ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ বড় নগরগুলোতে মামলার চাপ বেশি। এসব জায়গায় দ্রুত মামলা নিষ্পত্তি করতে দক্ষ বিচারকদের বাছাই করে পদায়ন করতে চায় সরকার। একই সঙ্গে আদালতে দেরিতে আসা ও আগেভাগে চলে যাওয়া বিচারকদের সতর্ক করে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেছেন, আয়েশি চাকরি করতে চাইলে তাঁদের এমন জায়গায় পদায়ন করা হবে, যেখানে তাঁরা আয়েশ করে চাকরি করতে পারবেন।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) ঢাকার সিএমএম আদালতের কনফারেন্স রুমে ই-পারিবারিক আপিল আদালতের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে আইনমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
আইনমন্ত্রী বলেন, বিশেষ করে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বড় নগরগুলোতে মামলার চাপ অনেক। এসব জায়গায় যারা দক্ষতা দেখাতে পারবেন এবং দ্রুত মামলা নিষ্পত্তি করতে পারবেন, তাদের বাছাই করে পদায়ন করতে চায় সরকার।
বিচারকদের দায়িত্ব পালনে গাফিলতির প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ‘এখানে কেউ কেউ ১১টায় আসছেন, আবার একটা-দেড়টায় চলে যাচ্ছেন। এরকম আয়েশি জজ যদি কেউ থাকেন, আমরা আপনাদের আয়েশের ব্যবস্থা করতে পারব। এমন জায়গায় আপনাকে দেওয়া হবে, যেখানে আপনারা আয়েশ করে চাকরিটা করতে পারবেন।’
বিচারকদের আরও সময় ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানিয়ে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের জুডিশিয়াল অফিসাররা যদি আরেকটু সময় দেন এবং আরেকটু ডেডিকেশন দেন, তবে আমরা আগামী এক বছরে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মামলা নিষ্পত্তি করতে পারব।’
তিনি বলেন, সরকার বিচার বিভাগের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে চায়। মানুষ যেন মনে না করে, বিচারকেরা ন্যায়বিচার করছেন না কিংবা তাঁরা বিচারে পারদর্শী নন। আদালতে গেলে বছরের পর বছর ঘুরতে হয়, এমন ধারণা দূর করতে হবে। এ জন্য সরকার বিচারিক সক্রিয়তা বা জুডিশিয়াল অ্যাক্টিভিজম চায়।
ডিজিটাল বিচারব্যবস্থায় জোর
বিচারপ্রক্রিয়াকে ডিজিটাল ব্যবস্থাপনায় রূপান্তরের মাধ্যমে দুর্নীতিমুক্ত, স্বচ্ছ ও দায়বদ্ধ বিচারব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং ন্যায়বিচারে মানুষের সহজ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ঢাকায় ই-পারিবারিক আপিল আদালত উদ্বোধন করা হয়।
অনুষ্ঠানে আইনমন্ত্রী বলেন, এর আগে ই-পারিবারিক আদালত চালু করা হয়েছে। সরকার সেটিকে আরও এগিয়ে নিতে চায়। ইতিমধ্যে ই-বেইল বন্ড চালু করা হয়েছে, যার সুফল জনগণ পাচ্ছেন।
তিনি বলেন, ডিজিটাল পদ্ধতিতে সাক্ষ্য গ্রহণ ও হাজিরার বিষয়ে আইন রয়েছে। প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক আসামিকে কারাগার থেকে আদালতে আনতে হয়। এ জন্য যানবাহনের পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক নিরাপত্তারক্ষী মোতায়েন করতে হয়। ইতিমধ্যে কিছু ক্ষেত্রে ডিজিটাল হাজিরার ব্যবস্থা চালু হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালও কোনো কোনো আসামির ক্ষেত্রে এ ব্যবস্থা নিয়েছে। এটি আরও বিস্তৃত করা গেলে বিচারব্যবস্থায় আরেকটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে।
আইনমন্ত্রী বলেন, ই-জুডিশিয়ারি চালু করতে হলে বিচারিক প্রক্রিয়ার সব ক্ষেত্র ডিজিটাল করতে হবে। তবে বিচার বিভাগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠবে। এআই দিয়ে রায় লিখতে গেলে বা সাক্ষ্য নিতে গেলে ন্যায়বিচার ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এআই এমনভাবে মানুষের কণ্ঠস্বর নকল করতে পারবে, যা ভবিষ্যতে বিচারকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিচারকদের আরও দক্ষ হতে হবে।
প্রি-কেস মধ্যস্থতা ৩০ জেলায়
লিগ্যাল এইডের কার্যক্রম সম্প্রসারণের কথা তুলে ধরে আইনমন্ত্রী বলেন, লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে প্রি-কেস মেডিয়েশন বা মামলা দায়েরের আগেই মধ্যস্থতার ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ইউএনডিপি, জাইকাসহ বেশ কয়েকটি সংগঠন সহযোগিতা করছে। ইতিমধ্যে ৩০টি জেলায় এ ব্যবস্থা চালু হয়েছে। এর সাফল্যের হার ৬২ শতাংশের বেশি।
অনুষ্ঠানে আইন সচিব লিয়াকত আলী মোল্লা, সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল হাবিবুর রহমান সিদ্দিকী, ঢাকার জেলা ও দায়রা জজ মো. রফিকুল ইসলাম, মহানগর দায়রা জজ মো. শাহজাহান কবির, মহানগর পিপি ওমর ফারুক ফারুকী, জেলা পিপি ইকবাল হোসেন, ঢাকা আইনজীবী সমিতির সভাপতি আনোয়ার জাহিদ ভূঁইয়া ও সাধারণ সম্পাদক আবুল কালাম খান প্রমুখ বক্তব্য দেন।