রাজধানী সহ সারা দেশে বাজারে স্বস্তি নেই কোনো দিকেই। কয়েক দিনের বৃষ্টিতে সবজির সরবরাহ কমে দাম বেড়েছে, মাছের বাজারেও চলছে অস্থিরতা। এর সঙ্গে ডিম ও মুরগির বাড়তি দাম যোগ হয়ে সাধারণ মানুষের খাবারের খরচ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
আয় না বাড়লেও নিত্যপণ্যের এই বহুমুখী মূল্যচাপে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে নিম্নবিত্ত ও সীমিত আয়ের পরিবার। একসঙ্গে কয়েকটি খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ায় সংসারের বাজেট সামলাতে গিয়ে অনেককেই খাবারের তালিকা ছোট করতে হচ্ছে।
শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা যায়, সবজির মধ্যে সবচেয়ে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে গোল বেগুন ও গাজর—প্রতি কেজি ১৪০ টাকা। কাঁচামরিচ ১৬০ টাকা, বরবটি ১২০, লম্বা বেগুন ১০০ এবং পটল, ঝিঙা, ধন্দুল ও চিচিঙ্গা ৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। তুলনামূলক কম দামে পাওয়া যাচ্ছে পেঁপে, প্রতি কেজি ৩০ টাকা।
বৃষ্টির ধাক্কায় সবজির বাজার
ব্যবসায়ীরা বলছেন, কয়েক দিনের বৃষ্টিতে ক্ষেত থেকে সবজি সংগ্রহ, পরিবহন ও বাজারে সরবরাহে ব্যাঘাত ঘটেছে। ফলে সরবরাহ কমে যাওয়ায় বেড়েছে পাইকারি ও খুচরা দাম।
তবে শুধু বৃষ্টিই সবজির দাম বৃদ্ধির কারণ নয়। উৎপাদন এলাকা থেকে রাজধানীর বাজার পর্যন্ত পরিবহন ব্যয়, মধ্যস্বত্বভোগী এবং বাজারভেদে দামের পার্থক্যও খুচরা দামে প্রভাব ফেলে। উৎপাদন পর্যায়ে সামান্য ঘাটতিও তাই ভোক্তা পর্যায়ে তুলনামূলক বড় মূল্যবৃদ্ধিতে রূপ নিতে পারে।
মাছেও নেই স্থায়ী স্বস্তি
সবজির পাশাপাশি মাছের বাজারেও কমার চেয়ে বাড়ার প্রবণতাই বেশি। পাঙাশ প্রতি কেজি ২৩০ টাকা, তেলাপিয়া ২৬০, পাবদা ৩৫০ থেকে ৪৫০, বড় রুই ৪৫০ থেকে ৫০০ এবং ভেটকি ৪০০ থেকে ৫৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। চিংড়ি ৮০০ থেকে ৯০০, ট্যাংরা ৭০০, বাইম ৬০০ থেকে ৮০০ এবং দেশি কই ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা কেজি।
ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, কোনো কোনো মাছের দাম একদিন ২০ থেকে ৩০ টাকা কমলেও পরদিন আবার বেড়ে যাচ্ছে। ফলে বাজারে স্থায়ীভাবে দাম কমার কোনো প্রবণতা দেখা যাচ্ছে না। এতে ক্রেতাদের মাসিক বাজারের হিসাব করাও কঠিন হয়ে পড়ছে।
বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষের তুলনামূলক সাশ্রয়ী প্রোটিনের উৎস হিসেবে পরিচিত পাঙাশ ও তেলাপিয়াও এখন আগের মতো সস্তা নেই। ফলে মাছের দাম বাড়ার প্রভাব শুধু বাজার খরচে নয়, নিম্ন আয়ের মানুষের খাদ্যাভ্যাসেও পড়ছে।
ডিম-মুরগিতেও বাড়তি খরচ
ডিমের দামও গত এক সপ্তাহে বেড়েছে। এক ডজন ডিম এখন ১৫০ থেকে ১৫৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গত সপ্তাহে যা ছিল ১৪০ থেকে ১৪৫ টাকা।
মুরগির বাজারেও স্বস্তি নেই। ব্রয়লার প্রতি কেজি ১৮০ থেকে ১৯০ টাকা, সোনালি ৩১০ থেকে ৩২০, হাইব্রিড ২৯০ থেকে ৩০০ এবং লেয়ার ৩৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। কোনো কোনো জাতের দাম সামান্য কমলেও সামগ্রিক বাজারে তার প্রভাব খুব একটা পড়েনি।
একটি পরিবারের খাবারের তালিকায় সবজি, মাছ, ডিম ও মুরগি আলাদা পণ্য হলেও এগুলোর বাড়তি খরচ মেটাতে হচ্ছে একই সংসার বাজেট থেকে। একাধিক পণ্যের দাম একসঙ্গে বাড়লে ভোক্তার হাতে বিকল্পও কমে যায়।
সংকুচিত হচ্ছে নিম্ন আয়ের মানুষের খাদ্যতালিকা
বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে নিম্নবিত্ত পরিবার। উচ্চ ও মধ্যবিত্তের ক্ষেত্রে কোনো পণ্যের দাম বাড়লে বিকল্প বেছে নেওয়ার সুযোগ তুলনামূলক বেশি। কিন্তু সীমিত আয়ের পরিবারগুলোর সেই সুযোগ কম।
ফলে মাছের বদলে ডিম, ডিমের বদলে কম দামের সবজি কিংবা মাছ-মাংসের পরিমাণ কমিয়ে সংসার চালাতে বাধ্য হচ্ছেন অনেকে। রায়ের বাজারের এক ক্রেতা মাছ কিনতেই প্রায় ১ হাজার ৬০০ টাকা খরচের কথা জানিয়েছেন।
এক দিনমজুরের অভিযোগ, আগে পাঙাশ ও তেলাপিয়া কিনে মাছের চাহিদা মেটানো গেলেও এখন সেগুলোর দামও বেশি। তাই নিয়মিত মাছ কেনা কঠিন হয়ে পড়েছে।
প্রয়োজন বাজার ব্যবস্থাপনায় নজরদারি
বৃষ্টি থেমে সবজির সরবরাহ বাড়লে কিছু পণ্যের দাম কমতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদি স্বস্তির জন্য শুধু আবহাওয়া অনুকূলে আসার অপেক্ষায় থাকলে হবে না। উৎপাদন থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত কোথায় অতিরিক্ত ব্যয় বা অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি হচ্ছে, তা নিয়মিত নজরদারির আওতায় আনতে হবে।
বিশেষ করে পচনশীল সবজির দ্রুত পরিবহন, পর্যাপ্ত সরবরাহ এবং পাইকারি-খুচরা দামের ব্যবধান পর্যবেক্ষণ জরুরি। একইভাবে মাছ, ডিম ও মুরগির উৎপাদন ও সরবরাহ পরিস্থিতির সঙ্গে খুচরা দামের সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, সেটিও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।
কারণ কোনো একটি পণ্যের দাম সাময়িকভাবে কমলেই ভোক্তার স্বস্তি আসে না। প্রয়োজন এমন একটি বাজারব্যবস্থা, যেখানে সবজি, মাছ, ডিম ও মুরগির দাম সীমিত আয়ের মানুষের নাগালের মধ্যে থাকে।
রাজধানীর বর্তমান বাজারচিত্র তাই শুধু বেগুন ১৪০ টাকা বা ডিমের ডজন ১৫৫ টাকা হওয়ার খবর নয়। এর আড়ালে রয়েছে সরবরাহে সামান্য ধাক্কায় মূল্যবৃদ্ধি, সংসার বাজেটে বাড়তি চাপ এবং সীমিত আয়ের মানুষের ক্রমশ সংকুচিত হয়ে আসা খাদ্যতালিকার বড় বাস্তবতা।