ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা ও ইস্পাতকঠিন জাতীয় ঐক্য বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
শনিবার দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবন মিলনায়তনে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে "ফ্যাসিস্ট সরকার পতনে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের ভূমিকা" শীর্ষক এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ আহ্বান জানান। ঢাবি সাদা দল এবং ইউনিভার্সিটি টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ইউট্যাব)-এর যৌথ উদ্যোগে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়।
ঢাবি সাদা দলের আহ্বায়ক ও ইউট্যাবের মহাসচিব অধ্যাপক ড. মো. মোর্শেদ হাসান খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘ ১৭ বছরের ধারাবাহিক গণতান্ত্রিক সংগ্রাম এবং শত-সহস্র শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এই বিজয় কোনো একক গোষ্ঠীর চেতনা বিক্রির হাতিয়ার হতে পারে না। ফ্যাসিবাদের পুনরুত্থান রোধে কোনো ধরনের উসকানিমূলক ফাঁদে পা না দিয়ে গণতান্ত্রিক চর্চা ও সহনশীলতার মাধ্যমে রাষ্ট্রকাঠামোর প্রয়োজনীয় গণতান্ত্রিক সংস্কার সম্পন্ন করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, ২০২৪ সালের ৮ই আগস্ট সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদের অধীনে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ছিল দেশের গণতন্ত্রকামী জনগণের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশার ফসল। দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্যাতন, গুম-খুন ও ভোটাধিকার হরণের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমেই শেখ হাসিনার পতন ঘটেছিল। তিনি মন্তব্য করেন, চেতনা বিক্রির রাজনীতি দিয়ে বাংলাদেশের মানুষকে আর বিভ্রান্ত করা যাবে না।
রাষ্ট্রকাঠামোর সংস্কার ও সংবিধান সংশোধনের ভবিষ্যৎ রূপরেখা তুলে ধরে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ভবিষ্যতে যেন কোনো নির্বাচিত সরকার স্বৈরাচারী হয়ে উঠতে না পারে, সেজন্য সংবিধানে প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সর্বোচ্চ দুই মেয়াদে সীমাবদ্ধ করার বিধান যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি জাতীয় সংসদে ভারসাম্য (চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স) নিশ্চিত করতে দ্বি-কক্ষবিশিষ্ট সংসদ গঠনের বিষয়ে কাজ চলছে। তিনি বলেন, জনগণের প্রত্যাশা ও সময়ের চাহিদার নিরিখে গণতান্ত্রিক উপায়েই সংবিধান সংশোধনের কাজ সম্পন্ন করা হবে।
শিক্ষার্থী ও তরুণদের উদ্দেশ্যে মন্ত্রী বলেন, রাজনৈতিক অপরিপক্কতার পরিচয় দিয়ে উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। বুয়েটসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের বিভ্রান্ত করার নানা অপচেষ্টা চলছে উল্লেখ করে তিনি সবাইকে ধৈর্য ও সহনশীলতা বজায় রেখে প্রজ্ঞা ও গণতান্ত্রিক উপায়ে মতামত প্রকাশের আহ্বান জানান।
দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বিষয়ে ভারতের প্রতি স্পষ্ট বার্তা দিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক হতে হবে পারস্পরিক মর্যাদা, সম্মান ও সার্বভৌম সমতার ভিত্তিতে। একদিকে ভারতের মাটিতে আশ্রয় দিয়ে শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশবিরোধী রাজনৈতিক অপতৎপরতা চালানোর সুযোগ দেওয়া হবে, আর অন্যদিকে বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার আশা করা হবে—এ দুটি অবস্থান পরস্পরবিরোধী। ভারত সরকার বিষয়টি অনুধাবন করে এ ধরনের অবস্থান থেকে সরে আসবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
আলোচনা সভায় জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ পরিবারের সদস্যদের পক্ষে অনুভূতি ব্যক্ত করেন শহীদ মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধের ভাই মীর মাহবুবুর রহমান স্নিগ্ধ, শহীদ ওয়াসিম আকরামের বাবা শফিউল আলম, শহীদ আবু সাঈদের ভাই মো. আবু হোসেন এবং শহীদ একরামুল হক সাজিদের মা নাজমা খাতুন লিপি।
অনুষ্ঠানে শহীদদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে তাঁদের পরিবারের সদস্যদের হাতে বিশেষ সম্মাননা স্মারক তুলে দেওয়া হয়। পরে মন্ত্রী জুলাই গণঅভ্যুত্থান উপলক্ষে আয়োজিত বিশেষ আলোকচিত্র প্রদর্শনী পরিদর্শন করেন।