
অস্ত্র হাতে নিয়ে মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযানে অংশ নিয়ে তীব্র বিতর্কের জন্ম দেওয়া মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনকে মন্ত্রিপরিষদ থেকে পদত্যাগ করার সুনির্দিষ্ট নির্দেশ প্রদান করেছেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নির্দেশ দিয়েছেন বলে গণমাধ্যমে যে খবর প্রকাশিত হয়েছে, সেটিকে গুজব বলে আখ্যায়িত করেছেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন।
রোববার সন্ধ্যার পর তার পদত্যাগ-সংক্রান্ত খবর ছড়িয়ে পড়লে ইশরাক নিজে গণমাধ্যমকে বলেন, এটা গুজব। এর কোনো সত্যতা এখনো নেই। এমন কোনো সিদ্ধান্ত যদি নেওয়া হয়, তখন এমন উড়ো খবরের মাধ্যমে আসবে না। অবশ্যই সেটা অফিশিয়ালি জানানো হবে। প্রেস কনফারেন্সের মাধ্যমে আসবে। গুজবে কান না দিতে সবাইকে আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
প্রথম আলোর সঙ্গে আলাপকালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) জাতীয় নির্বাহী কমিটির একজন সদস্য মন্তব্য করেন, এই ঘটনাটি কেবল ইশরাক হোসেনের ব্যক্তিগত কোনো বিষয় হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং এটি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং গোটা মন্ত্রিসভার অন্য সম্মানিত সদস্যদেরও বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলেছে। একজন প্রতিমন্ত্রীর এহেন দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণের রাজনৈতিক দায় পুরো মন্ত্রিসভাকেও বহন করতে হচ্ছে।
উল্লেখ্য, গত শনিবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত রাজধানীর মোট ১৩টি ভিন্ন স্থানে আকস্মিক ঝটিকা পরিদর্শন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সেখানে তিনি সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আবাসিক এলাকার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং সেবার মান সরেজমিন যাচাই করে তাৎক্ষণিক নির্দেশনা দেন এবং অনেক ক্ষেত্রে অব্যবস্থাপনা দূর করতে নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দেন। প্রধানমন্ত্রীর সেই জনমুখী ও ইতিবাচক পরিদর্শনের দিনটিতেই বিকেলে ইশরাকের এই অস্ত্র প্রদর্শনের ঘটনা ঘটে। ফলে দলীয় ও সরকারি নীতিনির্ধারকদের কেউ কেউ মনে করছেন, প্রতিমন্ত্রীর এই বিতর্কিত কর্মকাণ্ড প্রধানমন্ত্রীর সেই গুরুত্বপূর্ণ সফরের ইতিবাচক অর্জন ও আলোচনা অনেকটাই আড়ালে ঠেলে দিয়েছে।
এমন সামগ্রিক পটভূমিতে ইশরাক হোসেনকে অবিলম্বে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়ার ঘটনাটিকে সরকারের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও দলীয় এমপিদের আচরণ এবং জনসমক্ষে জবাবদিহির প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অত্যন্ত কঠোর ও আপসহীন অবস্থানের বার্তা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
আত্মরক্ষার দাবি প্রতিমন্ত্রীর:
অস্ত্রকাণ্ড নিয়ে চতুর্মুখী সমালোচনার মুখে পড়ে আজ রোববার নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রকাশ করেন ইশরাক হোসেন। সেখানে তিনি দাবি করেন, তিনি মূলত একটি মাদকবিরোধী সামাজিক প্রতিরোধ কার্যক্রমে অংশ নিতেই ওই এলাকায় উপস্থিত হয়েছিলেন। তাঁর দাবি অনুযায়ী, অভিযান ও কর্মসূচিটি পুলিশ প্রশাসন এবং স্থানীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃবৃন্দের সঙ্গে যৌথ আলোচনার মাধ্যমেই নির্ধারিত হয়েছিল।
ইশরাকের ভাষ্যমতে, ঢাকা-৬ আসনের গেন্ডারিয়া অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে মাদকের কারবার চলছে বলে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়ার পর তিনি দীর্ঘদিন ধরেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে দেনদরবার করে আসছিলেন। এলাকার দীর্ঘদিনের জনবল সংকট দূর করার পাশাপাশি নির্দিষ্ট মাদক আড্ডার কাছাকাছি একটি স্থায়ী পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপনের উদ্যোগও নিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু তাতেও পরিস্থিতির কাঙ্ক্ষিত কোনো উন্নতি হয়নি।
বিবৃতিতে তিনি আরও দাবি করেন, ঘটনাস্থলে যাওয়ার প্রাক্কালে তিনি বিশ্বস্ত সূত্রে জানতে পেরেছিলেন যে চিহ্নিত মাদক কারবারিরা ছাদের ওপর থেকে তাঁদের ওপর গুলি চালাতে পারে। পরবর্তীতে একটি অস্থায়ী মাদকের আস্তানার কাছাকাছি পৌঁছামাত্র ৩০ থেকে ৩৫ জন লোক অত্যন্ত মারমুখী ভঙ্গিতে হইচই করতে করতে তাঁদের গাড়িবহরের দিকে তেড়ে আসে। সম্ভাব্য অতর্কিত হামলার আশঙ্কায় নিজের এবং সফরসঙ্গীদের নিরাপত্তার স্বার্থে তিনি ও তাঁর সরকারি নিরাপত্তারক্ষীরা স্বল্প সময়ের জন্য বৈধ অস্ত্র উঁচিয়ে ধরতে বাধ্য হন। পরবর্তীতে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আসার সঙ্গে সঙ্গেই অস্ত্র নামিয়ে নেওয়া হয়।
ইশরাক জোর দিয়ে বলেন, তাঁর হাতে দৃশ্যমান আগ্নেয়াস্ত্রটি সম্পূর্ণ বৈধ এবং যথাযথভাবে লাইসেন্সপ্রাপ্ত। কেবল আত্মরক্ষার জরুরি প্রয়োজনে সেটি প্রদর্শন করা হয়েছিল এবং এর মাধ্যমে প্রচলিত আইনের কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি।
বিবৃতির শেষাংশে তিনি দাবি করেন, উক্ত অভিযানে প্রায় চার-পাঁচটি অস্থায়ী মাদকের আস্তানা পুরোপুরি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে এবং সেখান থেকে মাদকদ্রব্য, দেশীয় অস্ত্র, নগদ অর্থ ও ছিনতাই হওয়া বেশ কিছু মুঠোফোন জব্দ করা হয়। এ সময় ঘটনাস্থল থেকে ছয়জনকে হাতেনাতে আটক করে পুলিশের নিকট সোপর্দ করা হয়েছে বলে জানান তিনি। তাঁর অভিযোগ, মূল ঘটনাকে পাশ কাটিয়ে কয়েকটি সংবাদমাধ্যম ঘটনার খণ্ডিত ও বিভ্রান্তিকর চিত্র প্রচার করেছে। তবে এসব প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও মাদকের বিরুদ্ধে তাঁর এই সামাজিক কার্যক্রম অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেন এই প্রতিমন্ত্রী।
তবে ঘটনাস্থলে যাওয়ার আগে স্থানীয় থানা পুলিশের সঙ্গে কোনো সুনির্দিষ্ট সমন্বয় করা হয়েছিল কি না, তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে। ঘটনার দিন অর্থাৎ শনিবারে ওয়ারী জোনের অতিরিক্ত উপকমিশনার মাসুদ রানা গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন যে, প্রতিমন্ত্রী পূর্ব থেকে পুলিশকে কোনো কিছু অবহিত করেননি; তাঁরা পরবর্তী সময়ে বিষয়টি জানতে পেরেছেন। এমনকি ইশরাক নিজেও সংবাদমাধ্যমকে বলেছিলেন যে, তিনি ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর প্রায় ১০ মিনিট পর পুলিশকে আসার জন্য অনুরোধ করেছিলেন।
এদিকে, ইশরাকের অস্ত্র প্রদর্শনের এই পুরো ঘটনাটি বর্তমানে গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে দেখছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। আজ রোববার ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) প্রধান শফিকুল ইসলাম জানান, ঘটনাটির নিরপেক্ষ তদন্তের দায়িত্ব ওয়ারী বিভাগের উপপুলিশ কমিশনারকে অর্পণ করা হয়েছে। বর্তমান ঘটনায় দেশের প্রচলিত আইনের কোনো ব্যত্যয় বা লঙ্ঘন ঘটেছে কি না, তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তে আইনভঙ্গের স্পষ্ট প্রমাণ মিললে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এর আগে পদত্যাগ করেছিলেন মিষ্টি:
প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনকে মন্ত্রিপরিষদ থেকে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়ার মাত্র কিছুদিন আগেই বিতর্কিত ও শৃঙ্খলাবহির্ভূত কর্মকাণ্ডে নাম আসায় বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকেও স্বেচ্ছায় সংসদ সদস্য পদ থেকে সরে দাঁড়াতে হয়েছিল।
গত ২৫ সেপ্টেম্বর রাজধানী ঢাকার মিরপুর এলাকায় অবস্থিত রাড্ডা স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে হামলা, ব্যাপক ভাঙচুর, লুটপাট ও ভবন গুঁড়িয়ে দেওয়ার একটি অনভিপ্রেত ঘটনা ঘটে। ওই হামলায় সংসদ সদস্য মিষ্টির অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত স্থানীয় বিএনপি ও যুবদলের কতিপয় নেতাকর্মীর সরাসরি সম্পৃক্ততার অভিযোগ ওঠে। ঘটনাটি মুহূর্তের মধ্যে দেশজুড়ে আলোড়ন তুললে সরকার ও দলের অভ্যন্তরীণ ভাবমূর্তি নিয়ে বড় ধরনের অস্বস্তি তৈরি হয়। দলীয় এমপি হিসেবে মিষ্টির রাজনৈতিক নৈতিক দায় নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। যদিও তিনি সে সময় ওই হামলা ও ভাঙচুরের সঙ্গে নিজের যেকোনো ধরনের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছিলেন।
পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রী ও দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা এবং কঠোর রাজনৈতিক অবস্থানের প্রেক্ষিতে গত ১ অক্টোবর জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদের দপ্তরে গিয়ে নিজের পদত্যাগপত্র জমা দেন ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি। এরপর সংসদ সচিবালয় থেকে তাঁর আসনটি আনুষ্ঠানিকভাবে শূন্য ঘোষণা করা হয়।
মিষ্টির সেই আলোচিত পদত্যাগের মাত্র আড়াই সপ্তাহের ব্যবধানে এবার প্রকাশ্য অস্ত্রকাণ্ডের মতো গুরুতর ঘটনায় প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনকে মন্ত্রিসভা থেকে বিদায় নেওয়ার নির্দেশ দিলেন প্রধানমন্ত্রী। দুটি পৃথক ঘটনায় দল ও সরকারকে বিব্রত করার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ওঠার পর কঠোর হাতে এই ধরনের পদত্যাগের নির্দেশ কার্যকর করার ঘটনা রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।







