
বাংলাদেশের পথে প্রান্তরে, গ্রাম-গঞ্জে এ প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত ছুটে চলেন এই বীর। তার দু’চোখ ভরা স্বপ্ন ছিল একটি স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ার। সেই মানুষটির নাম জিয়াউর রহমান। যার পরিচিতি দেশ ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বজুড়ে। মাত্র সাড়ে তিন বছরের শাসনামলে সদ্য যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশকে শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করিয়েছিলেন তিনি।
জিয়াউর রহমান দেখলেন যে দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করতে হলে কৃষিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। এ জন্য খাল খনন কর্মসূচিসহ নানা উদ্যোগের মাধ্যমে দেশকে এগিয়ে নেন নতুন পথে। তার নেওয়া বেশ কয়েকটি পদক্ষেপে অর্থনীতির ভিত মজবুত হয়। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের লক্ষ্যে প্রবাসে মানবসম্পদ গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন তিনি এবং রিজার্ভ শক্তিশালী করার ভিত্তি তৈরি করেন।
পোশাক খাতে বিপ্লব ঘটিয়ে দেশকে নিয়ে যান নতুন উচ্চতায়। শিক্ষাক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তনের ফলে বাড়তে থাকে স্বাক্ষরতার হার। স্বাস্থ্যসেবার আধুনিকায়নের সুফল পান কোটি কোটি মানুষ। একদলীয় শাসনব্যবস্থা বাকশালের অবসান ঘটিয়ে দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্রের ধারা প্রতিষ্ঠা করেন তিনি।
স্বপ্নে বিভোর এক রাষ্ট্রনায়ক বিশ্বের দরবারে লাল-সবুজের দেশকে চিনিয়েছেন সমৃদ্ধশালী এক ভূখণ্ড হিসেবে। ইরান-ইরাক যুদ্ধে তার প্রতিনিধিত্ব বাংলাদেশকে করেছে মহিমান্বিত। জাতীয়তাবাদের আদর্শে সাধারণ মানুষকে উজ্জীবিত করেন তিনি। বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে দেশের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে গড়ে তোলেন স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির ভিত্তি। আঞ্চলিক সহযোগিতা ও স্বার্থ রক্ষায় গঠন করেন সার্ক।
তবে হঠাৎ করেই থেমে যায় সেই স্বপ্নের যাত্রা। ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে কিছু বিপথগামী সেনাসদস্যের গুলিতে নিহত হন ক্ষণজন্মা মহানায়ক জিয়াউর রহমান। প্রবল জনপ্রিয় এই নেতার শেষ বিদায় ও জানাজায় ঢাকায় লাখো মানুষের ঢল নামে।
জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের মতে, জিয়াউর রহমান বেঁচে থাকলে বাংলাদেশ আরও উন্নত ও সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে গড়ে উঠতে পারত। তার আক্ষেপ, পরবর্তী সরকারগুলো যদি জিয়ার পথ অনুসরণ করত, তাহলে ৫৬ হাজার বর্গমাইলের বাংলাদেশের চিত্র বদলে যেত।
হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, জিয়াউর রহমান কেবল একজন বীর মুক্তিযোদ্ধাই নন, রাষ্ট্রপতি হিসেবেও তিনি জনগণের হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে নিয়েছেন। স্বজনপ্রীতি তাকে কখনো স্পর্শ করতে পারেনি। মৃত্যুর পর দেখা গেছে, এই বিশাল দেশে তার কোনো ব্যক্তিগত সম্পদ ছিল না। তার পররাষ্ট্রনীতি ছিল স্বাধীন এবং তিনি প্রতিটি ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটিয়েছিলেন। এ কারণেই তিনি জনগণের কাছে এতটা প্রিয় ছিলেন। তিনি বেঁচে থাকলে বাংলাদেশকে আরও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিতে পারতেন। তার মৃত্যুতে দেশের অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। বাংলাদেশ একজন মহান রাষ্ট্রপতিকে হারিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং বিএনপি গঠনকে জিয়াউর রহমানের অন্যতম অমর কীর্তি। জিয়াউর রহমান বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তা। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, একটি দেশপ্রেমিক ও দক্ষ রাজনৈতিক দল ছাড়া রাষ্ট্রব্যবস্থায় কার্যকর অবদান রাখা সম্ভব নয়। সেই উপলব্ধি থেকেই তিনি এমন একটি দল গঠন করেন, যা জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে সক্ষম হবে। বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ ছিল তার অমর দর্শন এবং সেই দর্শন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই তিনি বিএনপি গঠন করেন। দলটি আজও জনগণের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা ধরে রেখেছে এবং পরপর চারবার জনগণের ভোটে রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেছে। বিএনপি প্রতিষ্ঠা তার একটি মহান কীর্তি বলে আমরা মনে করি।
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের মতে, মুক্তিযুদ্ধে জিয়াউর রহমানের ভূমিকা যেমন ইতিহাসের অংশ, তেমনি স্বাধীনতার পর দেশ গঠনে তার অবদানও চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।