বাংলাদেশের কূটনৈতিক ইতিহাসে যুক্ত হয়েছে নতুন একটি অধ্যায়। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। আগামী এক বছর তিনি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন। ভোটাভুটিতে তিনি ৯৯টি দেশের সমর্থন পেয়ে জয়ী হন। তার প্রতিদ্বন্দ্বী সাইপ্রাসের প্রার্থী আন্দ্রেয়াস এস কাকোরিসের পক্ষে ভোট পড়েছে ৯১টি। এ নির্বাচনে জয়ের মধ্য দিয়ে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির আসনে দ্বিতীয়বারের মতো বসছেন বাংলাদেশের প্রতিনিধি। প্রায় চার দশক পর আবারও একজন বাংলাদেশি এ মর্যাদাপূর্ণ পদে নির্বাচিত হওয়ায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিষয়টি ব্যাপক গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।
অনেকের মনেই প্রশ্ন—এ পদটির প্রকৃত গুরুত্ব কতটুকু? এটি কি জাতিসংঘের সর্বোচ্চ পদ? খলিলুর রহমানের এ নির্বাচনে বাংলাদেশের কী ধরনের সুবিধা হতে পারে? এসব প্রশ্নের উত্তর জানতে হলে আগে বুঝতে হবে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি আসলে কী ধরনের দায়িত্ব পালন করেন।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি আসলে কে?
জাতিসংঘের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক কর্মকর্তা হলেন মহাসচিব। বর্তমানে এই দায়িত্ব পালন করছেন আন্তোনিও গুতেরেস। তিনি জাতিসংঘ সচিবালয়ের প্রধান এবং সংস্থাটির দৈনন্দিন প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করেন।
অন্যদিকে, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি বা President of the United Nations General Assembly (PGA) হলেন বিশ্বের সবচেয়ে বড় বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক ফোরামের নির্বাচিত প্রধান। তিনি ১৯৩টি সদস্যরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত সাধারণ পরিষদের কার্যক্রম পরিচালনা করেন।
সহজভাবে বললে, এই পদকে অনেকেই ‘বিশ্ব সংসদের স্পিকার’ হিসেবে বর্ণনা করেন। যেমন একটি দেশের সংসদে স্পিকার সংসদের অধিবেশন পরিচালনা করেন, তেমনি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের কার্যক্রম পরিচালনা করেন।
তবে তার দায়িত্ব কেবল বৈঠকে সভাপতিত্ব করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বৈশ্বিক নানা গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে আলোচনা এগিয়ে নেওয়া, সদস্যরাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সমঝোতা তৈরি করা এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক প্রক্রিয়াকে সচল রাখতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন তিনি।
কেন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির পদ এত মর্যাদাপূর্ণ?
প্রতি বছর সেপ্টেম্বর মাসে যুক্তরাষ্ট্রের নিওইয়র্ক শহরে অবস্থিত জাতিসংঘ সদর দফতরে বিশ্বের প্রায় সব দেশের নেতারা একত্রিত হন। এ সময় শুধু আনুষ্ঠানিক বক্তৃতা নয়, বরং অসংখ্য দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় বৈঠকও অনুষ্ঠিত হয়। একাধিক রাষ্ট্রনেতা ও কূটনীতিকের সঙ্গে অল্প সময়ে ধারাবাহিক বৈঠকের সুযোগ থাকায় অনেক কূটনীতিক জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের বার্ষিক অধিবেশনকে ‘কূটনৈতিক স্পিড ডেটিং’ বলেও আখ্যা দেওয়া হয়।
এখানে বিশ্বের প্রায় সব স্বাধীন ও স্বীকৃত রাষ্ট্র সমানভাবে প্রতিনিধিত্ব করে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই পরিষদে প্রতিটি দেশের ভোটের মূল্য সমান— সে দেশ বড় হোক বা ছোট, ধনী হোক বা দরিদ্র। ফলে এটি এমন একটি মঞ্চ, যেখানে বৈশ্বিক সিদ্ধান্ত ও আলোচনায় সব দেশের মতামত তুলে ধরার সুযোগ থাকে।
জলবায়ু পরিবর্তন, যুদ্ধ ও সংঘাত, মানবাধিকার, টেকসই উন্নয়ন, দারিদ্র্য বিমোচন, শরণার্থী সংকট, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে সাধারণ পরিষদে আলোচনা হয়। বিশ্বের ভবিষ্যৎকে প্রভাবিত করতে পারে— এমন প্রায় সব বড় আন্তর্জাতিক ইস্যুই এই ফোরামের আলোচ্যসূচিতে স্থান পায়।
এ কারণেই সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্বকে শুধু আনুষ্ঠানিক পদ হিসেবে দেখা হয় না। বরং এটি বৈশ্বিক কূটনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও দৃশ্যমান নেতৃত্বের অবস্থান। সভাপতি বিশ্বের রাষ্ট্রপ্রধান, সরকারপ্রধান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর শীর্ষ প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত গুরুত্বপূর্ণ অধিবেশন ও বিতর্ক পরিচালনা করেন। সদস্যরাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সমঝোতা তৈরির চেষ্টা করেন এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ইস্যুতে আলোচনা এগিয়ে নিতে ভূমিকা রাখেন।
সহজভাবে বললে, জাতিসংঘের মূল লক্ষ্য হলো আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করা এবং মানবজাতির সার্বিক উন্নয়নে কাজ করা। আর সেই সংস্থার সবচেয়ে বড় নীতিনির্ধারণী ও আলোচনামূলক ফোরামের সভাপতির দায়িত্ব পাওয়াকে তাই বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ আন্তর্জাতিক নেতৃত্বের পদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের কতদিন দায়িত্ব পালন করবেন?
প্রতি বছর সেপ্টেম্বর মাসের ৩য় মঙ্গলবার সাধারণ পরিষদের অধিবেশন বসে। সাধারণত ডিসেম্বর মাসের ১ম সপ্তাহ পর্যন্ত এ অধিবেশন স্থায়ী হয়। প্রয়োজনবোধে একাধিকবারও অধিবেশন বসতে পারে।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশন আনুষ্ঠানিকভাবে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে শুরু হবে। সাধারণত একজন সভাপতি এক বছরের জন্য দায়িত্ব পালন করেন। সেই হিসাবে খলিলুর রহমান সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে সেপ্টেম্বর ২০২৭ পর্যন্ত দায়িত্বে থাকবেন। এই এক বছরে তিনি জাতিসংঘের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক ও কূটনৈতিক কার্যক্রমগুলোর নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ পাবেন।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব কী?
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব বহুমাত্রিক। তিনি সাধারণ পরিষদের অধিবেশন পরিচালনা করেন এবং বিভিন্ন বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন। জাতিসংঘের বার্ষিক উচ্চপর্যায়ের সাধারণ বিতর্ক বা General Debate পরিচালনা করেন। এই বিতর্কে বিশ্বের প্রায় সব দেশের রাষ্ট্রপ্রধান, সরকারপ্রধান ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা বক্তব্য দেন। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ইস্যুতে সদস্যরাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আলোচনা ও সমঝোতা গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। জলবায়ু পরিবর্তন, টেকসই উন্নয়ন, মানবাধিকার, শান্তি ও নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা এগিয়ে নিতে ভূমিকা রাখেন। প্রয়োজন হলে বিশেষ অধিবেশন আহ্বানের প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এ ছাড়া বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্মেলন, অনুষ্ঠান ও কূটনৈতিক কার্যক্রমে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের প্রতিনিধিত্বও করেন তিনি।
তার ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা কোথায়?
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির পদ মর্যাদাপূর্ণ হলেও তার ক্ষমতার কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। অনেকেই মনে করেন, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি হয়তো জাতিসংঘের প্রধান সিদ্ধান্তদাতা। বাস্তবে বিষয়টি এমন নয়।
তিনি কোনো দেশকে এককভাবে শাস্তি দিতে পারেন না। কোনো যুদ্ধ থামিয়ে দেওয়ার ক্ষমতাও তার নেই। তিনি নিরাপত্তা পরিষদের মতো বাধ্যতামূলক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না কিংবা কোনো রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে পারেন না।
মূলত তার ভূমিকা হলো নেতৃত্ব দেওয়া, আলোচনা পরিচালনা করা এবং বিভিন্ন দেশের মধ্যে ঐকমত্য গঠনে সহায়তা করা। অর্থাৎ তিনি একজন রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমন্বয়ক, নির্বাহী শাসক নন।
বাংলাদেশের জন্য এই অর্জন কেন গুরুত্বপূর্ণ?
বিশ্লেষকদের মতে, এই নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ কূটনৈতিক অর্জন। বিশ্বের ১৯৩টি দেশের সামনে বাংলাদেশ এক বছরের জন্য দৃশ্যমান নেতৃত্বের আসনে থাকবে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম, কূটনৈতিক মহল এবং বৈশ্বিক নীতিনির্ধারণী আলোচনায় বাংলাদেশের উপস্থিতি আরও বাড়বে। এটি বাংলাদেশের কূটনৈতিক সক্ষমতার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। কোনো দেশকে এই পদে নির্বাচিত করার আগে সদস্যরাষ্ট্রগুলো তার কূটনৈতিক অবস্থান, গ্রহণযোগ্যতা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভারসাম্য বিবেচনা করে।
এদিকে, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দেশ হিসেবে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে বৈশ্বিক জলবায়ু ন্যায়বিচারের দাবি জানিয়ে আসছে। এই পদে থাকার ফলে জলবায়ু অর্থায়ন, অভিযোজন সহায়তা এবং ক্ষতিপূরণের মতো বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান আরও জোরালোভাবে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হবে।
আবার অন্যদিকে, রোহিঙ্গা সংকটের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতেও বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মনোযোগ ধরে রাখতে পারবে। বর্তমানে লাখ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী বাংলাদেশে অবস্থান করছে। তাদের নিরাপদ ও সম্মানজনক প্রত্যাবাসনের প্রশ্নটি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরার সুযোগ সৃষ্টি হবে।
এছাড়াও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সামরিক বা অর্থনৈতিক শক্তির পাশাপাশি সফট পাওয়ারও গুরুত্বপূর্ণ। সফট পাওয়ার বলতে বোঝায় এমন প্রভাব, যার মাধ্যমে একটি দেশ তার ভাবমূর্তি, সংস্কৃতি, কূটনীতি ও নৈতিক অবস্থানের মাধ্যমে অন্যদের আকৃষ্ট করতে পারে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির পদে একজন বাংলাদেশির নির্বাচিত হওয়া দেশের সফট পাওয়ার বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের গ্রহণযোগ্যতা ও ইতিবাচক ভাবমূর্তি আরও শক্তিশালী হতে পারে।
এর আগে কবে বাংলাদেশ এই পদ পেয়েছিল?
বাংলাদেশ এর আগে মাত্র একবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির পদে নির্বাচিত হয়েছিল। ১৯৮৬ সালে বাংলাদেশের কূটনীতিক হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৪১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হন। তারপর দীর্ঘ প্রায় ৪০ বছর পর আবারও একজন বাংলাদেশি এই মর্যাদাপূর্ণ দায়িত্ব পেলেন। এরও আগে, ১৯৭৮ সালে ১০ নভেম্বর শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীর উত্তমের নেতৃত্বে বাংলাদেশ তৎকালীন শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী জাপানকে পরাজিত করে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অধ্যাপক মুহাম্মদ শামসুল হক। সে ধারাবাহিকতায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে সভাপতি পদে এ জয়কে বাংলাদেশের কূটনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম বড় সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কীভাবে নির্বাচন হয়?
জাতিসংঘে পাঁচটি আঞ্চলিক গ্রুপ রয়েছে—আফ্রিকা, এশিয়া-প্যাসিফিক, পূর্ব ইউরোপ, ল্যাটিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চল এবং পশ্চিম ইউরোপ ও অন্যান্য রাষ্ট্র। প্রতি বছর এই অঞ্চলগুলোর মধ্যে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে সভাপতি নির্বাচনের সুযোগ দেওয়া হয়।
৮১তম অধিবেশনের জন্য এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের পালা ছিল। সেই অঞ্চলের প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন বাংলাদেশের খলিলুর রহমান। নির্বাচনে জাতিসংঘের ১৯৩টি সদস্যরাষ্ট্র ভোট দেওয়ার অধিকার রাখে এবং প্রতিটি দেশের ভোটের মূল্য সমান। গোপন ব্যালটে অনুষ্ঠিত ভোটে মোট ১৯০টি ভোট পড়ে। এর মধ্যে খলিলুর রহমান ৯৯ ভোট পান। তার প্রতিদ্বন্দ্বী আন্দ্রেয়াস এস. কাকোরিস পান ৯১ ভোট।