চট্টগ্রাম নগরীর মশকনিধন কার্যক্রমে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং বাণিজ্যিক ও বিনিয়োগ কার্যক্রম সম্প্রসারণের সম্ভাবনা নিয়ে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) প্রশাসক ডা. শাহাদাত হোসেনের সঙ্গে মার্কিন দূতাবাসের বাণিজ্যিক প্রতিনিধিসহ তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধিদলের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক ডা. শাহাদাত হোসেনের সঙ্গে এ বৈঠকে অংশ নেন ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাসের কমার্শিয়াল কাউন্সেলর পল ফ্রস্ট (Paul Frost), ইউএস কমার্শিয়াল সার্ভিসের কমার্শিয়াল স্পেশালিস্ট মাশহুর আলম শেঠ (Mashur Alam Seth) এবং হোটেল আগ্রাবাদ গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের গ্রুপ প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ ইরাদ আলী (Mohammed Irad Ali)।
বৈঠকে চট্টগ্রাম নগরীর মশকনিধন কার্যক্রমকে আরও কার্যকর করতে বিদ্যমান ব্যবস্থার পাশাপাশি নতুন ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়। বিশেষ করে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের চলমান ব্যাসিলাস থুরিনজিয়েনসিস ইসরায়েলেনসিস (Bacillus thuringiensis israelensis—BTI) প্রযুক্তিনির্ভর মশকনিধন কার্যক্রম এবং এর সঙ্গে অন্যান্য বিজ্ঞানসম্মত প্রযুক্তির সমন্বয়ের বিষয়টি গুরুত্ব পায়।
এ সময় প্রশাসক ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, চট্টগ্রামকে একটি পরিচ্ছন্ন, স্বাস্থ্যসম্মত, নিরাপদ ও বিনিয়োগবান্ধব আধুনিক নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে আমরা কাজ করছি। নগরবাসীর জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় মশকনিধন কার্যক্রমকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এক্ষেত্রে প্রচলিত পদ্ধতির পাশাপাশি বিশ্বব্যাপী পরীক্ষিত, পরিবেশসম্মত ও কার্যকর আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ কাজে লাগাতে চাই। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের মতো প্রযুক্তিগতভাবে অগ্রসর দেশের অভিজ্ঞতা ও সহযোগিতা আমাদের কার্যক্রমকে আরও সমৃদ্ধ করতে পারে।”
তিনি বলেন, মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধে শুধু মশা নিধন করলেই হবে না, মশার প্রজননস্থল শনাক্ত, লার্ভা নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত নজরদারি এবং নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধির সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন ইতোমধ্যে মশার লার্ভা নিয়ন্ত্রণে বিটিআই ব্যবহার করছে। আমরা চাই বৈজ্ঞানিক তথ্য ও বাস্তব পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে এই কার্যক্রমকে আরও কার্যকর করতে।
বিটিআই প্রযুক্তির কার্যকারিতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিটিআই একটি জৈবিক লার্ভিসাইড, যা মশার লার্ভা নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত হয়। এটি পূর্ণবয়স্ক মশা নিধনের বিকল্প নয়। তাই লার্ভা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী পূর্ণবয়স্ক মশা নিয়ন্ত্রণ, পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম এবং প্রজননস্থল ধ্বংসের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। আমাদের লক্ষ্য সাময়িকভাবে মশার উপদ্রব কমানো নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে একটি টেকসই মশক ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা।
প্রশাসক আরও বলেন, চট্টগ্রাম একটি ঘনবসতিপূর্ণ ও দ্রুত সম্প্রসারণশীল নগরী। এখানে জলাবদ্ধতা, অপরিকল্পিতভাবে জমে থাকা পানি, নির্মাণাধীন স্থাপনা এবং বিভিন্ন স্থানে পানি জমে থাকার কারণে মশার প্রজননের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হয়। এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, সঠিক তথ্য সংগ্রহ এবং এলাকাভিত্তিক কার্যক্রম পরিচালনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে স্থানীয় বাস্তবতার সমন্বয় ঘটাতে পারলে মশকনিধন কার্যক্রমে আরও ভালো ফল পাওয়া সম্ভব।
বৈঠকে চট্টগ্রাম নগরীর বাণিজ্যিক সম্প্রসারণ, বিনিয়োগের সম্ভাবনা এবং আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক যোগাযোগ বৃদ্ধির বিষয়েও আলোচনা হয়।
এ প্রসঙ্গে প্রশাসক ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, চট্টগ্রাম শুধু বাংলাদেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরনগরী নয়, এটি দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। বন্দর, শিল্পকারখানা, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং যোগাযোগ অবকাঠামোর কারণে চট্টগ্রামের বিশেষ অর্থনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে চাই। বিশেষ করে নগরীর অবকাঠামো উন্নয়ন, পরিবেশ ব্যবস্থাপনা, আধুনিক প্রযুক্তি এবং নাগরিক সেবার মানোন্নয়নে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সুযোগ রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বিনিয়োগবান্ধব নগরী গড়ে তুলতে শুধু শিল্প ও বাণিজ্যের প্রসার যথেষ্ট নয়। এর সঙ্গে উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়গুলোও সরাসরি সম্পর্কিত। একটি শহর যত বেশি বাসযোগ্য ও সুশৃঙ্খল হবে, সেখানে ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পরিবেশ তত বেশি উন্নত হবে। আমরা চট্টগ্রামকে সেই লক্ষ্যেই এগিয়ে নিতে চাই।
আলোচনায় মার্কিন দূতাবাসের বাণিজ্যিক প্রতিনিধিদের সঙ্গে নগর ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রযুক্তির সম্ভাব্য প্রয়োগ এবং চট্টগ্রামের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা কাজে লাগানোর বিভিন্ন দিক নিয়ে মতবিনিময় হয়। প্রতিনিধি দলটি মশকনিধনে পরিবেশবান্ধব ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার তুলে ধরে বিটিআই ডাঙ্কস (Bti Dunks) ও বিটিআই বিটস (Bti Bits) প্রয়োগের বিষয়ে আলোচনা করে। তারা জানায়, Bacillus thuringiensis israelensis (Bti) নামের প্রাকৃতিক ব্যাকটেরিয়াভিত্তিক এসব জৈব লার্ভিসাইড জমে থাকা পানিতে মশার লার্ভা ধ্বংস করতে কার্যকর। বিটিআই ডাঙ্কস পানিতে ধীরে ধীরে কার্যকর উপাদান ছাড়ে এবং দীর্ঘ সময় মশার লার্ভা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে। অন্যদিকে বিটিআই বিটস দানাদার হওয়ায় ছোট ছোট জলাধার ও মশার প্রজননস্থলে সহজে প্রয়োগ করা যায়। নির্ধারিত নিয়মে ব্যবহার করলে এসব উপাদান মানুষ, প্রাণী ও পরিবেশের জন্য কম ঝুঁকিপূর্ণ। প্রতিনিধিদলটি চট্টগ্রামের ডেঙ্গু প্রতিরোধ কার্যক্রমে এসব প্রযুক্তির ব্যবহার সম্প্রসারণের সম্ভাবনা তুলে ধরে।