
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেছেন, চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এখানকার উদ্যমী মানুষ, বিশেষ করে তরুণ সমাজ। এই সক্ষমতা ও সম্ভাবনার ভিত্তিতেই চট্টগ্রামকে দক্ষিণ এশিয়ার বিজনেস হাব হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব।
মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) রাতে নগরের পাঁচ তারকা হোটেল রেডিসন ব্লুর মোহনা হলে তরুণ উদ্যোক্তাদের আন্তর্জাতিক সংগঠন জুনিয়র চেম্বার ইন্টারন্যাশনাল (জেসিআই) চট্টগ্রামের নতুন নেতৃত্বের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর (চেইন হ্যান্ডওভার) অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মেয়র এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, বিশ্ব অর্থনীতির ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়—যেসব দেশ দ্রুত উন্নতি করেছে, সেসব দেশের উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তি ছিল তরুণ সমাজ। চীন, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, শিল্পায়ন, প্রযুক্তি বিপ্লব এবং যুদ্ধোত্তর পুনর্গঠনে এসব দেশের তরুণ প্রকৌশলী, উদ্যোক্তা ও দক্ষ শ্রমশক্তিই নেতৃত্ব দিয়েছে। এই বাস্তবতা আমাদের শেখায়—রাষ্ট্র গঠন ও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে তরুণদের কোনো বিকল্প নেই।
মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, বাংলাদেশ বর্তমানে একটি চ্যালেঞ্জিং অর্থনৈতিক সময় পার করছে। এই সংকট থেকে উত্তরণে নেতৃত্ব দিতে হবে তরুণ উদ্যোক্তা, তরুণ পেশাজীবী ও প্রযুক্তিবিদদের। তিনি দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, যেভাবে চীন, কোরিয়া ও জাপান তরুণদের হাত ধরে ঘুরে দাঁড়িয়েছে, বাংলাদেশও সেই পথেই এগোতে পারে।
নিজেদের ইতিহাসের প্রসঙ্গ টেনে মেয়র বলেন, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বিশ্বাস করতেন—রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তরুণদের ওপর। গ্রামভিত্তিক উন্নয়ন, উৎপাদনমুখী অর্থনীতি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও জাতীয়তাবোধ জাগ্রত করার মাধ্যমে তিনি তরুণদের রাষ্ট্রগঠনের মূলধারায় যুক্ত করেছিলেন। তাঁর দর্শন ছিল—উন্নয়ন মানে শুধু অবকাঠামো নয়, উন্নয়ন মানে মানুষের সক্ষমতা বৃদ্ধি।
এই দর্শনের ধারাবাহিকতায় তিনি বলেন, চট্টগ্রামকে পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। শিল্প, বাণিজ্য, লজিস্টিকস, শিপিং, আমদানি-রপ্তানি এবং স্টার্টআপ উদ্যোগের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে চট্টগ্রামকে প্রতিষ্ঠিত করতে আধুনিক ব্যবসা পরিবেশ, দক্ষ মানবসম্পদ, ডিজিটাল সেবা এবং বিনিয়োগবান্ধব অবকাঠামো গড়ে তোলা হবে।
মেয়র আরও বলেন, এই রূপান্তরে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। নগর ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন, ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণ, তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি এবং একটি পরিকল্পিত, বাসযোগ্য ও উৎপাদনমুখী নগর গড়ে তোলাই হবে সিটি কর্পোরেশনের অগ্রাধিকার।
তিনি বলেন, তরুণ উদ্যোক্তাদের বিকাশে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান হিসেবে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন সবসময় সহযোগিতা করতে প্রস্তুত রয়েছে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও উদ্যোক্তা উন্নয়নে এ ধরনের সংগঠনের কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করা প্রয়োজন।
অনুষ্ঠানে জেসিআই চট্টগ্রামের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট জুনায়েদ আহমেদ রাহাতের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব হস্তান্তর করা হয়। বিদায়ী পরিষদ তাদের দায়িত্বকালীন অর্জন ও অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন এবং নবগঠিত পরিষদ আগামীর কর্মপরিকল্পনা উপস্থাপন করে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ সিমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিসিএমএ)-এর সভাপতি মো. আমিরুল হক, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপকমিটির সদস্য ও তরুণ উদ্যোক্তা ইসরাফিল খসরু, চট্টগ্রাম সিএন্ডএফ এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এস এম সাইফুল আলম এবং পিএইচপি ফ্যামিলির পরিচালক ও মালয়েশিয়ার অনারারি কনসাল মোহাম্মদ আকতার পারভেজ।
পিএইচপি ফ্যামিলির পরিচালক মোহাম্মদ আকতার পারভেজ বলেন, “আমি চাই, জেসিআই চট্টগ্রামে একটি বড় অফিসের ব্যবস্থা করুক। উদ্যোক্তা সৃষ্টিতে তারা বরাবরের মতো উল্লেখযোগ্য অবদান রাখুক।”
নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট জুনায়েদ আহমেদ রাহাত বলেন, “জেসিআই তরুণদের সংগঠন। এর ১৪ বছরের ঐতিহ্য ধরে রেখে আমরা সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার আশা রাখি।”
উল্লেখ্য, ২০১২ সালে যাত্রা শুরু করা জেসিআই চট্টগ্রাম ১৮ থেকে ৪০ বছর বয়সী তরুণদের নিয়ে উদ্যোক্তা সৃষ্টি, সামাজিক উন্নয়ন এবং নৈতিক নেতৃত্ব বিকাশে কাজ করে যাচ্ছে।
নবগঠিত কমিটিতে গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্বপ্রাপ্তরা হলেন—আইপিএলপি: গোলাম সরোয়ার চৌধুরী।
নির্বাহী সহসভাপতি: ডা. জুয়েল রহমান, আল আমিন মেহেরাজ বাপ্পি।
সহসভাপতি: সাদ বিন মুস্তাফিজ অনিন্দো, মো. সাদেক উর রহমান সাদাফ, অনিক চৌধুরী, ইঞ্জিনিয়ার তাইমুর আহমেদ ও মোহাম্মদ আনাছ।
কোষাধ্যক্ষ: মুন্তাসির আল মাহমুদ।
এক্সিকিউটিভ অ্যাসিস্ট্যান্ট টু প্রেসিডেন্ট: সায়হান হাসনাত।
জিএলসি: শাহেদ আলী সাকি।
লোকাল ট্রেনিং কমিশনার: তৈয়্যবুর রহমান জাওয়াদ।
কমিটির অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পদের মধ্যে রয়েছেন—
জেসিআই ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স চেয়ারপারসন শাহাব উদ্দিন চৌধুরী,
মিডিয়া ও পিআর চেয়ারপারসন ডা. নুরুল কবির মাসুম,
জেসিআই ইন বিজনেস চেয়ারপারসন কাইসার হামিদ ফরহাদ এবং
স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যানিং চেয়ারপারসন সাকিব চৌধুরী।
পরিচালক পদে নিযুক্ত হয়েছেন আবিদ হোসেন, ফয়সাল মাহমুদ, সারিশত বিনতে নূর, মো. জিয়া উদ্দিন, মো. রবিউল ইসলাম, শেখ মোহাম্মদ উজাইর, আবদুল্লাহ আল ফরহাদ এবং কাজী আমির খসরু।
কমিটিতে ডিজিটাল কমিটি চেয়ার হিসেবে মো. নিয়াজুর রহমান চৌধুরী এবং ইভেন্ট কমিটি চেয়ার হিসেবে আশিক আমান ইতাজও দায়িত্ব পেয়েছেন।
নির্বাচনে কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন জেসিআই বাংলাদেশের সহসভাপতি এবং জেসিআই চিটাগংয়ের ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট ইসমাইল মুন্না।
অনুষ্ঠানে জেসিআই বাংলাদেশের ন্যাশনাল গভর্নিং বডির পক্ষ থেকে ন্যাশনাল প্রেসিডেন্ট (ইলেক্ট) আরফিন রাফি আহমেদ, ডেপুটি ন্যাশনাল প্রেসিডেন্ট (ইলেক্ট) শান সাহেদসহ অন্যান্য কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া জেসিআই চিটাগংয়ের ২০১৭ সালের প্রেসিডেন্ট গিয়াস উদ্দিন, ২০২১ সালের প্রেসিডেন্ট টিপু সুলতান শিকদার এবং ২০২৩ সালের প্রেসিডেন্ট ও জেসিআই বাংলাদেশ ক্লাব চেয়ারপারসন রাজু আহমেদ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।







