পরিবেশগত স্থায়িত্ব নিশ্চিতকরণ, বনায়নে অনন্য নজির এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষায় দৃষ্টান্তমূলক অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ দেশের অন্যতম সর্বোচ্চ পরিবেশগত সম্মাননা 'জাতীয় বৃক্ষরোপণ পুরস্কার-২০২৫'-এ প্রথম স্থান অর্জন করেছে কোরিয়ান এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোন (কেইপিজেড)।
গত বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) রাজধানী ঢাকায় আয়োজিত এক জমকালো অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই গৌরবময় পুরস্কার ও ট্রফি তুলে দেন। ইয়াংওয়ান করপোরেশন ও কেইপিজেডের চেয়ারম্যান এবং সিইও মিঃ কিহাক সাং প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে বাংলাদেশের সবুজ শিল্পায়নের পথে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই মাইলফলক সম্মাননাটি গ্রহণ করেন।
চট্টগ্রামের আনোয়ারা ও কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ তীরে ২ হাজার ৪৯২ একর পাহাড়ি ও উর্বর ভূমির ওপর গড়ে ওঠা এই বেসরকারি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলটি গত ২৬ বছরে দেশে পরিবেশবান্ধব শিল্পায়নের এক অনন্য রোল মডেল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। ১৯৯৯ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে শিল্পায়নের পাশাপাশি প্রকৃতির ভারসাম্য বজায় রাখাকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে কেইপিজেড কর্তৃপক্ষ। কেইপিজেড-এর মোট ভূমির প্রায় ৫২ শতাংশ এলাকাই রাখা হয়েছে সম্পূর্ণ উন্মুক্ত, যার মধ্যে রয়েছে বিশাল বনায়ন, সমৃদ্ধ বোটানিক্যাল গার্ডেন, লেক এবং কৃত্রিম জলাধার। আর অবশিষ্ট ৪৮ শতাংশ জমি ব্যবহৃত হচ্ছে পরিবেশবান্ধব আধুনিক শিল্প ও অবকাঠামো উন্নয়নে। কেইপিজেড কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে যে, প্রকল্প শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত ওই এলাকায় প্রায় ৩০ লাখ গাছ রোপণ করে সবুজের এক অভূতপূর্ব বিপ্লব ঘটানো হয়েছে। সবুজায়নের এই ধারা অক্ষুণ্ণ রাখতে চলতি বছরও আরও প্রায় দুই লাখ নতুন চারা রোপণ করা হচ্ছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের এক জরিপে দেখা গেছে, এই বিস্তীর্ণ বনাঞ্চলে ইতোমধ্যে ৪০০টিরও বেশি উদ্ভিদ প্রজাতি শনাক্ত হয়েছে এবং এটি বর্তমানে ২৯২ প্রজাতির বন্যপ্রাণী ও পাখির নিরাপদ প্রাকৃতিক আবাসে পরিণত হয়েছে। কেইপিজেডের এই বোটানিক্যাল গার্ডেনে উদ্ভিদের প্রজাতি সংখ্যা ২০২৭ সালের মধ্যে ১ হাজার ৮৫০-এ উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে কাজ চলছে।
পরিবেশ সুরক্ষায় টেকসই প্রযুক্তির ব্যবহারে কেইপিজেড এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে। বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের পানি ধরে রাখতে এখানে তৈরি করা হয়েছে ৩৭টি বিশাল জলাধার, যেখানে প্রায় ৬০০ মিলিয়ন গ্যালনেরও বেশি পানি সংরক্ষণ করা সম্ভব। কারখানার শিল্প বর্জ্য পরিশোধনে সার্বক্ষণিক আধুনিক ইটিপি (ETP) পরিচালনার পাশাপাশি, কার্বন নিঃসরণ কমাতে এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে এখানে ৬০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি সুবিশাল রুফটপ সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ চলছে, যার মধ্যে ৪০ মেগাওয়াট ইতোমধ্যে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়ে সফলভাবে চলছে।
টেকসই পরিবেশ নিশ্চিত করার পাশাপাশি দেশের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানেও বিশাল অবদান রাখছে এই রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলটি। বর্তমানে কেইপিজেডে সচল রয়েছে ৫৩টি অত্যাধুনিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান, যেখানে প্রত্যক্ষভাবে কাজ করছেন ৪০ হাজারেরও বেশি শ্রমিক, যাদের প্রায় ৭৫ শতাংশই নারী। এছাড়া আরও ২৭টি প্রকল্পের নির্মাণকাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে এবং নতুন করে আরও ৩৮টি প্রকল্প অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। এই পরিকল্পিত প্রকল্পগুলো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে এখানে প্রায় দুই লাখেরও বেশি মানুষের বিশাল কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। পুরস্কার প্রাপ্তি প্রসঙ্গে কেইপিজেড কর্তৃপক্ষ গভীর সন্তোষ প্রকাশ করে জানায়, কর্ণফুলী নদীর তীরবর্তী একসময়ের অনূর্বর ভূমিকে বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ পরিবেশবান্ধব বেসরকারি সবুজ শিল্পাঞ্চলে রূপান্তর করতে পারা অত্যন্ত গর্বের বিষয়। এই জাতীয় স্বীকৃতি টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, পরিবেশের সুরক্ষা এবং মানুষের কল্যাণে কেইপিজেডের চলমান অগ্রযাত্রাকে আরও বেশি অনুপ্রাণিত করবে।