
দেশের ইতিহাসে এবার শিক্ষাক্ষেত্রে সর্বোচ্চ বাজেট দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থম ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন ও গবেষণাকে অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের বাজেটে বড় বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এই বরাদ্দ কাজে লাগিয়ে শিক্ষার্থীদের আধুনিক, দক্ষ ও যোগ্য মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) দুপুরে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) ২৪তম বিশ্ববিদ্যালয় দিবসের অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
আমির খসরু বলেন, ‘গভমেন্ট আমাদের এই বাজেটে- আপনারা খেয়াল করেছেন- হাইয়েস্ট অ্যালোকেশন দিয়েছে ফর এডুকেশন। হাইয়েস্ট এভার! বাংলাদেশের ইতিহাসে এভার হাইয়েস্ট অ্যালোকেশন এই বাজেটে এডুকেশনে। এবং এই বাজেটে এডুকেশন ও স্কিল ডেভেলপমেন্ট, রিসার্চের পেছনে একটা বড় অংশ রাখা হয়েছে।’
তিনি বলেন, শিক্ষা ও গবেষণায় বরাদ্দ দেওয়া অর্থ যথাযথভাবে কাজে লাগাতে হবে। গবেষণার ক্ষেত্রে কোথায় সমস্যা রয়েছে, পর্যাপ্ত সুবিধা নেই কেন এবং কোথায় সক্ষমতার ঘাটতি রয়েছে- এসব চিহ্নিত করে সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘সো, ইউ শুড মেক ইউজ অব দিস। এই টাকাটা তো খরচ করতে হবে। আপনাদের রিসার্চের কোথায় সমস্যা আছে দেখতে হবে। আমি ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে কথা বলতেছিলাম, ওরা বলছে রিসার্চ ইন্টারেস্ট আছে, বাট এনাফ ফ্যাসিলিটি নাই। কোথায় সমস্যাগুলো আছে বের করতে হবে। ফ্যাকাল্টির সমস্যা থাকলে দেখতে হবে কোথায় শর্টেজ আছে।’
চুয়েটে ৯৫ জন পিএইচডি ডিগ্রিধারী শিক্ষক থাকার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, তাদের অর্জিত জ্ঞান ও দক্ষতা গবেষণায় কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি করতে হবে।
‘আমি তো শুনলাম আপনাদের ৯৫ জন পিএইচডি হোল্ডার আছেন। ৯৫ জন পিএইচডি তো অনেক, কম নয়! কিন্তু উনি যদি পিএইচডি করে আসেন, উনার সেই যোগ্যতা, সেই শিক্ষাটাকে উনি অ্যাপ্লাই করতে হবে। ইফ ইউ ডোন্ট অ্যাপ্লাই, পিএইচডি করে তো লাভ নেই। অ্যাপ্লাই করার সুযোগ থাকতে হবে,’ বলেন তিনি।
চুয়েটকে বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত করতে বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে নিয়মিত বেঞ্চমার্ক করার আহ্বান জানান আমির খসরু। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা, গবেষণা, উদ্ভাবন ও শিক্ষা কার্যক্রম- সব ক্ষেত্রেই বৈশ্বিক মানদণ্ড অনুসরণ করতে হবে।
তিনি বলেন, ‘কন্টিনিউয়াস এই ইউনিভার্সিটির ম্যানেজমেন্টকে বেঞ্চমার্ক করতে হবে গ্লোবাল বেস্ট ইউনিভার্সিটির সাথে।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার মান যাচাইয়ে পিয়ার রিভিউয়ের ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। আমির খসরুর মতে, অন্যদের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা ও কার্যক্রম মূল্যায়ন করা হলে কোথায় ঘাটতি রয়েছে তা সহজে চিহ্নিত করা সম্ভব হবে।
তিনি বলেন, ‘আপনাদের কাজগুলো পিয়ার রিভিউ (Peer Review) করাতে হবে। ইউ মাস্ট রিভিউ। আপনি কাজ করছেন, আপনি ভাবছেন আমার কাজটা ভালো হয়েছে- হয়ে শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু অন্যরা আপনাকে জাজ করতে হবে।’
গবেষণা ও উদ্ভাবনকে বৈশ্বিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র্যাংকিংয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভালো গবেষণা সুবিধা, দক্ষ গবেষক ও সঠিক গবেষণা ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে।
চুয়েটের আইটি ইনকিউবেটরের প্রসঙ্গ তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, অবকাঠামোগত বিনিয়োগের সুফল নিশ্চিত করতে হবে। শুধু ভবন নির্মাণ করলেই হবে না; সেখান থেকে শিক্ষার্থী, গবেষক ও দেশকে কীভাবে উপকার দেওয়া যায়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, ‘একটা ইনভেস্টমেন্ট হয়েছে ইনফ্রাস্ট্রাকচার বা অবকাঠামোগত উন্নয়ন। বাট এটার থেকে কি আমরা কোনো রেজাল্ট পাচ্ছি কিনা?’
সরকারি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ভ্যালু ফর মানি, বিনিয়োগের আউটপুট, মানুষের উপকার এবং প্রকল্পের স্থায়িত্ব- এই চারটি বিষয় বিবেচনা করার কথা জানান তিনি।
আমির খসরু বলেন, ‘এটা বাংলাদেশের মানুষের, ট্যাক্সপেয়ারের টাকা, আমার টাকা, এদেশের সাধারণ মানুষের টাকা। প্রত্যেকটি টাকা যখন আমরা সরকারে খরচ করব, আমাকে এই ক্রাইটেরিয়া মিট করতে হবে।’
শিক্ষা ও গবেষণার পাশাপাশি দক্ষতা উন্নয়নেও গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, বর্তমান বিশ্বের প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত করতে হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), রোবটিক্স ও তথ্যপ্রযুক্তির যুগে চুয়েটের মতো প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
উদ্ভাবনের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমাদের নিজেরা নিজেদের ইনোভেশন করতে হবে। খালি বাইরে থেকে ইনোভেশন আসবে আর আমরা এটাকে ফলো করব, সেটা হতে পারে না। আমাদের ছেলে-মেয়েদের তো মেধা আছে।’
শুধু অবকাঠামো নির্মাণের পরিবর্তে শিক্ষা ও গবেষণার মানোন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানিয়ে আমির খসরু বলেন, ‘বাংলাদেশে আমাদের একটি বিল্ডিং দরকার, খালি বিল্ডিং আর বিল্ডিং! বাংলাদেশের মানুষের ট্যাক্সপেয়ারের টাকা বিল্ডিংয়ে ঢুকে গেছে, অর্ধেক বিল্ডিংয়ের কোনো আউটপুট নেই! সো, হার্ডওয়্যারের সাথে সাথে সফটওয়্যার যে বিষয়গুলো আছে, একসাথে অ্যাড্রেস করতে হবে। শুধু বিল্ডিং করে এখানে কোনো লাভ হবে না।’
শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা সহযোগিতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। চট্টগ্রামকে ভবিষ্যতে আঞ্চলিক লজিস্টিক হাব হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে চুয়েটের প্রকৌশল ও গবেষণা সক্ষমতা কাজে লাগানোর আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, ‘চট্টগ্রাম ইনশাল্লাহ রিজিওনাল লজিস্টিক হাব হতে যাচ্ছে। বাংলাদেশে অনেকগুলো পোর্ট হবে, ফ্রি জোন হবে। এখানে হোল বেল্ট আমরা লজিস্টিক হাব হিসেবে ডেভেলপ করার চেষ্টা করছি।’
বেসরকারি খাত ও এনজিওগুলোর সঙ্গে অংশীদারত্ব বাড়ানোর আহ্বান জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়কে নিজেদের সক্ষমতা তৈরি করে নির্দিষ্ট প্রস্তাব নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। এতে সরকার ও বেসরকারি খাতের সঙ্গে কার্যকর অংশীদারত্ব তৈরি করা সম্ভব হবে।
চুয়েটের প্রাকৃতিক পরিবেশের প্রশংসা করে আমির খসরু বলেন, গবেষণা ও লেখাপড়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ অত্যন্ত উপযোগী। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে চুয়েটকে আরও এগিয়ে যেতে হবে।
নতুন প্রজন্মের মেধাবী শিক্ষার্থীদের দেশ গঠনে কাজে লাগানোর আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের ব্রাইট ছেলে-মেয়েরা আছে, পড়াশোনা করছে, কষ্ট করছে। তারা সরকারের কাজ করতে চাইবে, প্রাইভেট সেক্টরে কাজ করতে চাইবে। নতুন জেনারেশন ড্রাইভ করতে চায়, কন্ট্রিবিউট করতে চায়। আমাদের ফ্যাসিলেটেটর হতে হবে।’
বক্তব্যের শেষে চুয়েটের প্রতি নিজের ভালোবাসা প্রকাশ করে আমির খসরু বলেন, ‘আমার পক্ষ থেকে, চট্টগ্রামবাসী হিসেবে নয়, বাংলাদেশের একজন নাগরিক হিসেবে-আই লাভ চুয়েট। থ্যাঙ্ক ইউ ভেরি মাচ।’








