
চট্টগ্রাম ওয়াসার ইতিহাসে পরপর গত দুই মাসে রাজস্ব আদায় ও পানি উৎপাদনে নতুন রেকর্ড গড়েছে। সতের বছরের রেকর্ড ভাঙ্গলো রাজস্ব আদায়ের।বিগত আওয়ামী সরকারের সময় যে খানে লেগেই থাকতো পানির সমস্যা রাজস্ব ঘাটতি সে খানে প্রতি মাসে বাড়ছে উৎপাদন বকেয়া আদায়।ওয়াসার মাসিক রাজস্ব আদায় গড়ে ১৮–১৯ থেকে সর্বোচ্চ ২০ কোটি টাকা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্ত গত জুলাই এবং আগস্ট পরপর দুই মাসে এই রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ প্রায় ২৭ কোটির ঘরে গিয়ে পৌঁছেছে। আগস্ট মাসে আগের পুরনো বকেয়া আদায়সহ পানির বিল আদায় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৬ কোটি ৫৩ লাখ টাকায়। এর আগের মাসে পুরনো বকেয়া আদায়সহ পানি বিক্রির মোট ২৬ কোটি ৮০ লাখ টাকা আদায় হয়েছে ।
একই সময়ে দৈনিক পানি উৎপাদনও বেড়ে গড়ে ৪৯ কোটি ৬০ লাখ লিটারে পৌঁছেছে, যা ওয়াসার ইতিহাসে সর্বোচ্চ বলে দাবি করেছে ওয়াসা কর্তৃপক্ষ। আগামী এক–দুই মাসে পানির উৎপাদন আরও বাড়বে বলে জানায় ওয়াসা কর্তৃপক্ষ। এর আগে দৈনিক পানি উৎপাদন ৪৬ থেকে ৪৮ কোটি লিটারের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল।ওয়াসার ইতিহাসে যেকোনো একক মাসের তুলনায় সর্বোচ্চ।
অন্যদিকে শুধু বকেয়া আদায় নয়, অবৈধ সংযোগের বিরুদ্ধেও কঠোর অবস্থান নিয়েছে সংস্থাটি। ওয়াসার অনুমতি ছাড়া নেওয়া সংযোগ শনাক্ত করে বিচ্ছিন্ন করার পাশাপাশি আইন অনুযায়ী জরিমানা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে জরিমানা পরিশোধ করে বৈধ গ্রাহক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। ওয়াসার কর্মকর্তাদের মতে, অবৈধ সংযোগের কারণে পানির অপচয় ও সিস্টেম লস বাড়ছে। অবৈধ সংযোগ বন্ধ করে বৈধতার আওতায় আনা গেলে একদিকে রাজস্ব বাড়বে, অন্যদিকে সিস্টেম লসও কমবে।
এ দিকে চট্টগ্রাম ওয়াসার ঘাড়ে বকেয়া রাজস্বের বোঝা এখনো ২৫৮ কোটি টাকার বেশি।বিগত সতের বছর যারা দায়িত্ব ছিল তারা এ টাকা আদায় এর চিন্তা না করে লুট পাট করেছে। ওয়াসা সরকারি দপ্তরগুলোর কাছেই পাওনা ৭১ কোটি ৫২ লাখ টাকা। আর সাধারণ গ্রাহকদের কাছে বকেয়া ১৮৭ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। বিশাল এই বকেয়া আদায়ে এবার মাঠে নেমেছে চট্টগ্রাম ওয়াসা। রাজস্ব ও প্রকৌশল বিভাগের সমন্বয়ে গঠন করা হয়েছে আটটি বিশেষ মনিটরিং টিম। প্রতিদিন নগরের বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে বকেয়াদার গ্রাহকদের বিল আদায়ের পাশাপাশি অবৈধ পানির সংযোগ ও লাইসেন্সবিহীন গভীর নলকূপের বিরুদ্ধেও অভিযান চালানো হচ্ছে।এলাকায় এলাকায় মাইকিং করা হচ্ছে বকেয়া পরিশোধ করতে।
ওয়াসা সূত্র জানায়, সংস্থাটির উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক (অর্থ)-এর তত্ত্বাবধানে নির্বাহী প্রকৌশলী, রাজস্ব কর্মকর্তা, রাজস্ব তত্ত্বাবধায়ক ও মিটার পরিদর্শকদের সমন্বয়ে গঠিত আটটি টিম কাজ করছে। ৫০ হাজার টাকার বেশি বকেয়া রয়েছে এমন গ্রাহকদের তালিকা ধরে বাড়ি বাড়ি গিয়ে বিল পরিশোধে তাগাদা দেওয়া হচ্ছে। আলোচনার মাধ্যমে বকেয়া আদায়ের চেষ্টা করা হলেও টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাৎক্ষণিকভাবে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।
অন্যদিকে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় লাইসেন্স ছাড়াই স্থাপন করা গভীর নলকূপের বিরুদ্ধেও অভিযান শুরু হয়েছে। অনুমতি ছাড়া স্থাপন করা গভীর নলকূপ চিহ্নিত করে বন্ধ করার পাশাপাশি সংশ্লিষ্টদের জরিমানা করা হচ্ছে। আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে লাইসেন্স নেওয়ার সুযোগও দেওয়া হচ্ছে। ওয়াসার দাবি, গভীর নলকূপগুলোকে লাইসেন্সের আওতায় আনা হলে সংস্থার রাজস্ব আদায় আরও বাড়বে।
চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী সেলিম মো. জানে আলম বলেন, বকেয়া রাজস্ব আদায়ে চট্টগ্রাম ওয়াসা বদ্ধপরিকর। ডিএমডি (অর্থ)-এর তদারকিতে আটটি মনিটরিং টিম জোরালোভাবে কাজ করছে। বকেয়াদার গ্রাহকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, এটি সরকারের রাজস্ব, তাই মওকুফ করার সুযোগ নেই। সবাইকে বকেয়া বিল পরিশোধ করে ওয়াসার সেবা উন্নয়নে সহযোগিতা করতে হবে।তিনি বলেন, অবৈধ সংযোগ এবং লাইসেন্সবিহীন গভীর নলকূপ স্থাপনকারীদের বিরুদ্ধেও কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছে। সবাইকে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে অবৈধ সংযোগ বৈধ করা এবং গভীর নলকূপের প্রয়োজনীয় লাইসেন্স নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
চট্টগ্রাম ওয়াসার এমডি বলেন, রাজস্ব আদায় আগের চেয়ে বাড়ানোর জন্য শুরু থেকে আমার প্রচেষ্ট ছিল। আশা করেছি অনেকটা সফল হয়েছি। গত দুই মাসে ওয়াসার এযাবৎকালের সর্বোচ্চ রাজস্ব আদায় হয়েছে। চলতি মাসে আগের ১২ কোটি বকেয়া আদায়সহ প্রায় ২৭ কোটি টাকার রাজস্ব আদায় হয়েছে। এটা আরও বাড়বে। প্রতিদিন রাজস্ব আদায় হচ্ছে; ব্যাংকে জমা হচ্ছে। এর আগের মাসে (জুলাই মাসে) সর্বোচ্চ ২৬ কোটি ৮০ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে। রাজস্ব আদায়ে এটা ওয়াসার ইতিহাসে রেকর্ড ব্রেক। দীর্ঘদিনের বকেয়া আদায়ের পাশাপাশি নিয়মিত পানির বিল আদায়ে উদ্যোগ নিয়েছি। সবাইকে নিয়ে মিটিং করেছি, রাজস্ব আদায় বাড়ানোর ব্যাপারে। সবার মধ্যে কাজের গতি এসেছে। এর ফলে রাজস্ব আদায় বাড়ছে।
তিনি বলেন, রাজস্ব বৃদ্ধির পাশাপাশি পানি উৎপাদনও সর্বোচ্চ পর্যায়ে নেওয়া হয়েছে। এখন প্রতিদিন গড়ে ৪৯ কোটি ৬০ লাখ লিটার পানি উৎপাদন হচ্ছে। পানি উৎপাদন আরও বাড়বে। এখন নগরীতে আগের মতো কোথাও পানি সংকট নেই। দীর্ঘদিনের পানি বঞ্চিত পতেঙ্গা এলাকায় পানি সরবরাহের কাজ শুরু হচ্ছে। এই মাসের শেষের দিকে কাজ শুরু হবে। নগরীর যে সব উচু এলাকায় ওয়াসার নিয়মিত পানি যাচ্ছে না সেসব এলাকায় পানি সরবরাহের জন্য গভীর নলকূপ স্থাপন করে পানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার জন্য কাজ চলছে।
ওয়াসা কর্মকর্তারা বলছেন, দীর্ঘদিনের বকেয়া আদায়ে এবার কোনো গ্রাহককে ছাড় দেওয়া হবে না। বিশেষ করে বড় অঙ্কের বকেয়াদারদের বিরুদ্ধে পর্যায়ক্রমে সংযোগ বিচ্ছিন্নসহ বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে অবৈধ সংযোগ ও অনুমোদনহীন গভীর নলকূপের কারণে সংস্থার রাজস্ব ক্ষতির বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।
কর্মকর্তারা বলেন,আগে নিয়মিত রাজস্ব আদায় হতো গড়ে ১৮–১৯ কোটি থেকে সর্বোচ্চ ২০ কোটি টাকা পর্যন্ত। কিন্তু বর্তমান ম্যানেজম্যান্টের বিশেষ তদারকি; বিশেষ করে মনিটরিং টিম গঠন, বকেয়া বিল আদায়ে কড়াকড়ি এবং গ্রাহকদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির কারণে এ রেকর্ড সংখ্যক রাজস্ব আদায় সম্ভব হয়েছে।