বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা ও যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যেও দেশের মূল্যস্ফীতি কমানো, খাদ্য নিরাপত্তা ও সাপ্লইচেইন ইকোসিস্টেম বজায় রেখে ব্যবসাবান্ধব এবং জনতুষ্টিমূলক বাজেট দেওয়ায় চিটাগাং চেম্বার নেতারা ধন্যবাদ জানিয়েছেন।
জনগণের ওপর ভ্যাট ও করের চাপ কমিয়ে করজাল বাড়ানো এবং দেশি-বিদেশি উৎস থেকে অর্থ সংস্থানকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সরকারের এই বাজেটকে ঐতিহাসিক বলে মন্তব্য করেন তাঁরা।
বাজেটে চট্টগ্রাম বন্দরের উন্নয়ন ও দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের জন্য নতুন নীতিমালা নিঃসন্দেহে চট্টগ্রামে বিনিয়োগকে উৎসাহিত করবে। ঢাকা-চট্টগ্রাম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে বাস্তবায়ন এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথের দূরত্ব ৮০ কিলোমিটার কমানোর সিদ্ধান্তকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক যোগাযোগ ব্যবস্থায় যুগান্তকারী পরিবর্তন আসবে।
পাশাপাশি চট্টগ্রাম অঞ্চলের শিল্প কারখানায় নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ এবং মীরসরাই বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে আবাসনসহ সব ধরনের ইউটিলিটি সেবা বাড়ানোর মাধ্যমে বিনিয়োগ উপযোগী করার আহ্বান জানান তাঁরা।
২০৩৪ সালের মধ্যে দেশের অর্থনীতিকে ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত, কল্যাণমূলক রাষ্ট্র গঠনে স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ঘোষণার মাধ্যমে জাতীয় সংসদে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বৃহস্পতিবার (১১ জুন) বিকেলে বাজেট উপস্থাপন করেন।
চিটাগাং চেম্বারের বাজেট প্রতিক্রিয়ায় উপস্থিত ছিলেন চেম্বারের সাবেক সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার আলী আহমেদ, আমীর হুমায়ুন মাহমুদ চৌধুরী, বর্তমান সিনিয়র সহ-সভাপতি মো. আমজাদ হোসেন চৌধুরী, সহ-সভাপতি মোহাম্মদ মসিউল আলম স্বপন, পরিচালক কামাল মোস্তফা চৌধুরী, আমান উল্লা আল ছগির (ছুট্টু), মোহাম্মদ আকতার পারভেজ, মোহাম্মদ মনির উদ্দিন, মো. জাহিদুল হাসান, আসাদ ইফতেখার, এএসএম ইসমাইল খান, ক্যাপ্টেন মো. আলাউদ্দিন আল আজাদ, মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম, সরোয়ার আলম খান, শহীদুল আলম, মোহাম্মদ শফিউল আলম ও মো. সেলিম নুর।
বিশেষ আমন্ত্রিত বিশেষজ্ঞদের মধ্যে প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর এসএম নসরুল কাদির, চট্টগ্রাম ট্যাক্সেস বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. সোলায়মান, সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান (সাগর), আইল্যান্ড সিকিউরিটিজ লিমিটেডের চেয়ারম্যান মো. মহিউদ্দিন, সীকম গ্রুপের সিএফও গোলাম কিবরিয়া, অডিট অ্যান্ড অ্যাকাউন্টস ফার্ম বাসু ব্যানার্জি নাথ অ্যান্ড কোম্পানির জিসি পাল, এমএম রহমান অ্যান্ড কোম্পানির সিদ্ধার্থ বড়ুয়া, মো. সবুজ অ্যান্ড কোম্পানির মোদাচ্ছার আহমেদ সিদ্দিকী, সানম্যান গ্রুপের আরশাদ উল্লাহ, জে এফ লিমিটেডের মনোয়ারুল হক, এমআরএইচ দে অ্যান্ড কোম্পানির সুমন চন্দ্র দে, কবির গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের মো. নুরুল হুদা সিদ্দিকী, এসএফ আহমেদ অ্যান্ড কোম্পানির মোহামিন আতিক চৌধুরী, জেনারেল সিকিউরিটিজের সাজ্জাদুল আলম চৌধুরী, চট্টগ্রাম লজিস্টিকসের এনামুল হক চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন।
বাজেটে মোট ব্যয় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা, মোট আয় ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা এবং মোট ঘাটতি ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ঘাটতি মোকাবেলায় বৈদেশিক ঋণের চেয়ে অভ্যন্তরীণ উৎস গুরুত্ব দেওয়া দেশীয় সক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ। বাজেটে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে মানবসম্পদ উন্নয়ন তথা শিক্ষা খাতকে।
ব্যক্তি করদাতাদের টার্নওভার করের আওতামুক্ত সীমা ৩ কোটি থেকে বাড়িয়ে ৪ কোটি এবং ব্যাংক স্থিতির ক্ষেত্রে আবগারি শুল্ক অব্যাহতির সীমা ৩ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪ লাখ টাকা করা হয়েছে এতে সাধারণ মানুষ ব্যাংকে টাকা রাখতে উৎসাহী হবে। এ ছাড়া বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর উপকারভোগীদের ভাতার হার বৃদ্ধির পাশাপাশি নারীদের স্বাবলম্বী করার জন্য ফ্যামিলি কার্ড জনপ্রতি ২৫০০ টাকা, প্রতিবন্ধী ভাতা, পর্যায়ক্রমে সব কৃষককে কার্ড প্রদান এবং ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণ মওকুফ, তরুণ উদ্যোক্তাদের জামানত ছাড়া ১০ লাখ টাকা ঋণ সুবিধা, বিদেশে উচ্চশিক্ষায় গমনেচ্ছুদের জন্য ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ সুবিধা যুগান্তকারী পদক্ষেপ।
বাজেটে করপোরেট কর ব্যবস্থা সহজ ও ব্যবসাবান্ধব করায় অনলাইনে আয়কর রিটার্ন দাখিল ও ব্যবসার অনুমোদনযোগ্য খরচ বাড়ানো এবং করপোরেট করহার অপরিবর্তিত রাখা ইতিবাচক। পাবলিক ট্রেডেড কোম্পানির করহার শর্তসাপেক্ষে ২২ দশমিক ৫ শতাংশ, পাবলিকলি ট্রেডেড ব্যাংক, বিমা ও ফাইন্যান্স কোম্পানির ক্ষেত্রে ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ, পাবলিকলি ট্রেডেড নয় এমন কোম্পানির ক্ষেত্রে ৪০ শতাংশ, মোবাইল অপারেটর কোম্পানির জন্য ৪৫ শতাংশ, বাংলাদেশি অনিবাসী করদাতাদর জন্য ৩০ শতাংশ, ট্রাস্ট ফার্ম ও ব্যক্তিসংগ প্রতিষ্ঠানের জন্য ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ, সমবায় সমিতি ২০ শতাংশ, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ১০ শতাংশ করহার নির্ধারণ করা হয়েছে। বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের করহার ১০ শতাংশ করায় উদ্যোক্তারা শিক্ষা খাতে আগ্রহী হবে। এ ছাড়া আমদানিকৃত ১১৩টি পণ্যের রেগুলার ডিউটি প্রত্যাহার, ৯টি পণ্যের সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহার এবং ৬৯টি পণ্যের কাস্টমস ডিউটি ২৫ শতাংশ থেকে ১৫ শতাংশ নির্ধারণ, শিশু খাদ্য প্রস্তুতের কাঁচামাল আমদানিতে শুল্কহ্রাস, সব মসলা আমদানিতে রেগুলেটরি শুল্ক ও খেজুর আমদানিতে রেগুলেটরি শুল্ক ৫ শতাংশ প্রত্যাহার, পোল্ট্রি, ডেইরি ও মৎস্য খাদ্য উৎপাদনকারী শিল্পের কাঁচামালে রেয়াতি সুবিধা দেওয়া মূল্যস্ফীতির চাপ কমবে এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে বলে মনে করেন চেম্বার নেতারা।
বাজেটে জ্বালানি সক্ষমতা বাড়াতে এবং সৌর বিদ্যুৎকে উৎসাহিত করতে সোলার প্যানেল, লিথিয়াম ব্যাটারিসহ আমদানিকৃত সোলার যন্ত্রপাতিতে রেয়াতি সুবিধা দেয়ায় জ্বালানি সক্ষমতা বাড়বে এবং সেমি কন্ডাক্টর শিল্পে রেয়াতি সুবিধা প্রদান এবং ইলেক্ট্রিক ভেহিকেল (ইভি) আমদানিতে অগ্রীম আয়করের পরিমাণ কমানোর ফলে একদিকে যেমন জ্বালানির ওপর চাপ কমবে তেমনি সৌর বিদ্যুৎ শিল্প এবং সেমি কন্ডাক্টর শিল্পে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়বে। এছাড়া দেশে ক্রমবর্ধমানভাবে সাধারণ মানুষের বাড়ছে প্রাণঘাতি ক্যান্সারসহ বিভিন্ন রোগ। এক্ষেত্রে ক্যান্সার ওষুধ উৎপাদনে কাঁচামাল আমদানিতে রেয়াতি সুবিধা দেওয়ায় ক্যান্সার প্রতিরোধক ওষুধ উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে। কিডনি ডায়ালাইসিস ফিল্টার আমদানিতে ৫ শতাংশ অগ্রীম কর মওকুফ করায় সাধারণ রোগীরা স্বস্তি পাবেন।
সরকার আইটি সেক্টরকে উৎসাহিত করতে এবং ফ্রিল্যান্সাররা তাদের আয় বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে আনার জন্য কর অব্যাহতি সুবিধা, কনটেন্ট ক্রিয়েটরের আয়কে করমুক্ত করা, স্টার্টআপ, উদ্ভাবনী উদ্যোগ ও প্রযুক্তি নির্ভর ব্যবসার ক্ষেত্রে টার্নওভার ট্যাক্স শূন্য করা, এসএমই উদ্যোক্তাদের টার্নওভার ৫০ লাখ টাকা, নারী ও প্রতিবন্ধী উদ্যোক্তাদের ৭০ লাখ টাকা পর্যন্ত করমুক্ত সীমা এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এলাকার বাইরে যেকোনো উৎপাদনমুখী শিল্প পর্যটন বা ক্রীড়া ক্ষেত্রে স্থাপনা ও যন্ত্রপাতি বিনিয়োগের ওপর ১ম বর্ষে ৬০ শতাংশ, ২য় বর্ষে ৪০ শতাংশ হারে ত্বরান্বিত অবচয় সুবিধা দেওয়ায় দেশে তরুণ প্রজন্ম, নারী এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীরা বিভিন্ন স্থানে শিল্প কারখানায় বিনিয়োগে উৎসাহিত হবে।
দেশের প্রধান চট্টগ্রাম বন্দরকে গতিশীল করতে এবং পণ্যজট শূন্য করতে অফডক ও আইসিডি খাত, লজিস্টিক্স, বেসরকারি বন্দর ও টার্মিনাল অপারেটর বিষয়ক বিধিমালা ও সংশ্লিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন ও সংশোধন করার মাধ্যমে চট্টগ্রামে বন্দরকেন্দ্রিক দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়বে।