
একদিকে শত শত কৃতি শিক্ষার্থীর চোখে আগামীর রঙিন স্বপ্ন, অন্যদিকে প্রবীণ শিক্ষাবিদ ও সমাজসেবীদের অভিজ্ঞতার দীপ্তি—সব মিলিয়ে চট্টগ্রামে সম্পন্ন হলো এক অনন্য ও দৃষ্টিপ্রতিম ছাত্র সংবর্ধনা। গতকাল বিকেল ৩টায় এক ব্যতিক্রমী, সুসজ্জিত ও নান্দনিক পরিবেশে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় চারশত -এরও বেশি গোল্ডেন এ-প্লাস
প্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের এই সম্মাননা জানানো হয়। বর্ণাঢ্য এই আয়োজনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও সমাজচিন্তক সাঈদ আল নোমান এক নতুন, সাম্যভিত্তিক ও জবাবদিহিমূলক বাংলাদেশ বিনির্মাণে তরুণদের মেধা ও নৈতিকতাকে কাজে লাগানোর জোরালো আহ্বান জানান।
পুরো অনুষ্ঠানটি অত্যন্ত প্রাঞ্জল ও আকর্ষণীয় ভঙ্গিতে সঞ্চালনা করেন আহমাদুর রহমান। কৃতি শিক্ষার্থীদের এই অসামান্য অর্জনের পেছনে বাবা-মা ও শিক্ষকদের বছরের পর বছর ধরে করা ত্যাগ ও অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা স্মরণ করে সাঈদ আল নোমান তাঁর বক্তব্যের শুরুতেই তাঁদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন।
দেশের চলমান রাজনৈতিক সংস্কার ও ভবিষ্যৎ পথরেখা নিয়ে সাঈদ আল নোমান বলেন, "আমাদের রাজনীতিতে পূর্ণ জবাবদিহিতার সংস্কৃতি চালু করা এখন সময়ের দাবি। নেতৃত্ব কোনো রাজকীয় পদ বা ক্ষমতার প্রতীক নয়, নেতৃত্ব হলো জনগণের সেবক মাত্র। যদি প্রতিটি স্তরে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা না যায়, তবে এই সমাজে কখনো প্রকৃত সাম্য, ন্যায়বিচার ও জুলাই বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে না।" রাজনৈতিক সচেতনতার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি উপস্থিত ছাত্র-জনতার উদ্দেশ্যে বলেন, "আমি আপনাদের কাছে কখনো এসে দোয়া চেয়ে ভোট চাইনি, আজকেও ভোট দিতে বলছি না। কিন্তু আপনাদের রাজনীতি সচেতন হতে হবে। দেশের প্রয়োজনে, রাষ্ট্রের প্রয়োজনে তরুণদের সচেতন নাগরিকের ভূমিকা পালন করতেই হবে।
নারীদের ক্ষমতায়ন ও দেশের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব প্রসঙ্গে জিয়া পরিবারের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, "পৃথিবীতে অনেকেই নিজের চারপাশে একটি গণ্ডি বা সীমাবদ্ধতা তৈরি করে দল গঠন করে, কিন্তু শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ছিলেন ব্যতিক্রমী দূরদর্শী—যিনি দল ও দেশের এক মজবুত ভিত্তি গড়ে দিয়েছিলেন। আজ জিয়া পরিবারের প্রতিটি সদস্য দেশ ও মানুষের কল্যাণে নিবেদিত। আগামী দিনে শহীদ জিয়া ও দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার সুযোগ্য উত্তরসূরি, তারেক রহমান ও ডা. জোবাইদা রহমানের কন্যা ব্যারিস্টার জায়মা রহমানের মতো তরুণ নারীরাই সমাজ ও রাষ্ট্রের আমূল ইতিবাচক পরিবর্তন এনে দিতে পারবে।"
আধুনিক বিশ্বের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রযুক্তির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে কৃতি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, "বর্তমান যুগে টেকনোলজি বা প্রযুক্তিকে কোনোভাবেই ইগনোর বা পরিহার করে সামনে এগিয়ে যাওয়া যাবে না। প্রযুক্তিকে বর্জন করা যেমন অসম্ভব, তেমনই একে শতভাগ ইতিবাচকভাবে নিজের আয়ত্তে আনতে হবে। মনে রাখতে হবে, মেধা ও জ্ঞানের কোনো বিকল্প নেই, পড়াশোনার কোনো বিকল্প নেই। নিজেকে কখনো নিজেই কোনো গণ্ডির মধ্যে আটকে রেখে প্রতিবন্ধী করে রাখা যাবে না।" তিনি তরুণদের উজ্জীবিত করে বলেন, "বিগত ১৭-১৮ বছর ধরে স্বৈরাচারী শাসনে দেশে যে স্থবিরতা ছিল, তরুণদের মেধার যে অবমূল্যায়ন হয়েছে, তা ভেঙে সাড়ে ৪ বছর পর জাতীয় গঠনে তোমাদের কাজ করতে হবে। অতীতে যা হয়নি, মেধা ও সততা দিয়ে তরুণ প্রজন্ম হিসেবে তোমরাই তা করে দেখাবে। আমরা এমন এক মানবিক রাষ্ট্র গঠন করতে চাই, যেখানে স্বাস্থ্য সেবা হবে সর্বজনীন—গরিব-দুঃখী কোনো মানুষই যেন আর বিনা চিকিৎসায় মারা না যায়।"
অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে বিএনপি কেন্দ্রীয় কমিটির শ্রম বিষয়ক সম্পাদক ও চট্টগ্রাম বিভাগীয় শ্রমিক দলের সভাপতি এ এম নাজিমুদ্দিন বলেন, "স্বাধীনতার ঘোষক ও সফল রাষ্ট্রনায়ক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের দূরদর্শী অবদানের ওপর দাঁড়িয়েই আজকের আধুনিক বাংলাদেশের ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল। ১৮ বছরের অন্ধকার শাসন পেরিয়ে আজ যে নতুন বাংলাদেশের সূচনা হয়েছে, তার হাল এই তরুণদেরই ধরতে হবে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপাচার্যবৃন্দ, তাঁদের প্রতিনিধি দল ও বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত থেকে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রাখেন প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক এস. এম. নছরুল কদির, ইস্ট ডেল্টা ইউনিভার্সিটির উপাচার্য প্রফেসর ড. মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন, চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও এনিম্যাল সাইন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. মোহাম্মদ লুৎফুর রহমান, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও ট্রেজারার, ইস্ট ডেল্টা ইউনিভার্সিটি প্রফেসর ড. ছিদ্দিক আহমদ চৌধুরী, বিশিষ্ট রাজনীতিবীদ কামরুল হাসান, এসকে খোদা তোত, জমির উদ্দিনসহ শীর্ষ নেতা কর্মীরা।
বক্তব্য পর্বের পর অনুষ্ঠানটি এক আবেগঘন মুহূর্তে রূপ নেয়, যখন অতিথিবৃন্দ ও কৃতি শিক্ষার্থীদের যৌথ অংশগ্রহণে শান্তির প্রতীক পায়রা ও রঙিন বেলুন উড়িয়ে এবং কেক কেটে উৎসবের মূল আনন্দ উদযাপন করা হয়। সবশেষে উপস্থিত সকলের স্বতস্ফূর্ত অংশগ্রহণে একটি আকর্ষণীয় গ্রুপ ফটো সেশন এবং নাটাই পরিবেশনায় এক মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে বর্ণাঢ্য ও স্মরণীয় এই আয়োজনের সফল সমাপ্তি ঘটে।