
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান ছিল মূলত ১৫ বছরের গণতন্ত্রবিধ্বংসী শাসন থেকে মুক্তির সংগ্রাম, গণতন্ত্রে উত্তরণের সংগ্রাম। ৫ আগস্টের পর ক্ষমতায় আসা অন্তর্বর্তী সরকার জনআকাঙ্ক্ষা পূরণে পুরোপুরি সফল না হলেও ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন দেশের রাজনীতিতে বড় টার্নিং পয়েন্ট। ত্রয়োদশ নির্বাচনে ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠা করে জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে।
আজ সেই ৩৬ জুলাই, অর্থাৎ ৫ আগস্ট। চব্বিশের জুলাই-আগস্টের ৩৬ দিনের গুরুত্ব ও তাৎপর্য বাংলাদেশের ইতিহাসে অনেক। কারণ জুলাইয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গণঅভ্যুত্থান। গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দেশের মানুষ পেয়েছে নতুন বাংলাদেশ। স্বাধীনচেতা বিপ্লবী তরুণ প্রজন্মের আন্দোলনের মুখে হাসিনা সরকারের পতনের শুরু হয়েছিল চব্বিশের জুলাইয়ে। অকুতোভয় ছাত্র-জনতা, শ্রেণি, ধর্ম, বর্ণ, বয়স সব ভেদাভেদ মুছে দিয়ে এক কাতারে এসে দাঁড়িয়েছিল। যদিও অভ্যুত্থানের শুরুতে সরকার পতনের লক্ষ্য নিয়ে শুরু হয়নি। ছিল শুধু দেশ থেকে বৈষম্য দূর করার আন্দোলন, কোটা সংস্কারের আন্দোলন।
সরকারি চাকরিতে কোটা বাতিলের পরিপত্র পুনর্বহালের দাবিতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দানা বাঁধে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে। পরে জুলাই মাসেই রংপুরের তরুণ-প্রাণ আবু সাঈদের আত্মত্যাগের পথ ধরে শিক্ষার্থী, শ্রমিক, মজুরসহ শত শত মানুষ শাসকের বন্দুকের নলের সামনে বুক পেতে দাঁড়ানোর নজিরবিহীন সাহস দেখান। বিরলতম সেই আত্মত্যাগে বিজয়ী হয় ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান, জনজোয়ারে ভেসে যায় ক্ষমতার দম্ভ। সৃষ্টি হয় নতুন এক বাংলাদেশের।
জুলাই অভ্যুত্থানের গভীরে যাওয়ার আগে যেতে হবে জুন মাসে। ঘটনার শুরুটা ছিল ২০২৪ সালের ৫ জুন। সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধা কোটা বাতিল করে ২০১৮ সালে জারি করা পরিপত্রকে হাইকোর্ট অবৈধ ঘোষণা করে। ফলে ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটা আবার বহাল হয়। এর প্রতিবাদে পরদিন ৬ জুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেন ছাত্ররা। সেদিন বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সামনে উচ্চারিত হয় স্লোগান ‘কোটা না মেধা? মেধা মেধা।’
১ জুলাই সামনে আসে যে নাম বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। এ ব্যানারে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রত্যাশী রাজু ভাস্কর্যে গিয়ে জড়ো হন। সেখান থেকে ২০১৮ সালের সরকারি প্রজ্ঞাপন পুনর্বহাল করতে হবে দাবি জানানো হয়। দাবি না মানা হলে ৪ জুলাই পর্যন্ত ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনসহ তিন দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেন আন্দোলনের মুখপাত্র নাহিদ ইসলাম।
১১ জুলাই পর্যন্ত সিদ্ধান্ত না আসায় শিক্ষার্থীদের আন্দোলন জোরদার হয়। এদিন হাইকোর্ট জানান, সরকার চাইলে কোটা পদ্ধতি পরিবর্তন বা পরিবর্ধন করতে পারে। এরপরও আন্দোলন-অবরোধের তীব্রতা বাড়তেই থাকে। সরকারের আহ্বান উপেক্ষা করে শিক্ষার্থীরা দেশজুড়ে ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচি শুরু করে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়সহ কয়েকটি স্থানে সংঘর্ষ ঘটে। রক্তাক্ত হয় অনেক শিক্ষার্থী। এতে গোটা দেশ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। সেই উত্তাপে ঘি ঢালেন তৎকালীন সড়কমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। তিনি লেলিয়ে দেন ছাত্রলীগকে। ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগসহ ক্ষমতাসীন দলের কর্মীরা হামলা চালায়। এতে আন্দোলন আরো বেগবান হয়। এরপরও সরকার চাইলে আন্দোলনকে থামিয়ে দিতে পারত। তা না করে ঘটে সরকারি বাহিনীর হাতে ঘটে হত্যাকাণ্ড। ১৬ জুলাই রংপুরে আবু সাঈদকে খুব কাছ থেকে গুলি করে হত্যা করে পুলিশ। এ ঘটনার ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে সারা দেশ বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে ওঠে। ছাত্রদের আন্দোলনে যোগ দেন সাধারণ জনতাও।
আন্দোলন চলে ৫ আগস্ট পর্যন্ত এ সময়কে ‘জুলাই ৩৬’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে ক্ষমতা ধরে রাখতে পুলিশ-বিজিবি-র্যাব দিয়ে ছাত্রজনতার ওপর গুলি চালিয়ে গেছে হাসিনা সরকার। জাতিসংঘের প্রতিবেদন মতে, জুলাই অভ্যুত্থানে ১ হাজার ৪০০ জনের বেশি মানুষ শহীদ হয়েছেন। বিভিন্ন সংগঠনের মতে শহীদের সংখ্যা ২ হাজারের বেশি। এত রক্তের বিনিময়ে ৫ আগস্ট সফল হয় ছাত্র-জনতা। প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে হেলিকপ্টারযোগে দেশ ছেড়ে ভারতে পালান শেখ হাসিনা। তার পালানোর খবরে গা-ঢাকা দেন আওয়ামী লীগের মন্ত্রী-এমপিসহ বহু নেতারা। হাসিনা সরকারের পতন ঘটার পর ৮ আগস্ট নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে প্রধান উপদেষ্টা করে গঠিত হয় অন্তর্বর্তী সরকার।
২০২৪ সালের ঐতিহাসিক জুলাই গণঅভ্যুত্থান ছিল দীর্ঘদিনের অন্যায়, দুর্নীতি, গুম ও ভোটাধিকার হরণের বিরুদ্ধে এক বিস্ফোরণ। কোটা সংস্কারের দাবি থেকে শুরু হওয়া আন্দোলন দ্রুত এক দফার সরকার পতনের আন্দোলনে রূপ নেয়। ছাত্র ও সাধারণ মানুষ বুলেটের সামনে বুক পেতে দিয়ে প্রমাণ করেছে যে দেশের মালিক জনগণ। এই দিনটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় তরুণ সমাজের অদম্য সাহস ও ঐক্যের শক্তি। শহীদদের আত্মত্যাগ এ আন্দোলনে শত শত শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ শহীদ হয়েছেন এবং হাজারো মানুষ পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন। তাদের এ রক্তিম ত্যাগের বিনিময়ে দেশ দ্বিতীয়বারের মতো স্বাধীনতা অর্জনের স্বাদ পেয়েছে। তাদের স্মৃতি রক্ষা করা এবং তাদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানো আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান শুধু একটি রাজনৈতিক পরিবর্তন নয়; এটি এক নতুন মানসিকতার উন্মেষ। তরুণদের এ বিজয়কে ধরে রেখে আমাদের ঐক্যবদ্ধভাবে দেশ গঠনে কাজ করতে হবে- যাতে আর কখনো কোনো স্বৈরাচার মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে। বিগত দুই বছরে প্রাপ্তির খাতার চেয়ে না পাওয়ার বেদনা ও হতাশা হয়তো কম নয়, জমেছে অনেক যৌক্তিক প্রশ্নও। তবু সব বাধা ডিঙিয়ে দেশ এগিয়ে যাক এক নতুন বন্দোবস্তের দিকে। অবসান ঘটুক সব ধরনের আধিপত্যবাদের। গণঅভ্যুত্থানের মূল চেতনায় জেগে উঠুক আমাদের কাঙ্ক্ষিত গণতন্ত্র।