,

জামায়াত এমপি শাহজাহান চৌধুরীর পিএসসহ ৬ জনের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি মামলা

জামায়াত এমপি শাহজাহান চৌধুরীর পিএসসহ ৬ জনের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি মামলা
জামায়াত এমপি শাহজাহান চৌধুরীর পিএসসহ ৬ জনের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি মামলা

চট্টগ্রাম-১৫ আসনের জামাতে ইসলামীর সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরীর ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) মো. আরমান উদ্দিনের বিরুদ্ধে এবার ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি, দোকানের মালামাল ও নগদ টাকা নিয়ে যাওয়া, মারধর এবং প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগে আদালতে মামলা হয়েছে।রবিবার (২৩ আগস্ট) চট্টগ্রামের চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে লোহাগাড়ার পশ্চিম কলাউজানের বাসিন্দা ও প্রবাসী আমির হোসেন (৫৭) মামলাটি করেন। মামলায় আরমান উদ্দিনসহ ছয়জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। অজ্ঞাতনামা আরও চার থেকে পাঁচজনকেও আসামি করা হয়েছে।
মামলার এজাহারে বলা হয়, আমির হোসেন লোহাগাড়ার আজিজ কমপ্লেক্স এলাকায় চারতলা ভবন নির্মাণ করে নিচতলায় দোকান এবং অন্যান্য অংশে ভাড়াটিয়া রেখেছেন। দীর্ঘদিন প্রবাসে থাকার পর দেশে ফেরার পর কিছুদিন ধরে আরমান উদ্দিনের নেতৃত্বে আসামিরা তাঁর কাছে ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে আসছিলেন।

বাদীর অভিযোগ, আসামিরা তাকে বলেন, এলাকায় বসবাস করতে হলে ২০ লাখ টাকা চাঁদা দিতে হবে। টাকা না দিলে তার মার্কেট ও ভবন দখল করে নেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয়।মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, গত ৩ এপ্রিল রাত ২টার দিকে আসামিরা আমির হোসেনের মার্কেটের নিচতলায় ভাড়াটিয়া ওবায়দুলের দোকানের তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন। সেখান থেকে বিভিন্ন ধরনের স্টিলের আলমারি, ওয়াল শোকেস, আলমারির সিটসহ বিভিন্ন মালামাল নিয়ে যাওয়া হয়।

মামলায় এসব মালামালের আনুমানিক মূল্য ১১ লাখ ৫৮ হাজার ৬৫৯ টাকা উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া দোকানের ক্যাশ টেবিলসহ ভেতরে থাকা নগদ ১ লাখ ২০ হাজার টাকা নিয়ে যাওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে।

অভিযোগে আরও বলা হয়, পরে দোকানের ভাঙা অংশে নতুন তালা লাগিয়ে দেওয়া হয়। ভবনের অন্য ভাড়াটিয়াদেরও আসামিদের মাধ্যমে বাসা ভাড়া দেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হয়।

মামলায় বলা হয়েছে, গত ২০ আগস্ট সকাল ৯টার দিকে আসামিরা বাদীর মার্কেটে বৈঠক করেন। এ সময় আরিফ উদ্দীন বলেন, ২০ লাখ টাকা চাঁদা না দিলে তারা বাদীর দোকান ও ঘরের দখল ছাড়বেন না।আরমান উদ্দিন মোবাইল ফোনে আমির হোসেনকে তাদের কথামতো চলার জন্য চাপ দেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।

একপর্যায়ে আরেক আসামি চাঁদা না দিলে আমির হোসেনকে হত্যা করে লাশ গুম করার হুমকি দেন বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়। পরে আসামিরা তাকে কিল, ঘুষি ও লাথি মেরে শরীরের বিভিন্ন স্থানে জখম করেন বলে অভিযোগ করেছেন বাদী।
আমির হোসেনের দাবি, তিনি লোহাগাড়া থানায় অভিযোগ করলেও মামলা নেওয়া হয়নি। পরে তিনি আদালতের শরণাপন্ন হন।

মামলায় আরমান উদ্দিন ছাড়াও মো. আরিফ উদ্দীন (৩৭), শওকত আলী (৪২), মো. আদিল (৩২), মো. আনোয়ার (২৮) ও জয়নাল আবেদীন (৩৩)কে আসামি করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ১৪৩, ৩২৩, ৩৮৪, ৩৮৫, ৩৮০ ও ৫০৬(২) ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।

এটি আরমান উদ্দিনকে ঘিরে ওঠা প্রথম অভিযোগ নয়। এর আগে ব্যবসায়ীকে তুলে নিয়ে নির্যাতন করে টাকা আদায়, বালু উত্তোলন নিয়ে বিতর্ক, স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতার নামে খাল খননের ডিও লেটার এবং প্রশাসন-পুলিশের সঙ্গে আর্থিক সমঝোতার কথোপকথন ফাঁসসহ নানা ঘটনায় তার নাম আলোচনায় এসেছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর লোহাগাড়ার ব্যবসায়ী খোরশেদ আলমকে তুলে নিয়ে নির্যাতন করে টাকা আদায়ের অভিযোগও ওঠে আরমানের বিরুদ্ধে। খোরশেদের অভিযোগ ছিল, তার কাছে ১৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। পরে মামলা থেকে রেহাই ও লুট হওয়া মালামাল উদ্ধারের কথা বলে ৮ লাখ টাকায় সমঝোতা হয়। টাকা ও চেক দেওয়ার পরও তাকে তুলে নিয়ে মারধর করে আরও ১০ লাখ টাকা দাবি করা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।

খোরশেদের আরও অভিযোগ ছিল, তাকে মারধর করে চট্টগ্রাম নগরের একটি ভবনে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে আরমান উদ্দিনের সঙ্গে তার দেখা হয় এবং আরও টাকা দেওয়ার জন্য চাপ ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আরমান উদ্দিন দাবি করেছিলেন, তার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ করা হচ্ছে।

আরমান উদ্দিনের সঙ্গে জামায়াত থেকে বহিষ্কৃত আকাশ চৌধুরীর ব্যবসায়িক যোগাযোগের অভিযোগও আগে আলোচনায় আসে।গত জানুয়ারিতে সাতকানিয়া পৌরসভার জামায়াত-সমর্থক আবদুল মোমেন ও আকাশ চৌধুরীর একটি ফোনালাপ ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে ইটভাটার মাটির ব্যবসা নিয়ে কথোপকথনের একপর্যায়ে পিএস আরমানও এই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন বলে দাবি করা হয়।
ফোনালাপটি প্রকাশের পর আরমান উদ্দিনের সঙ্গে আকাশ চৌধুরীর ব্যবসায়িক সম্পৃক্ততা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে আরমান উদ্দিনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।লোহাগাড়ার টংকাবতী খাল খননের অনুমতি চাওয়ার ঘটনাতেও আরমান উদ্দিনের নাম আলোচনায় আসে।

সরকারি নথি অনুযায়ী, স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা শাহাদাত হোসেন নিজের অর্থায়নে টংকাবতী খাল খননের অনুমতি চেয়ে সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরীর কাছে আবেদন করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৩ মে জেলা প্রশাসকের কাছে খাল খননের অনুমতি চেয়ে ডিও লেটার দেন সংসদ সদস্য।

তবে স্থানীয়দের অভিযোগ ছিল, খাল খননের আড়ালে বালু উত্তোলনের ব্যবসা চলছিল। শাহাদাত হোসেনের সঙ্গে আরমান উদ্দিনের ব্যবসায়িক সম্পৃক্ততার অভিযোগও ওঠে।অভিযোগের বিষয়ে শাহজাহান চৌধুরী বলেছিলেন, তার নাম ব্যবহার করে ইজারা বা অনিয়মের অনুমোদনের প্রশ্নই আসে না এবং অনিয়মে জড়িত কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।চলতি বছরের ১৯ জুন রাতে আরমান উদ্দিন ও লোহাগাড়ার পুটিবিলা এলাকার বিএনপি কর্মী তারিকুল হকের একটি ফোনালাপ ফাঁস হয়। ওই অডিওতে সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরীর লোহাগাড়ায় যাওয়া নিয়ে হুমকিমূলক কথোপকথন শোনা যায় বলে অভিযোগ ওঠে।

ফোনালাপে তারিকুল হককে বলতে শোনা যায়, ‘লোহাগাড়ায় এমপি কেন আসবে? আসলে পায়ে গুলি করে জিজ্ঞেস করব, কেন এসেছে। এখানে আরমান সাহেবের কথাই চলবে। লোহাগাড়ার এমপি আরমান সাহেব।’জবাবে আরমান উদ্দিনকে বলতে শোনা যায়, ‘এমপিকে তো বারবার করে নিষেধ করেছি লোহাগাড়ায় না যেতে।’অডিওর আরেক অংশে সার্কেল, থানা ও ইউএনওকে কেন্দ্র করে প্রশাসন ও পুলিশের সঙ্গে অর্থ লেনদেন ও আর্থিক সমঝোতার আলোচনা শোনা যায় বলেও অভিযোগ ওঠে।