিয়ে হজের যে পুণ্যময় যাত্রা শুরু হয়েছিল, আজ সূর্যোদয়ের পর হাজিরা মক্কা থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরের এই উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে সমবেত হতে শুরু করেছেন এবং সূর্যাস্ত পর্যন্ত এখানেই অবস্থান করবেন।
ইসলামী শরিয়তে আরাফাতের ময়দানে উপস্থিত হওয়াকে হজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রধান ফরজ কাজ হিসেবে গণ্য করা হয়। আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর বিখ্যাত হাদিস অনুযায়ী, ‘আরাফায় অবস্থান করাই হলো প্রকৃত হজ।’
আজ এই পুণ্যভূমিতে অবস্থিত মসজিদে নামিরাহ থেকে সমবেত মুসলিম উম্মাহর উদ্দেশে বিশেষ দিকনির্দেশনামূলক খুতবা বা ভাষণ দেবেন মসজিদে নববীর প্রধান খতিব ও ইমাম শায়েখ আলী বিন আবদুল রহমান আল হুজাইফি। খুতবা শেষে হাজিরা একই সঙ্গে জোহর ও আসরের সালাত আদায় করবেন।
আরাফাতের ময়দানে অবস্থানকালে হাজিরা সার্বক্ষণিক জিকির, তাসবিহ ও প্রার্থনায় নিমগ্ন থাকেন। বিশেষ করে দুপুরের পর যখন সূর্য পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়ে, তখন আল্লাহর মেহমানরা অশ্রুসিক্ত চোখে দুই হাত তুলে সৃষ্টিকর্তার দরবারে পাপমুক্তি ও রহমতের জন্য আকুল আবেদন জানান। হাদিসে বর্ণিত আছে, আরাফার দিনের চেয়ে বেশি আর কোনো দিন আল্লাহ তাআলা বান্দাদের জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন না এবং এই দিনে মহান আল্লাহ ফেরেশতাদের সামনে তাঁর বান্দাদের নিয়ে গৌরব করেন।
দিনশেষে সূর্যাস্তের পর হাজিরা মাগরিবের নামাজ না পড়েই প্রায় আট কিলোমিটার দূরের মুজদালিফার দিকে রওনা হবেন। সেখানে পৌঁছে মাগরিব ও এশার নামাজ একসঙ্গে আদায় করে খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাবেন। এই মুজদালিফা থেকেই মিনায় শয়তানকে মারার জন্য প্রয়োজনীয় পাথরের নুড়ি সংগ্রহ করা হবে।
পরদিন ফজরের নামাজ শেষে হাজিরা আবার মিনায় ফিরবেন এবং বড় শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ করবেন। এরপর আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য পশু কোরবানি ও মাথা মুণ্ডন করার মাধ্যমে তারা ইহরাম ত্যাগ বা হালাল হবেন। পরবর্তী দুই দিন (১১ ও ১২ জিলহজ) বাকি আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে মিনা ত্যাগ করবেন হাজিরা।
ইসলামের অন্যতম স্তম্ভ এই হজ পালনের মাধ্যমে একজন মানুষ সম্পূর্ণ নিষ্পাপ হয়ে ফিরে আসেন। বুখারি শরিফের হাদিস অনুযায়ী, যে ব্যক্তি গুনাহ ও অশ্লীলতা থেকে মুক্ত থেকে হজ সম্পাদন করে, সে মায়ের গর্ভ থেকে ভূমিষ্ঠ হওয়া নবজাতকের মতো পবিত্র হয়ে যায়; আর এমন মকবুল হজের একমাত্র প্রতিদান হলো জান্নাত।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে (১৪ হিজরি) বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ১৫ লাখেরও বেশি ধর্মপ্রাণ মুসলমান এই পবিত্র ইবাদতে অংশ নিয়েছেন, যার মধ্যে বাংলাদেশের হজযাত্রীর সংখ্যা ৭৮ হাজার।