একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রশাসনিক জটিলতা বা মতপার্থক্য থাকতেই পারে। কিন্তু সেই জটিলতার সমাধান কি আরেকটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে সাধারণ মানুষকে দুর্ভোগে ফেলা ? বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড এই গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
গতকাল ২৯ অক্টোবর কোনো ধরনের পূর্ব নোটিশ বা অবহিতকরণ ছাড়াই পিডিবি চট্টগ্রামের এস এন্ড ডি ষোলশহর-এর পক্ষ থেকে চট্টগ্রামের হাটহাজারী রোডের নতুন পাড়াস্থ বিআরটিএ অফিসের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। ফলে সাড়ে তিন ঘণ্টারও বেশি সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকে। এতে বিআরটিএ'র স্বাভাবিক দাপ্তরিক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয় এবং অসংখ্য সেবাগ্রহীতা কাঙ্ক্ষিত সেবা না পেয়ে বিভিন্ন ধরনের যানবাহনসহ বিআরটিএ কম্পাউন্ডে আটকে পড়ে।হাজার খানের গ্রাহকসহ শত-শত যানবাহনের চাপে কার্যত বিআরটিএ কম্পাউন্ড স্থবির হয়ে পড়ে এবং পার্শ্ববর্তী হাটহাজারী রোডে তীব্র যানজট দেখা দেয়।এর ফলে সারা দিন রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি, হাটহাজারী, রাউজান,ফটিকছড়ি সড়কে চলাচল রাত হাজার হাজার নারী পুরুষ, চাকুরী জীবি পায়ে হেটে চলাচল করতে হয়।তবে এ ভোগান্তির জন্য নতুন পাড়া বিআইটিএ কর্তৃপক্ষ পিডিবিকে দায়ী করেন।
ঘটনার সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে মোটরযানের কাগজপত্র জরিমানা ছাড়া হালনাগাদ করার শেষ দিনে। ফলে দূরদূরান্ত থেকে আসা সাধারণ সেবাগ্রহীতারা চরম অনিশ্চয়তা ও ভোগান্তির সম্মুখীন হয়েছেন।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ব্যবহৃত মোটরযানের ফিটনেস ও ট্যাক্স-টোকেন হালনাগাদের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের আইবাস (iBAS++) কোডের অসংগতি রয়েছে। এই অসংগতির কারণে বিআরটিএ'র বিদ্যমান সিস্টেমে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে না। এটি কোনো কর্মকর্তার ব্যক্তিগত অনিচ্ছা কিংবা বিআরটিএ কর্তৃপক্ষের ইচ্ছাকৃত অসহযোগিতা নয়; বরং একটি প্রশাসনিক ও প্রযুক্তিগত জটিলতা, যা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত উদ্যোগে সমাধানযোগ্য।
অন্যদিকে, উন্নয়ন প্রকল্প সমাপ্তির পর প্রকল্পের যানবাহন নির্ধারিত বিধি অনুযায়ী কেন্দ্রীয় পরিবহন পুলে জমা দেওয়ার সরকারি নির্দেশনাও রয়েছে। ফলে সংশ্লিষ্ট যানবাহনের বৈধ ব্যবহার, প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয় এবং প্রয়োজনীয় অনুমোদনের বিষয়গুলো যাচাই করা অত্যন্ত জরুরি।এমন পরিস্থিতিতে সমস্যার সমাধানের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ, প্রশাসনিক সমন্বয় কিংবা ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে আলোচনা করাই ছিল দায়িত্বশীল পদক্ষেপ।কিন্তু প্রশাসনিক সমস্যার সমাধানের পরিবর্তে একটি জনসেবামূলক সরকারি অফিসের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা নিঃসন্দেহে কাণ্ডজ্ঞানহীন, দায়িত্বজ্ঞানবর্জিত ও চরম অপরিণামদর্শী কর্মকাণ্ড।
এখানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে। পিডিবির নিজস্ব যানবাহনের কাগজপত্র হালনাগাদে জটিলতা সৃষ্টি হওয়ার সঙ্গে বিআরটিএ অফিসের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার ঘটনার কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। যদি প্রশাসনিক অসন্তোষের কারণে এমন পদক্ষেপ নেওয়া হয়ে থাকে, তবে তা হবে ক্ষমতার গুরুতর অপব্যবহার।
বিদ্যুৎ সরবরাহ একটি অত্যাবশ্যকীয় সেবা। এই সেবা বন্ধ করার ক্ষমতা কোনো অবস্থাতেই অন্য প্রতিষ্ঠানের ওপর চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার হতে পারে না।
সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো, দুটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যকার প্রশাসনিক জটিলতার খেসারত দিতে হয়েছে নিরীহ সাধারণ মানুষকে। যেসব নাগরিক সেদিন বিআরটিএ অফিসে সেবা নিতে এসেছিলেন, তাঁদের এই সমস্যার সঙ্গে কোনো সম্পর্ক ছিল না। অথচ তাঁরাই সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
সরকারি প্রতিষ্ঠান জনগণের সেবা নিশ্চিত করার জন্য, জনগণকে জিম্মি করার জন্য নয়।এই ঘটনার যথাযথ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। পূর্ব নোটিশ ছাড়া বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার কারণ, সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী কর্তৃপক্ষের ভূমিকা এবং এর ফলে নাগরিকসেবা ব্যাহত হওয়ার দায় নিরূপণ করতে হবে।একই সঙ্গে পিডিবির প্রকল্পের যানবাহনসংক্রান্ত প্রশাসনিক ও আইবাস কোডের জটিলতা বিধি মোতাবেক সমাধান করা প্রয়োজন।প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা প্রদর্শন নয়, দায়িত্বশীলতা ও পারস্পরিক সমন্বয়ই সরকারি সেবার মূলনীতি হওয়া উচিত।
কোনো প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতার চেয়ে জনগণের সেবা পাওয়ার অধিকার অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সেই অধিকার ক্ষুণ্ণ করার মতো কাণ্ডজ্ঞানহীন কর্মকাণ্ডের জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।