চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের হিট প্রজেক্টের অর্থায়নে এবং Bangladesh Centre for Refugee Law Studies (BCRLS)-এর সহযোগিতায় ‘International Conference on Evolving Refugee Protection Architecture in South Asia 2026’ শীর্ষক আন্তর্জাতিক কনফারেন্স শনিবার (২৭ জুন ২০২৬) দিনব্যাপী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদ অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত হয়।
সম্মেলনের উদ্বোধনী অধিবেশনে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি মুহাম্মদ ইমান আলী। গেস্ট অব অনার হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ সরকারি কর্মকমিশনের সদস্য প্রফেসর ড. মুহাম্মদ শাহীন চৌধুরী। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (একাডেমিক) প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আল-আমীন, ইউনিভার্সিটি অব মিশিগান ল’ স্কুলের জেমস ই. অ্যান্ড সারা এ. ডিগান প্রফেসর অব ল’ এমেরিটাস অধ্যাপক জেমস সি. হ্যাথাওয়ে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ও ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য প্রফেসর ড. নকিব মুহাম্মদ নাসরুল্লাহ, কক্সবাজারস্থ শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (অতিরিক্ত সচিব) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান এবং ইউএনএইচসিআরের অ্যাসিস্ট্যান্ট রিপ্রেজেন্টেটিভ (প্রোটেকশন) অ্যাস্ট্রিড ক্যাস্টেলিন। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের প্রফেসর ড. বোরহান উদ্দিন খান। সভাপতিত্ব করেন চবি আইন অনুষদের ডিন প্রফেসর ড. মুহাম্মদ জাফর উল্লাহ তালুকদার, স্বাগত বক্তব্য রাখেন বিভাগের সভাপতি প্রফেসর ড. রকিবা নবী এবং ধন্যবাদসূচক বক্তব্য রাখেন চবি আইন বিভাগের প্রফেসর ড. আব্দুল্লাহ আল ফারুক।

সম্মেলনের সমাপনী অধিবেশনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ল কমিশনের চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি মাননীয় বিচারপতি জিনাত আরা। গেস্ট অব অনার হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) প্রফেসর ড. মো. সফিকুল ইসলাম। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক ও সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ এ.এন.এম. মোরশেদ খান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের ডিন প্রফেসর ড. মুহাম্মদ একরামুল হক এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের প্রফেসর ড. বেগম আসমা সিদ্দিকা। এ ছাড়া বক্তব্য দেন চবি আইন বিভাগের অধ্যাপক ও HEAT Project-এর ASPM প্রফেসর ড. আবদুল্লাহ আল ফারুক, আইন অনুষদের ডিন ও HEAT Project-এর ASPM প্রফেসর ড. মো. জাফর উল্লাহ তালুকদার এবং সভাপতিত্ব করেন আইন বিভাগের সভাপতি প্রফেসর ড. রকিবা নবী।
উদ্বোধনী সেশনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিচারপতি মুহাম্মদ ইমান আলী বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালীন শরণার্থী অভিজ্ঞতা এবং রোহিঙ্গা সংকটের প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন। তিনি রোহিঙ্গা শিশুদের জন্মনিবন্ধন, পরিচয় এবং শিক্ষার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করে বলেন, শরণার্থী সুরক্ষা শুধু খাদ্য ও আশ্রয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; তাদের মর্যাদাপূর্ণ জীবন, মানসম্মত শিক্ষা এবং ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার সুযোগ নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তিনি আইসিসিপিআর, আইসিইএসসিআর ও সিএটি-সহ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দলিলের আলোকে শরণার্থীদের অধিকার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন।
উদ্বোধনী সেশনে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে চবি উপ-উপাচার্য (একাডেমিক) প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আল-আমীন সবাইকে শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, শরনার্থী সুরক্ষা নিয়ে আজকের কনফারেন্সটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সময়োপযোগী। আমাদের পুরো জীবনটা আইনি প্রক্রিয়ায় আবদ্ধ, তেমনিভাবে শরনার্থীদের ক্ষেত্রে কিছু ভিন্নতা রয়েছে। শরনার্থীদের সেসব আইনি দিতে বিভিন্ন সংস্থা কাজ করছে। আজকের কনফারেন্সে শরনার্থী সুরক্ষা নিয়ে বিভিন্ন গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপন করা হবে। তিনি আয়োজিত এ সম্মেলনের ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং আশা প্রকাশ করেন, সম্মেলনের গবেষণা, আলোচনা ও সুপারিশসমূহ দক্ষিণ এশিয়ায় শরণার্থী সুরক্ষাবিষয়ক নীতি প্রণয়ন, আইন সংস্কার এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এছাড়া সম্মেলনে উপস্থাপিত গবেষণাপত্রসমূহ দক্ষিণ এশিয়ায় শরণার্থী সুরক্ষার জন্য নতুন দৃষ্টিভঙ্গি ও কার্যকর নীতিগত সুপারিশ প্রদান করবে বলে মনে করেন তিনি। এ কনফারেন্স আয়োজনে চবি আইন বিভাগসহ যারা পরিশ্রম করেছেন এবং যারা দূরদূরান্ত থেকে অংশ নিয়েছেন সবাইকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি।
সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মাননীয় বিচারপতি জিনাত আরা বলেন, শরণার্থী সুরক্ষা মূলত মানবিক মর্যাদা, ন্যায়বিচার এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের যৌথ দায়বদ্ধতার প্রশ্ন। তিনি উল্লেখ করেন, দক্ষিণ এশিয়া দীর্ঘদিন ধরে বাস্তুচ্যুতি, রাষ্ট্রহীনতা ও জোরপূর্বক অভিবাসনের মতো চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এ বাস্তবতায় অঞ্চলভিত্তিক শক্তিশালী আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলার ওপর তিনি গুরুত্ব আরোপ করেন। তিনি বলেন, শরণার্থী সুরক্ষা কেবল মানবিক সহায়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং আন্তর্জাতিক শরণার্থী আইন, মানবাধিকার আইন, প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইন, মানবিক নীতি এবং পরিবেশগত ন্যায়বিচারের সমন্বয়ে একটি বহুমাত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করতে হবে।
সমাপনী অধিবেশনে গেস্ট অব অনারের বক্তব্যে চবি উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) প্রফেসর ড. মো. সফিকুল ইসলাম সবাইকে শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, এ কনফারেন্সে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পাঁচটি থিমেটিক বা বিষয়ভিত্তিক সেশন অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং এসব সেশনে অনেকগুলো চমৎকার ও মানসম্মত গবেষণাপত্র (রিসার্চ পেপার) উপস্থাপিত হয়েছে। এই সেশনগুলো থেকে আমরা দুর্যোগ ও সংকটের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পেরেছি; বিশেষ করে সুরক্ষা (প্রটেকশন), সংবেদনশীলতা (ভালনারেবিলিটি), ক্ষয়ক্ষতি প্রশমন (মিটিগেশন) এবং আমাদের দায়িত্বসমূহ (রেসপন্সিবিলিটি) নিয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। তিনি বলেন, আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, এই সম্মেলনের মাধ্যমে আমরা একে অপরের সাথে মূল্যবান জ্ঞান ও নতুন নতুন আইডিয়া শেয়ার করতে পেরেছি। এই আয়োজন আমাদের পারস্পরিক যোগাযোগ ও নেটওয়ার্কিংকে আরও সুদৃঢ় করবে যা ভবিষ্যতে আমাদের শিক্ষাগত ও পেশাগত উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখবে। সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ।
সমাপনী বক্তব্যে চবি আইন বিভাগের সভাপতি ICERPASA 2026-এর কনভেনার এবং HEAT Project-এর SPM প্রফেসর ড. রকিবা নবী এবং আইন অনুষদের ডিন প্রফেসর ড. মুহাম্মদ জাফর উল্লাহ তালুকদার সম্মেলনের সফল আয়োজনে সহযোগিতার জন্য দেশি-বিদেশি অতিথি, গবেষক, অংশীদার প্রতিষ্ঠান, স্বেচ্ছাসেবক ও অংশগ্রহণকারী সকলের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানান। তিনি ভবিষ্যতেও শরণার্থী আইনবিষয়ক গবেষণা, জ্ঞান বিনিময় এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে অংশগ্রহণকারী, গবেষক ও অতিথিদের মাঝে সনদপত্র, সম্মাননা স্মারক ও ক্রেস্ট বিতরণ করা হয়। অনুষ্ঠানটির স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার হিসেবে ছিল Bangladesh Legal Aid and Services Trust (BLAST)। দক্ষিণ এশিয়ায় শরণার্থী সুরক্ষার বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ, আঞ্চলিক আইনি কাঠামোর প্রয়োজনীয়তা এবং নীতিনির্ধারণে গবেষণাভিত্তিক সুপারিশ প্রণয়নের লক্ষ্যে এ আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সম্মেলনে দেশ-বিদেশের বিচারপতি, আইনবিদ, নীতিনির্ধারক, আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধি, গবেষক, শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন। অনুষ্ঠান যৌথভাবে সঞ্চালনা করেন চবি আইন বিভাগের প্রভাষক রাশপিয়াতুর রাশপি ও সৈকত দাশ এবং ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির সিনিয়র লেকচারার রিয়াদ মাহমুদ ও নাবিলা পারভীন।