বৃষ্টি হলেই চট্টগ্রামে যেন শুরু হয় আরেকটি পরিচিত মৌসুম। পাহাড় ধসের ঝুঁকিতে থাকা মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নিতে জেলা প্রশাসন ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মাইকিং, ঝুঁকিপূর্ণ বসতি চিহ্নিতকরণ, আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত, পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির সভা এবং অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে অভিযানের ঘোষণা ছিল প্রতিবছরের চেনা দৃশ্য। এমন বাস্তবতার মধ্যেই বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট সুস্পষ্ট লঘুচাপের প্রভাবে চট্টগ্রাম ও আশপাশের এলাকায় শুরু হয়েছে বৃষ্টি।
রবিবার (৫ জুলাই) ভোর থেকে থেমে থেমে বৃষ্টিতে ভিজেছে নগরের বিভিন্ন এলাকা। আগামী ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনার কথা জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। জানিয়েছে, পাহাড় ধসের শঙ্কাও।
২০০৭ সাল থেকে গত ১৭ বছরে পাহাড় ধসে ২৪৮ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। যা গড়ে প্রতি বছর ১৫ জনের বেশি। পাহাড় ধস ও প্রাণহানি এড়াতে দীর্ঘ এই সময়ে নানা সিদ্ধান্তও নিয়েছে বিভাগীয় কমিশনারের নেতৃত্বে গঠিত পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটি। কিন্তু কোনো কিছুতেই থামেনি পাহাড় কাটা।
২০১৮ সালের ১৪ অক্টোবর নগরীর আকবরশাহ থানাধীন ফিরোজশাহ কলোনিতে পাহাড় ধসে মারা যান চার জন। ২০১৯ সালে কুসুমবাগ আবাসিক এলাকা পাহাড় ধসে এক শিশু প্রাণ হারায়। পাহাড় ধসে এত প্রাণহানির পরও বন্ধ হয়নি পাহাড় কাটা, দখল ও বসতি স্থাপনা। ২০০৮ সাল থেকে এ পর্যন্ত পাহাড় ধস এবং প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে আরও ১২১ জনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। সবমিলে ২০০৭ সাল থেকে গত ১৭ বছরে নগরে ও আশপাশে পাহাড় ধসে ২৪৮ জন প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।
নিম্নচাপের প্রভাবে টানা বৃষ্টিতে চট্টগ্রামে পাহাড়ধসের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এ কারণে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারীদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে মাইকিং করছে জেলা প্রশাসন। একইসঙ্গে নগরের সব আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। পাহাড়সংলগ্ন স্কুল, কলেজ, মসজিদ ও মাদ্রাসাগুলোকেও অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে প্রস্তুত রাখা হয়েছে।সোমবার (৬ জুলাই) সকাল থেকে নগরের বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকায় জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে মাইকিং করা হচ্ছে। এর আগে রোববার রাতেও নগরের বিভিন্ন এলাকায় একইভাবে সতর্কতামূলক প্রচারণা চালানো হয়।
জেলা প্রশাসন জানায়, আকবরশাহ ঝিল ১, ২ ও ৩ নম্বর এলাকা, বিজয়নগর পাহাড়, শান্তিনগর পাহাড়, বেলতলীঘোনা পাহাড়, টাংকির পাহাড়, আমিন জুট মিল এলাকা, পাহাড়িকা, সমবায় আবাসিক এলাকা, মিয়ার পাহাড়, মুরাদপুর রেলস্টেশন-সংলগ্ন রেলওয়ের পাহাড়, মতিঝর্ণা, লালখান বাজারের পোড়া কলোনি, ঢেবারপাড়, আমবাগান এবং উত্তর হালিশহর উপকূলসংলগ্ন এলাকায় বিশেষভাবে মাইকিং করে বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে।
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, আবহাওয়া অধিদপ্তর ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত জারি করেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে পাহাড়ধসের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। তাই মাইকিং করে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে বসবাসকারীদের আশ্রয়কেন্দ্রে চলে যাওয়ার জন্য বলা হচ্ছে। মানুষের জানমাল রক্ষায় জেলা প্রশাসনের কয়েকটি দল মাঠে কাজ করছে। মাইকিংয়ের পাশাপাশি মানুষকে ঝুঁকিপূর্ণ স্থান থেকে সরে যাওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে এবং ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকা থেকে বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
বিশ্বকলোনির নন্দন হাউজিং, শাপলা আবাসিক এলাকা, কাঁচাবাজার সংলগ্ন পাহাড়ি বসতি, ভেতর ফিরোজশাহ, ঝিল ফিরোজশাহ এবং আকবর শাহয়ের পাহাড়ি এলাকা ঘুরে দেখা যায়, পাহাড়ের গা ঘেঁষে এখনো অসংখ্য ঝুঁকিপূর্ণ বসতি রয়েছে। কোথাও টিনশেড ঘর, কোথাও বাঁশ ও কাঠের তৈরি অস্থায়ী বসতি। পাহাড় কেটে তৈরি করা ঢালের নিচে বসবাস করছে শত শত পরিবার। অনেক স্থানে পাহাড়ের ঢালে আগাছা ও ঝোপঝাড় বেড়ে উঠলেও কোথাও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা চোখে পড়েনি।
অবাধে পাহাড় কাটলেও পরিবেশ অধিদফতরের তৎপরতা না থাকায় চট্টগ্রামের ভারসাম্য যেমন নষ্ট হচ্ছে, তেমনি ভূমিদস্যুরা ভাড়া ও প্লট বাণিজ্যে মেতে উঠেছে। পাহাড়ের মাটি ধসে পড়ছে অবৈধভাবে মাটি কেটে ভূমিদস্যুদের প্লট বাণিজ্য করার কারণে। বিভিন্ন পদ্ধতিতে বিশেষ করে বর্ষায় পাহাড়ের চূড়ায় গর্ত করে পানি জমিয়ে মাটি ধসের ঘটনা ঘটানো হচ্ছে।
পাহাড়ের অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ বসতি প্রসঙ্গে নগর পরিকল্পনাবিদ প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার মতে, ‘পাহাড় ধসের বড় কারণ শুধু অতিবৃষ্টি নয়, দীর্ঘদিন ধরে পাহাড় কেটে বসতি নির্মাণ, অবৈধ দখল এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণ। বর্ষা মৌসুমে এসব ঝুঁকি আরও বহুগুণ বেড়ে যায়। তাই শুধু আবহাওয়ার পূর্বাভাস দিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। ঝুঁকিপূর্ণ বসতি থেকে মানুষকে সরিয়ে নেওয়া, পাহাড়ে নতুন দখল বন্ধ করা এবং অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়াও সমান জরুরি।’